ষোড়শ সংশোধনীকে কেন রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হচ্ছে?

ষোড়শ সংশোধনীকে কেন রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হচ্ছে?

আফসান চৌধুরী,
শেয়ার করুন
ক্যাপ: বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা উদ্বোধনকালে বক্তব্য রাখছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

বাংলাদেশ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এটা বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্বের একটি প্রকাশ। কারণ, এই রায়ের মাধ্যমে বিচাপতিদের অপসারণের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে নিজের হাতে নিয়েছে বিচার বিভাগ। তবে, রায়ের মধ্যে প্রধান বিচারপতি সিনহা তার সহকর্মীরা যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সেগুলোকে ‘রাজনৈতিক’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে আর এর প্রতিক্রিয়াও হয়েছে ততোধিক তীব্র। বর্তমান সংসদে আওয়ামী লীগ এমপি’দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিরংকুশ। ফলে তারা এই ইস্যুর একটি পক্ষ হয়েছে। অন্যদিকে (সংসদের বাইরে থাকা) প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। স্পষ্টত, আওয়ামী লীগও মনে করছে যে এই রায়ের যতটা না বিচারিক প্রভাব তার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি।

মামলার রায়ে উল্লেখ করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে:

ক. মূল সংবিধানে বিচাপরতিদের অপাসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রাখা একটি ‘দুর্ঘটনা’ এবং কমনওয়েলথভুক্ত ৬০ শতাংশ দেশে এই ক্ষমতা বিচার বিভাগের হাতেই ন্যাস্ত। আর সে কারণে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত করা হলো।

খ. সংবিধানের ৭০ ধারার কারণে এমপি’রা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন না। তাই সরকার কোন বিচারপতিকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিলে সব এমপি তা মানতে বাধ্য। ফলে অবাধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই।

গ. জনগণ মনে করছে যে বিচাপতিদের অপাসারণের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকলে তাতে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা খর্ব হয়।

এছাড়াও আরো কিছু পয়েন্ট আছে যেগুলোকে সংসদের জন্য মর্যাদাহানিকর বলে মনে করা হয়। একটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে ‘জাতি গঠন’ একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। এই পর্যবেক্ষণ শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’ মর্যাদাকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন। পঞ্চদশ সংশোধনীতে এই মর্যাদা সংবিধানভুক্ত করা হয়েছে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পর বিএনপি নেতাদের মধ্যে যে খুশির ভাব দেখা দিয়েছে তাতে ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিতে পারে বলে অনেক আওয়ামী লীগ নেতার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে।

সংশোধনীর রাজনীতি

বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সবসময় রাজনীতি কাজ করেছে। চতুর্শ সংশোধনীর মাধ্যমে এক দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, পঞ্চম সংশোধনী ওই শাসনের অবসান ঘটায়, সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক সরকারের ক্ষমতা দখল হালাল করা হয়, ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, এই সরকারের আওতায় ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সরকারগুলোকে বৈধতা দেয়া হয়। বিএনপি’র প্রবল আপত্তির মুখেও পঞ্চদশ সংশোধনীতে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর জের ধরে দলটি ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করে।

রাজনৈতিক আরোগ্য লাভের প্রক্রিয়া এখনো চলছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির বিশৃঙ্খল, উথাল-পাথাল প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংশোধনীগুলো একাধারে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল ও সূচনা। তবে, এটা আসলেই যে কি, সে বিষয়ে কেউ কিছুটা হোঁচট খাওয়া ছাড়া সত্যিকারের কিছু জানে না। এমন মনোভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সজাগ’ থাকতে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবাণী।

ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে এমন সংকট কেন?

এমন এক সময় ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় দেয়া হয়েছে যখন সুপ্রিম কোর্ট ও ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যে বিরোধ একরকম তুঙ্গে, প্রায় সাংঘর্ষিক অবস্থা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জনসাধারণের একটি ক্ষেত্র বিধায় এমন পরিস্থিতি থেকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দূরে থাকতে পারেননি। তিনি সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করেছেন, এমনকি প্রধান বিচারপাতি ও তার আদালত সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যের জন্য দু’জন মন্ত্রীকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করার মতো বিরল ব্যবস্থা তিনি নিয়েছেন, শাস্তি দিয়েছেন। এটি খুবই বিরল একটি ঘটনা।
সুুপ্রিম কোর্টের চত্তর থেকে একটি দেবী’র মূর্তি অপসারণের জন্য ইসলামপন্থীরা যখন আন্দোলন শুরু করে তখন বিচারপতি সিনহা তার অবস্থানে অটল থাকেন। তিনি শুধু সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনের এক স্থানে মূর্তিটি সরিয়ে নেন যা সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। এরপর আন্দোলন থেমে যায়। একজন দৃঢ়চেতা ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে জনগণের মধ্যে বিচারপতি সিনহার একটি ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে।

কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নাটক একটি বড় ঘটনা। আওয়ামী লীগ এই রায়ের সমালোচনা করে এবং প্রকাশিত পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ক্রমেই তুঙ্গে উঠছে।

এদিকে, ঠিক আগের প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান ল কমিশনের চেয়ারম্যান খাইরুল হক সিনহার রায়কে ‘অপরিপক্ক’ এবং বিচারবিভাগের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বলে বাতিল করে দিয়েছেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় দেন খায়রুল হক। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিক্রিয়া মাঝারি গোছের। তিনি বলেন, সরকার রিভিউ আবেদনের মাধ্যমে রায়ের কিছু অংশ বাতিল চাইবে।

কিন্তু ঢাকার গুজবের কারখানায় সময়ের আগ বাড়িয়ে আইনবহির্ভুত ফ্যাক্টর, এমনকি ঘটনাপ্রবাহের গতি প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে সীমান্তের বাইরের কারো হাত রয়েছে কিনা তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হচ্ছে। ষোড়শ সংশোধনীর নিহিতার্থ এবং তা বাতিলের মানে সম্পর্কে খুব কম মানুষের ধারণা থাকায় পুরো ঘটনায় অনেকেই হতবিহ্বল হয়ে পড়ছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের বেশি বাকি না থাকায় কেউ ভাবছেন সামনে অনিশ্চিত দিন অপেক্ষা করছে।

পররাষ্ট্রীয় বিষয় ও স্থানীয় সংশোধনী?

বলা হচ্ছে যে দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত ও চীনের চাপের কারণে আওয়ামী লীগ একটি মানসম্মত নির্বাচন আয়োজনে আগ্রহী। দুটি দেশেরই এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ রয়েছে। এখানে বিষয়টি শুধু আর্থিক নয়, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে তাতে রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে কুবিনিয়োগের খবর আসবে। দু’টি দেশ এখন যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে।

ফলে বাংলাদেশ এর অংশ না হলেও এখানে বড় দাও মারার এটাই উপযুক্ত সময়।
বাংলাদেশে চীনের পদচারণায় ভারতের উদ্বেগ কোন গোপন বিষয় নয়। চীনের আর্থিক সামর্থ্য অনেক বেশি এবং বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বাংলাদেশ সামলাতে পারলে তারা আরো বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ এখানে ঢালতে প্রস্তুত। সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়েও দু’দেশ প্রতিযোগিতা করছে। তবে, দোকলাম অচলাবস্থা সৃষ্টির পর বাজির পণ এখন বিক্রিকে ছাড়িয়ে গেছে।

তবে, বাংলাদেশের জনগণ খুব একটা ভারতের পক্ষে নেই এবং ভারতের হটাকারী পরামর্শে যে রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র প্রকল্প নেয়া হয়েছে তা দেশটির ভাবমূর্তির জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। পরিবেশবাদিদের মতে, এই প্রকল্প সুন্দরবনের জন্য গুরুতর হুমকি। তাই নিকট ও দূর ভবিষ্যতে হাতে আর কি থাকছে তা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন।

তবে, ভৌগলিক নৈকট্য ও আরো অনেক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ ও এর জনগণের সঙ্গে ভারত নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। ব্যবসা ও রাজনৈতিক বিশ্বের এর বিশাল লবি রয়েছে। অন্যদিকে, চীনকে শুধু তার অর্থশক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে এবং সামরিক সরঞ্জামের একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে দেশটি তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হস্ত প্রসারিত করার জন্য আরো জায়গা চান। আর সে কারণেই কোন একটি মাত্র শিবিরের দিকে না ঝুঁকে তিনি এই ভারসাম্যপূর্ণ্য অবস্থা তৈরিতে আগ্রহী। আর সে কারণেই চীন বড় আকারে আসতে পেরেছে। ভারত চীনকে এখান থেকে বহিস্কার করতে চায়। আর, চীন চায় অধিকতর নৈকট্য ও প্রভাব। বাংলাদেশ তাদেরকে তোয়াক্কা না করলেও তারা পরস্পরকে তোয়াক্কা করছে। বাইরে এই খেলাটি কেমন চলছে তা স্পষ্ট নয়।

অগ্রন্থিবন্ধ ও হঠাৎ মনোভাবে পরিবর্তন আসে এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খেলোয়াড়দের প্রতিটি ঘটনার ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখতে হয়। বিএনপি’র জন্য জীবন অনেক সহজ, তারা শুধু ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু এখন ক্ষমতার রাশ হাতে ধরে রাখা আওয়ামী লীগের জন্য যেকোন দিক থেকে খারাপ আঘাত আসতে পারে, ক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।

সবদিকে এমন এক অনিশ্চিত অবস্থা। তাই, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রভাবে ইতোমধ্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠা মাঠে সুপ্রিম কোর্টের এই জোরালো ও বিরূপ অবস্থান আরেকটি ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে কিনা, সম্ভবত তাই ভেবে সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

print
শেয়ার করুন