হিমালয়ের যুদ্ধে পরীক্ষায় পড়বে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’

হিমালয়ের যুদ্ধে পরীক্ষায় পড়বে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’

এম কে ভদ্রকুমার,
শেয়ার করুন

চায়না ডেইলি জোরালোভাবে লিখেছে, ‘শান্তিপূর্ণ সমাধানের জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুই শক্তির মধ্যে সঙ্ঘাতের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে।’ সিনহুয়া জানিয়েছে, ‘চীনা সংযমের সীমা আছে এবং প্রতিটি দিন গড়ানোর সাথে সাথে দড়ি ছোট হয়ে আসছে।’

এসব হুঁশিয়ারি কি গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে? ৫৫ বছর আগেও ভারত একই ধরনের হুঁশিয়ারি ঔদ্ধত্যসহকারে অবজ্ঞা করেছিল। ওই সীমান্ত যুদ্ধে ভারত শোচনীয়ভাবে হেরেছিল। বাকিটা এখন ইতিহাস।

ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ অচিন্তনীয় বিষয়। দুই দেশের কেউই তা চায় না। কিন্তু নিচে কিছু তথ্য দেয়া হলো, এতে বোঝা যায়, ভুল হিসাব করার বিস্তর অবকাশ রয়েছে। ভারতীয় ও চীনারা দেশপ্রেমিক জাতি। উভয় দেশেই এখন রয়েছে জাতীয়তাবাদী নেতা এবং ‘আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব’ অত্যন্ত আবেগপ্রসূত ইস্যু। যেটা আতঙ্কের বিষয় তা হলো উভয় সরকারই সফলভাবে অভ্যন্তরীণ জনমত তাদের পক্ষে নিয়ে নিয়েছে।

সম্ভবত চীনে এটা বিশেষভাবে ভিন্ন কিছু নয়। তবে ভারতে যেখানে শত শত ফুল স্বাভাবিকভাবেই ফোটে, সেখানে জনমতের মেরুকরণ ঘটেছে ব্যতিক্রম হারে। মনে হচ্ছে, সব ভারতীয় সরকারের চীনা অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে ফেসবুকে তাদের ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলছে। গড্ডালিকা প্রবাহের বাইরে কোনো অভিমত কিভাবে থাকতে পারে?

এটা বিপজ্জনক বিষয়। কারণ ঔদ্ধত্য হলো আত্ম-বিনাশী দৈত্য। সাদামাটা সত্য হলো, ভারতের স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির যোগবিয়োগ চীনের সাথে সঙ্ঘাতে প্রথমবারের মতো মারাত্মক পরীক্ষায় পড়তে যাচ্ছে। চীনের সাথে সাত সপ্তাহের অচলাবস্থায় কোনো দেশ ভারতকে সমর্থন দেয়নি। ভারতীয়রা কল্পনার ফানুশ উড়াচ্ছে এই ভেবে যে যোগ, গান্ধী, সাপুড়ে ইত্যাদি ‘সফট পাওয়ারে’ তারা চীনাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। মনে হচ্ছে বিষয়টা তেমন নয়।

যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত যে এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ নেয়নি, সেটা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয়। ভারতের স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী কৌশলের একটি বড় স্তম্ভ হলো এই যে, চীনের বিরুদ্ধে অবস্থানে ভারতের পাশে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ইংরেজিভাষী দিল্লি এলাকায় প্রভাবশালী জনমত সৃষ্টিকারী মেঘনাদ দেসাই গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘দক্ষিণ চীন সাগরে কী ঘটছে, তার ওপর এখন অনেক কিছুই নির্ভর করবে। যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত ইঙ্গিত পাঠিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে এবং হিমালয়ে যুদ্ধ যদি হয় তবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধ, ভারত থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে। এই তিন দেশ (ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র) এখন খুবই উত্তপ্ত হয়ে আছে।… দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আপনাকে বুঝতে হবে, আমেরিকার সহায়তা ও সমর্থন ছাড়া চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না ভারত। ভারতের সহায়তা ছাড়া চীনের বিরুদ্ধে লড়তে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। এটাই এই সম্পর্কের মাত্রা।’

এটি ভারতের দুর্ভাগ্যের ছবিই এঁকেছে। ভারতীয়রা ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা দেখতে অস্বীকার করছে। তারা বুঝতে পারছে না, আমেরিকার স্বার্থ সরাসরি হুমকির মুখে না পড়লে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে নামবেন না। তিনি কেন হিমালয়ে মেরিনদের পাঠাতে কিংবা ভারত মহাসাগরে চীনা সাবমেরিন ডুবাতে কোনো কেরিয়ার ব্যাটল গ্রুপকে নির্দেশ দিতে বলবেন পেন্টাগনকে?

গত শুক্রবার ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন এবং চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ির মধ্যকার বৈঠকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, দুই শীর্ষ কূটনীতিক দক্ষিণ চীন সাগর বা ভারত মহাসাগর নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করেননি।

মিডিয়াকে টিলারসন বলেন, তার আলোচনায় প্রধান বিষয় ছিল উত্তর কোরিয়া। তিনি আরো বলেন, চীনের সাথে অতিরিক্ত ‘সম্পর্ক প্রতিফলিত’ হয়েছে গত এপ্রিলে ফ্লোরিডায় দুই দেশের মধ্যকার চার উচ্চ পর্যায়ের সংলাপে। তিনি বলেন, ‘ওই বৈঠকে দুই দেশ এই সম্পর্কের প্রকৃতির উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং আমরা কিভাবে সঙ্ঘাতহীন নিরাপদ বিশ্ব রক্ষা করে উপকৃত হতে পারি সেজন্য দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছি।’

মজার ব্যাপার হলো, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বর্ধিত অবরোধ আরোপ প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাসে সহযোগিতা করার জন্য শনিবার এক প্রেস রিলিস প্রকাশ করে চীনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। আগামী নভেম্বরে ট্রাম্প চীন সফরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে, ওয়াং জানিয়েছেন, ওই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা স্রেফ বুঝতে চাইছেন না, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় রয়েছে। ভারতের পক্ষ নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে যুক্তরাষ্ট্র – ভারত সম্পূর্ণ ভ্রান্তভাবে এই কল্পনাবিলাসে ডুবে আছে।

একইভাবে ভারতীয় কৌশলবিদেরা কখনো প্রত্যাশা করেননি, সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়া বিশ্বমঞ্চে প্রত্যাবর্তন করবে। গত সিকি শতক ধরে ভারতের উপর্যুপরি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ককে অবহেলা করায় সেটা এখন ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া-চীন সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকারের গত তিন বছর মেয়াদে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’ ভয়ঙ্কর অবস্থায় উপনীত হয়েছে। সেটা কেবল পাশ্চাত্য বিশ্বের জনমতে নয়, মুসলিমবিশ্বেও।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভারতের সেক্যুলারবাদী ভিত্তিতে ক্ষয়, কাশ্মিরে প্রবল গণআন্দোলন আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। এটাও মনে রাখা দরকার, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা জাতিসঙ্ঘের ৫৪টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করে।

বলা বাহুল্য, ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেলে এই সব উপাদানগুলোর সবাই সক্রিয় হয়ে ওঠবে। বস্তুগতভাবে চীনের সাথে পাল্লা দিতে পারে না ভারত। আর ‘সফট পাওয়ারেও’ ইতোমধ্যে ভারতের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে চীন। কল্পনার স্বর্গরাজ্যে বাস করে আন্তর্জাতিক জনমতের কোনো খবর ভারতীয়রা রাখছে না, চীন এবং এর ছোট ছোট দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মতামতের কথা না হয় না-ই বলা হলো।

এশিয়া টাইমস থেকে অনুদিত

 

শেয়ার করুন