বন্দরে বিনিয়োগের জন্য কেন চীনের দ্বারস্থ হলো শ্রীলংকা!

বন্দরে বিনিয়োগের জন্য কেন চীনের দ্বারস্থ হলো শ্রীলংকা!

শেয়ার করুন

গত এক এক দশক ধরে আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে চীন ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তারা পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর ও শ্রীলংকায় হামবানতোতা বন্দর নির্মাণ করছে। মিয়ানমারেও বন্দর নির্মাণ নিয়ে আলোচনা চলছে। হামবানতোতা বন্দর নিয়ে সম্প্রতি শ্রীলংকা সরকার, চীনের মার্চেন্ট পোর্ট ও শ্রীলংকার বন্দর কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। তবে এই চুক্তির সমালোচনাও কম হচ্ছে না।

চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্যের কারণে শ্রীলংকায় দেশটির বিনিয়োগকে অনেকেই সহজভাবে নিতে পারছেন না। তবে, শ্রীলংকার আগের সরকারও চীনা বিনিয়োগ পেতে যথেষ্ঠ চেষ্টা চালিয়েছে। তাই কেন সরকারগুলো চীনা বিনিয়োগের পেছনে ছুটছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থাগুলোর মতো কারো অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে চীন তেমন মাথা ঘামায় না। তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি আছে, আছে ঝুঁকি নেয়ার সামর্থ্য। তারা এমন এক সময় হামবানতোতা বন্দর উন্নয়নের জন্য এগিয়ে আসে যখন এখানে বিনিয়োগ করতে কোন দেশ রাজি হয়নি। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে এই বন্দরে বিনিয়োগের মাধ্যমে শ্রীলংকার ওপর ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্য ও অন্যান্য প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবেও চীন কাজ করছে।

তাই শুধু চীনকে সুযোগ গ্রহণের জন্য দায়ি করলে হবে না, শ্রীলংকা সরকারই আগ বাড়িয়ে তাদেরকে ডেকে এনেছে এখানকার বন্দরসহ অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প নির্মাণের জন্য।

একই অঙ্গে অনেক রূপ

চীন একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী, দাতা ও ব্যবসায়িক অংশীদার। চলতি শতাব্দির শুরু থেকে অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা ছাড়িয়ে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত অনেক অঞ্চলে চীনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কৌশলগত অবস্থান ও সম্ভাবনাময় বাজারের খোঁজে ব্যস্ত চীনের দৃষ্টি থেকে দক্ষিণ এশিয়াও বাদ যায়নি। হ্যারিটেজ ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে  চীন ৮৭০.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে শ্রীলংকায় বিনিয়োগ হয়েছে ৮.৯ বিলিয়ন ডলার।

একই সময়ে শ্রীলংকায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অংশ আন্তর্জাতিক ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি)’র বিনিয়োগ মাত্র ৫৯৬ মিলিয়ন ডলার। তবে, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগের তুলনায় শ্রীলংকার বিনিয়োগ ভগ্নাংশ মাত্র। চীনের বিনিয়োগ, অনুদার ও বাণিজ্য পরম্পরার সঙ্গে জটিলভাবে সম্পর্কিত।

শ্রীলংকার এফডিআই’র সবচেয়ে বড় উৎস চীন। ২০১৪ সালে দেশটির কাছ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার এফডিআই আসে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিামনবন্দর, সেচপ্রকল্প, মহাসড়ক প্রকল্পেও চীন বিনিয়োগ করছে।

২০০৯ সাল থেকে শ্রীলংকার সবচেয়ে বড় দাতা চীন। দেশটির কাছ থেকে গত বছর ১.২ বিলিয়ন ডলারের গ্রান্ট, লোন, ও ক্রেডিট পাওয়া গেছে। যা অন্যদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পাওয়া মোট প্রতিশ্রুতির ৫৪%। অন্যদিকে, এডিবি’র বিনিয়োগ মাত্র ৪২৩ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ^ব্যাংকের ২৪১ মিলিয়ন ডলার। গত এক দশকে চীন শ্রীলংকাকে ৫ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য দিয়েছে।

শুধু বিনিয়োগকারী বা দাতা নয়, শ্রীলংকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারও চীন। ২০১৩ সাল থেকে ভারতের পর চীন শ্রীলংকার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।

‘স্ট্রিং অব পার্ল’ থেকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমাগত জোরদার উপস্থিতিকে বিশ্লেষকরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘স্ট্রিং অব পার্ল’ বা ভারতকে ঘিরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বহু সংখ্যক বন্দর নির্মাণ তত্ত্ব।

কিন্তু এই তত্ত্ব বাতিল করে দিয়ে চীন ‘এক অঞ্চল এক সড়ক’ (ওবিওআর) উদ্যোগ ঘোষণা করে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বন্দর, মহাসড়ক, রেলসড়ক, পাইপলাইন, বিদ্যুৎ লাইন, ফাইবার ও অন্যান্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সঙ্গে চীনকে সংযুক্ত করা।

সুবিধাজনক বিকল্প তহবিলদাতা

বহু দশক ধরে চীনের সঙ্গে শ্রীলংকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে চীনের কাছ থেকে তহবিল নিতে শ্রীলংকা বেশি আগ্রহী। এর একটি কারণ হলো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দেয়ার জন্য অনেক শর্ত চাপিয়ে দিতে চায়, চীন তা চায় না। তাছাড়া, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০০৯ সাল থেকে শ্রীলংকার ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাব অনমনীয়।

ভারতের আধিপত্যবাদি মনোভাব

ভারত নিজেকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিকভাবে নেতা বলে মনে করে। অবস্থা এমন যে ভারত মহাসাগর মানে ভারতের নিজের মহাসাগর বলে দেশটি মনে করে। এ অঞ্চলের বাকি দেশগুলো যেন তার আঙ্গিনা বা করদ রাজ্য। ফলে ভারতের এই আধিপত্যবাদি আচরণের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে চীন কাজ করছে।

পরিশেষে বলতে হয় যে, যদিও ভারত মহাসাগরকে ঘিরে যে গ্রেট গেম চলছে তার ঘুঁটি হিসেবে শ্রীলংকার ব্যবহৃত হওয়ার আশংকা রয়েছে, কিন্তু সে নিজেই চীনা বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য ছুটে গেছে। তবে, সরকার যদি সঠিকভাবে কার্ডটি খেলতে পারে তাহলে এই দ্বীপের অধিবাসীরাই চীনা বিনিয়োগের সুফল ভোগ করতে পারবে।

[লেখিকা থিলিনি খানডাওয়ারাচ্চি একজন গবেষক ও ফুলব্রাইট স্কলার]