নেপালের পরে মালদ্বীপ

নেপালের পরে মালদ্বীপ

বিশ্বাস বড়াল,
শেয়ার করুন

রাতে উত্তর মালের বান্দোস প্রবাল দ্বীপ থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে মালদ্বীপের রাজধানী মালেকে দেখতে ঠিক শান্ত এক ছবির মত মনে হয়।  ক্ষুদ্র শহরটি মাত্র ৫.৮ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত – কাঠমান্ডু শহরের তুলনায় ৬৮ গুণ ছোট। মধ্যাহ্নে এর এর কঙ্কালসার রাস্তাগুলি মানুষ আর স্কুটারে আকীর্ণ থাকে, কিন্তু কারো তেমন তাড়া আছে বলে মনে হয় না। স্থানীয় মাছ বাজারের স্টলগুলোয় টোনা, সার্ডাইন এবং অক্টোপাস উচু স্তূপ রাখা। তাদের সুগন্ধি দীর্ঘ দিন পর যেন সুস্বাদু মাছের তরকারির সুভাস নিয়ে আসছে।

কিন্তু এই শান্ত অবস্থা ভেতরের অশান্তিকে যেন ঢেকে রেখেছে। দক্ষিণ এশীয় ৪ লাখ মানুষের দেশটির সাম্প্রতিক ঘটনাবলী মাছ বাজারের সুভাসকে যেন ছাড়িয়ে গেছে।

দ্বীপমালার এই দেশটি ছয় দশক পর সবেমাত্র  ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল করেছে। হয়তবা এটি করা হয়েছে কারাগারের উপছে পড়া ভীড় কমাতে। এরপর, জুলাইয়ের শেষদিকে, স্পিকারের অভিসংশন ঠেকাতে সরকার মালেতে জাতীয় সংসদ অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন আব্দুল গাইয়ুমের আশঙ্কা, বিরোধীদলকে ৮৫ জন সংসদ সদস্যের ৪৫ জনই সমর্থন করবে, যা আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তার জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। সরকারকে রক্ষার জন্য তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সঙ্কুচিত করেছেন আর র‌্যাডিক্যাল ইসলামপন্থীদের কাছে টেনেছেন।

প্রায় দশ লাখ পর্যটক প্রতিবছর এই স্বর্গের দ্বীপদেশ ভ্রমণ করে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংঘাতের পরও এই প্রবণতা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। চীনই এসব পর্যটকের প্রধান উৎস দেশ। ২০১২ সালে মালদ্বীপে আসা প্রায় ১২ লাখ পর্যটকের এক তৃতীয়াংশ এসেছে চীন থেকে। তবে এই দিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুধু পর্যটকই আসে না।

নারিকেল সারি

সপ্তম শতাব্দীর চীনা লেখক হিউয়েন-সাংঙের ভাষায় নাও-লো-কি-লো-চৌ (“নারকেল দ্বীপ”) বা বর্তমান মালদ্বীপের প্রায় সব প্রধান অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চীন করছে। চীনারা বিভিন্ন  দ্বীপ  কিনছে, রাস্তা আর অবকাঠামো নির্মাণ (চমকপ্রদ নতুন জাতীয় যাদুঘর সহ) করছে।  এর সাথে দ্বীপে একটি চীনা নৌ ঘাটি গঠনের কথাও শোনা যাচ্ছে।

ঠিক নেপালের মতো মালদ্বীপের সরকারও ভারত থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চীনের নিকটবর্তী হয়ে ওঠার মধ্যেই দেশটির সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষিত বলে বিশ্বাস স্থাপন শুরু করছে। ইয়ামিন ভয় করেন যে, প্রধান বিরোধীদল মোহাম্মদ নাশিদ তার পতন ঘটানোর তৎপরতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে আর তাতে মদত রয়েছে ভারতের । বর্তমান প্রেসিডেন্টের সৎ ভাই ও ৩০ বছর ধরে মালদ্বীপের নেতৃত্ব দেয়া মামুন আবদুল গাইয়ুমও এখন বিরোধীদলীয় ক্যাম্পে জোরালোভাবে থেকে ইয়ামিনের পতনের জন্য কাজ করছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সন্দেহ, মামুন ১৯৮৮ সালে তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান দমন করতে রাজীব গান্ধী  সাহায্য করার পর সর্বদা ভারতের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন।

কিন্তু এটা মনে করা ভুল হবে যে কেবলমাত্র মালদ্বীপের সরকারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে চীনকে। দ্বীপ দেশটির রিসোর্টগুলিই মালদ্বীপের জন্য কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। আর এখানকার অধিকাংশ লোকই চীনা পর্যটকদের উপর নির্ভর করে, চীনের প্রতি জনসাধারণেরও রয়েছে সুসম্পর্ক । মালের একজন  টোর গাইড বললেন, “চীনারা আমাদের প্রকৃত বন্ধু”। “তারা আমাদের সকল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছে এবং তারাই পর্যটনের বেশিরভাগ ডলার পাঠায়”।

ভারত চীনের এই প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি কা্রযকর প্রতিরক্ষা দেয়াল বানাতে ব্যর্থ হয়েছে; আর ইয়ামিন চীনা অর্থ প্রবাহের প্রতি ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছেন।

২০১৫ সালে যখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক অধিকারকে শ্রদ্ধা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনকে বলেন, তখন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে তার নিজের ব্যবসার কথা স্মরণ রেখে অনিশ্চিত কোন শর্তের কথা না বলার কথাই জানানো হয়। মালের সাম্প্রতিক ঘটনার ব্যাপারে ভারত সরকার একেবারেই নীরবতা বজায় রেখেছে। ভয় এই যে, তার কোনও ভুল পদক্ষেপ অবিশ্বাস্যভাবে চীনা শিবিরে মালদ্বীপকে ঠেলে দিতে পারে।

মালদ্বীপের ভারত-চীন ডিনামিক্স নেপালের গতিপথ থেকে খানিকটা ভিন্ন। প্রথমত, মালদ্বীপের জন্য ভারত থেকে ২০০০ কিলোমিটার দূরে এক নিরাপদ দূরত্বে থেকে চীনের সাথে যোগাযোগ অনেকখানি সহ্জ । নেপালের মতো মালদ্বীপের ক্ষেত্রে লেগে থাকার সুযোগটি দিল্লির জন্য অনেকটাই সংকীর্ণ।

আর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও অনেকটা ফিক্সড বলেই মনে হয়।

পারফেক্ট জাদুকরী

অন্তর্নিহিত কারণগুলি ভিন্ন হলেও মালদ্বীপ ও নেপালের সাথে ভারতীয় এস্টাবলিমমেন্টের দ্বন্ধের ধরণ কিন্তু একই রকম। উদাহরণস্বরূপ, মালের বিরোধি দলগুলিকে অব্যাহতভাবে মদত দেয়া হচ্ছে যার কারণে ইয়ামিন ক্রমবর্ধমানভাবে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছেন। আর একইসাথে চীনের প্রতি তার সম্পৃক্ততাও বাড়ছে। এর মাধ্যমে কি নাশিদ এবং বিরোধী দল ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ফিরিয়ে আনাকে সমর্থন করা হচ্ছে?

নেপালের মতো একইভাবে নতুন দিল্লির নতুন ভয় হচ্ছে যে, যদি মাধেসিদের জাতিগত চাহিদাগুলিকে বেশি করে সমর্থন দেয়া হয়  তবে নেপালি এস্টাবলিশমেন্ট চীনের প্রতি আরও বেশি সক্রিয় হতে পারে। আর মাধেশী দলগুলোর সাথে একাত্ব হতে গিয়ে ভারতের নেপালে একটি শক্ত সমর্থন ভিত্তি হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশিদের দীর্ঘর্মেয়াদি বিষয়গুলো ডিল করার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংকীর্ণ এবং অস্থায়ী ধরনের। নরেন্দ্র মোদীর দক্ষিণ এশীয় সম্পর্কে তালগোল পাকানোর বিষয়টি সম্ভবত ভারতীয় সাংবাদিক উইনোদ দুয়া-এর দি ওয়্যার এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক ‘জনগণ মান কি বাত্’ শীর্ষক এক লেখায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এতে তিনি বলেছেন, মোদি প্রতিবেশি দেশগুলোতে নিজ স্বার্থকে এক অস্থির অবস্থায় রেখে তুর্কমেনিস্তান ও তাজিকিস্তানের মতো দূরবর্তী ও অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলিতে ভ্রমণ করে কি অর্জন করতে চাইছেন? তার কাছে এর একটি যুক্তিই আছে। সেটি হলো মোদির আসলে এমন কোনও বৈদেশিক নীতি-কৌশল আছে বলে মনে হয় না, যা পাকিস্তান ও চীনকে ছাড়িয়ে বাইরে যায়।

ভারত একের পর এক দক্ষিণ এশীয় বন্ধুদের হারিয়েছে। নেপালের ভারত-বিরোধি অনুভূতি কখনো এতো উচ্চতর হয় নি আর মালদ্বীপে চীনা উপস্থিতি কখনো এত গভীর ছিল না। ২০১৬ সালের উরির হামলার পর পাকিস্তানের সাথে ভারত সম্পর্ককে শীতল করেছে; শ্রীলংকা আবার চীনা বলয়ের ভেতরে ফিরে আসছে; এবং ডোকলামের  পরিণতির কথা কখনও ভাবা হয়নি, এমনকি ভুটানও ভারতের সাথে তার নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছে।

মালদ্বীপের সাম্প্রতিক সময়ে সফর করলে কেউ বিস্মিত হতে পারেন যে ভারতীয়দের সত্যিই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক কোন অনুশীলন আছে কিনা। তাদের চূড়ান্ত অভিপ্রায় যাই থাকুক না কেন চীনারা নীরবে সময়কে তাদের সাথে বেধে রাখার শিল্প আয়ত্ত করেছেন। এটি সত্য, তাদের চেকবই কূটনীতির একটি সীমা আছে, কিন্তু তাদের সরকারী চ্যানেলকে অগ্রাধিকার দেয়ার পছন্দ একটি সুস্পষ্ট স্বচ্ছতা আনার কাজ করে। এর বিপরীতে, কোন নির্দিষ্ট ম্যাপ ছাড়া ভারতীয় কূটনীতির  জলোচ্ছ্বাসের শিখরে আরোহন করে ১২০০ দ্বীপের  দেশটিকে নেভিগেট করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে দিল্লির জন্য।

বিশ্বাস বড়াল নেপালের  জাতীয় দৈনিক মাই রিপাবলিকার সাথে ২০১১ সাল থেকে সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত। তিনি রিপাবলিকার মতামত পেজের তত্ত্বাবধান করেন এবং নেপালের পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে লেখেন এবং রিপোর্ট করেন। তিনি ওয়্যার (ভারত) এর নিয়মিত লেখক। biswas.baral@myrepublica.com

 

শেয়ার করুন