সাহসী অবাধ্যতার পথ বেছে নিলেন পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ

সাহসী অবাধ্যতার পথ বেছে নিলেন পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন
পাকিস্তান সংসদের অধিবেশন

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক বা নির্বাচিত ও অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের মতো রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। পাকিস্তানের রাজনীতির ওপর দৃষ্টি রাখেন এমন বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক মনে করছেন যে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর থেকে শরিফের কর্মকান্ড তার প্রধানমন্ত্রিত্ব পদ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং, তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরিণ শক্তির ভারসাম্য বেসামরিক প্রতিষ্ঠান তথা পার্লামেন্টের দিকে নুইয়ে দিতে পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি তার লক্ষ্য হাসিলে সফল হবেন কি-না, তা অন্য প্রশ্ন। তবে, পাকিস্তানের বেশিরভাগ জনগণ, বিশেষ করে পাঞ্জাববাসী, এখনো বিশ্বাস  করেন যে দেশকে ‘দুর্নীতিবাজ’ মুক্ত করতে রাজনীতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘সত্যিকারের একটি ভূমিকা’ রয়েছে। এ বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে আকিল শাহ তার সাম্প্রতিক ‘দি আর্মি এন্ড ডেমোক্রেসি’ বইয়ে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেন, পাকিস্তানের (রাজনৈতিক) অভিভাবক হিসেবে সেনাবাহিনীর যে আত্ম-উপলব্ধি তা রাজনীতিতে এর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা রাখার প্রবণতা সৃষ্টিতে দীর্ঘকাল ভূমিকা রেখেছে। এখান থেকেই সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ার পরিবেশ তৈরি হয়।

অযোগ্য ঘোষিত নওয়াজ এখন ইসলামাবাদ থেকে লাহোর পর্যন্ত পদযাত্রা কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। তিনি ও তার দল এখন পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি আক্রমণ করা থেকে বিরত রয়েছেন। তবে এটা স্পষ্ট যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে নওয়াজের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই। ১৯৯০’র দশকে তিনি দু’বার ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত পারভেজ মোশাররফের শাসন চলে। তৃতীয় দফায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তার দলের নেতারা বলে আসছিলেন যে নওয়াজকে ‘ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র চলছে।’ তাই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় অনেকে অবাক হননি। তারা অবাক হয়েছেন এই ভেবে যে সবকিছু সামাল দিয়ে চার বছরের বেশি নওয়াজ কিভাবে ক্ষমতায় থাকতে পারলেন।

এই চার বছর নির্বিঘ্ন ছিলো না। ইসলামাবাদে পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই) যে অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করে তাতে সেনাবাহিনীর কাছে নওয়াজের অবস্থান বেশ দুর্বল হয়। ২০১৩ সালের শুরুতে বলা হয় যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নওয়াজ নিজেই দেখভাল করবেন। তার আমলে পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রীবিহীন অবস্থায় চলে। কিন্তু বিদেশের সবগুলো গুরত্বপূর্ণ সফরে সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন নওয়াজের সঙ্গে। আফগানিস্তানসহ বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সেনাবাহিনীর হাতে ছিলো।

পররাষ্ট্র নীতিতে আপাত অংশীদারিত্বের মধ্যে কোন মতবিরোধ হয়নি তা নয়। সেনাবাহিনী ছিলো বিশেষভাবে সোচ্চার, বিশেষ করে ভারতের ব্যাপারে। নওয়াজ শরিফ একটি ব্যবসামুখি দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের পক্ষে কথা বলেন এবং সুযোগ পেলেই ভারতের মোদি’র সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিতেন।

আফগানিস্তানসহ অন্যান্য নীতিতেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দেয়। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে নওয়াজের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ বিবিসি’কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন যে পাকিস্তান এখনো ‘ভালো ও খারাপ তালিবানদের’ আলাদা দৃষ্টিতে বিবেচনা করছে। তার এ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থানের ইংগিত পাওয়া যায়। এর মানে হলো কোন গ্রুপ এখনো ‘সম্পদ’, আর কোন গ্রুপ ‘দায়’ তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। আর এ নির্ধারণ করছে সেনাবাহিনী। ২০১৬ সালে ডন পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়া একটি খবর নিয়েও মতবিরোধ তৈরি হয়। যা ‘ডন লিক’ নামে পরিচিত। এতে সন্ত্রাস-বিরোধী নীতি নিয়ে সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তুলে ধরা হয়।

এসব মতবিরোধ নওয়াজের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্কে সমস্যা তুলে ধরে এবং ক্রমেই তা বড় ধরনের দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। তবে, এই দ্বন্দ্বের জেরে নওয়াজকে ক্ষমতাচ্যুত করেনি সেনাবাহিনী। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো, গণতন্ত্রের ডানা ছাটাই ও কোন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে ‘সাংবিধানিক উপায়ে’ ক্ষমতাচ্যুত করতে পাকিস্তান সংবিধানে যে কুখ্যাত ৫৮ (২) (খ) ধারা রয়েছে তা সেনাবাহিনীর আওতায় ছিলো না।

তাই নওয়াজের অযোগ্য ঘোষিত হওয়াকে ‘সফট ক্যু’ বা ‘নমনীয় অভ্যুত্থান’ অভিধায় অভিহিত করা হচ্ছে। কারণ, পার্লামেন্টের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হননি। পার্লামেন্টে তার দল শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলো না, প্রধান বিরোধী দল ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)’র সমর্থনও ছিলো তার প্রতি।

নওয়াজ এবং তার আগে ইউসুফ রাজা গিলানি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালাতের দ্বারা অযোগ্য ঘোষিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে ক্রিস্টিন ফেয়ার-এর মতো পাকিস্তানী রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা দেখিয়েছেন কিভাবে একটি ‘নমনীয় অভুত্থান’ ঘটানোর জন্য সর্বোচ্চ আদালতকে অত্যন্ত সর্তকতার সঙ্গে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধারা ৫৮ (২) (খ) কৌশলে আরেক উপায়ে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এখন কুখ্যাতি লাভ করেছে ৬২ ও ৬৩ নং ধারা। তাই কোন ‘খারাপ নৈতিকতা’ কোন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে অযোগ্য ঘোষণার মতো কারণ হতে পারে কিনা তা নিয়ে পাকিস্তানে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

নওয়াজ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, তাই বলে সংগ্রাম শিগগিরই থামছে না। নতুন মন্ত্রিসভা একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেয়েছে। এটা আগের নীতি থেকে পুরোপুরি সরে আসা এবং পররাষ্ট্র নীতির ব্যাপারে সেনাবাহিনীকে দূরে রাখার ইংগিত। এতে কি দ্বন্দ্ব আরো জোরালো হবে? নওয়াজ অবাধ্যতার যে বিপুল শো-ডাউন করেছেন তাতে আগামী মাসগুলোতে, বিশেষ করে আগামী বছরের মাঝামাঝি সাধারণ নির্বাচনের আগে, রাজনৈতিক বিরোধ আরো তীব্র হবে।

আগের ক্ষমতাচুতির পর না হলেও এবার এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই শুধু পরিবর্তন আনবে না, এর মধ্য দিয়ে কল্যাণের বীজ রোপিত হবে। মোট কথা, বেসামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে জনগণকে সংগঠিত করার ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতারা ছাড়া আর কে বেশি কিছু করতে পারে?

পাকিস্তান ও বাইরের অনেকে নওয়াজের কর্মকান্ডকে তার শক্তিশালী ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভিত্তির প্রমাণ বলে বিশ্বাস করেন। তাই বলে এই জনসমাবেশ শরিফের নিজের ভবিষ্যত ও পাকিস্তানের সাধারণ রাজনৈতিক সচলতার ওপর কোন সাধারণ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে না তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।

তাই পানামা রায় ঘোষণা ও প্রধানমন্ত্রী অযোগ্য ঘোষিত হলেও এ মামলার জের এখনো শেষ হয়নি। অন্যদিকে, শরিফ কৌশলে যুদ্ধক্ষেত্রটি আদালত থেকে সরিয়ে সড়ক ও রাজপথে নিয়ে গেছেন। তিনি তার রাজনৈতিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে একটি ‘পাল্টা-অভ্যুত্থান’ ঘটানোর ক্ষমতা তার রয়েছে। তবে, এই ‘ঘরমুখি’ পদযাত্রার বাইরেও আরো কত জনসমর্থন তিনি আদায় করতে পারছেন তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। পিটিআই ছাড়া অন্য দলগুলোর সমর্থন তিনি কতটা আদায় করতে পাররছেন সেটাও দেখার বিষয়।

শরিফের পিএমএল-এন ও পিপিপি ইতোমধ্যে ‘গণতন্ত্রের সনদ’ বলবৎ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। নওয়াজ শরিফ ও বেনজির ভুট্টো ২০০৬ সালে এই চুক্তিতে সই করেছিলেন। এটা পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠায় পরস্পরকে সহায়তা করার ব্যাপারে দুটি দলের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা। এই সমঝোতা অনুযায়ী কোন দলই ‘এস্টাব্লিসমেন্ট’র হাতের ঘুঁটিতে পরিণত হবে না। এই সনদ পুনরুজ্জীবিত করার মানে হলো শরিফের এন্টি-এস্টাব্লিসমেন্ট অবাধ্যতা হবে গণতন্ত্রমুখি, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে।

[সালমান রাফি শেখ পাকিস্তানভিত্তিক সাংবাদিক। দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি, পররাষ্ট্র সম্পর্ক, নৃতাত্বিক সংঘাত ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধি লড়াই নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন। কলামটি সাউথএশিয়ানমনিটর.কম এর জন্য লেখা।]

শেয়ার করুন