বহুমুখি দোটানায় শ্রীলংকা সরকার

বহুমুখি দোটানায় শ্রীলংকা সরকার

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমসিঙ্ঘের কোয়ালিশন সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের দু’বছর পার হয়েছে। এরই মাঝে একের পর এক অনৈক্য এই সরকারকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অভ্যন্তরিণ ও বৈদেশিক নীতিতে বৈপরিত্য এখন প্রকট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
২০১৫ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে ‘ইহানপালানায়া’ বা সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার এরকম বহুমুখি দোটানায় পড়েছে। ফলে এই সরকার যে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে চাইবে না সেটাই স্বাভাবিক।

করুনানায়েককে নিয়ে অনিশ্চয়তা

অনেক ইতস্তত করার পর প্রধানমন্ত্রী বিক্রমসিঙ্ঘে তার দলের লোক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবি করুনানায়েককে পদত্যাগে রাজি করাতে সক্ষম হন। কেন্দ্রিয় ব্যাংকের বন্ড কেলেংকারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে করুনানায়েকের ওপর পদত্যাগের চাপ তৈরি হয়। তার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর অর্জুন আলয়সিয়াস নামে এক স্টক ব্রোকারের সঙ্গে বিতর্কিত লেনদেনে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে, করুনানায়েকের পদত্যাগের পর পরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিক্রমসিঙ্ঘে ও তার নেতৃত্বাধিন ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)’র একটি অংশ পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর আবারো তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে ফিরিয়ে আনতে তৎপরতা শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, তিলক মারাপানা বা সাগালা রাতনায়েক – যাকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হোক না কেন, তা সাময়িক।

বন্ড কেলেংকারি তদন্ত করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট কমিশন যেভাবে করুনানায়েককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন রাজিথা সেনারত্মে ও হর্শ ডি সিলভার মতো মন্ত্রীরা। তারা যৌথ বিরোধী দলের নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসার বিরুদ্ধে নমনীয়তা দেখানোর জন্য এটর্নি জেনারেলকে দায়ি করেন। তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সরকারের শীর্ষ আইন কর্মকর্তার মধ্যে যোগসাজসেরও ইংগিত দেন।

রাজাপাকসা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৮৭টি মামলার ব্যাপারে এটর্নি জেনারেলের দফতর কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা জানতে চেয়েছেন হর্শ ডি সিলভা।

জানা গেছে যে, তদন্তে নিরপরাধ প্রমাণ হলে আবারো মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হবে এমন আশ^াসের পরেই কেবল করুনানায়েক পদত্যাগ করতে রাজি হয়েছেন। ফলে তার মন্ত্রিসভায় ফিরতে বেশি দিন বাকি নেই বলে আশা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিপর্যয়

করুনানায়েক ইস্যু ও তাকে পুনর্বাসনের চেষ্টা প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার বর্তমান অস্বস্তিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি)’তে তার অনুগত এমপি’রা করুনানায়েকের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। বন্ড কেলেংকারি প্রকাশ হয়ে পড়ায় আসন্ন প্রাদেশিক পরিষদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় রকমের মূল্য দিতে হবে বলে প্রেসিডেন্ট আশংকা করছেন। করুনানায়েক যেন পদত্যাগ করেন সে জন্য বিক্রমসিঙ্ঘেকে রাজি করাতে সিরিসেনাকে অত্যন্ত পরিশ্রম করতে হয়। তা না হলে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে তাতে ক্রস-ভোটিংয়ের আশংকা ছিলো। যা সরকারের জন্য আরো বড় বিপর্যয়ের কারণ হতো। তাই করুনানায়েককে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ইউএনপিতে সিরিসেনার অনুসারিরা এমনকি তিনি নিজেও পছন্দ করবে না।

সিরিসেনা তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাপাকসা ও তার অনুচরদের বিরুদ্ধে ৮৭টি মামলা এগিয়ে নিতে এটর্নি জেনারেলকে উদ্বুদ্ধ করতে খুশি মনে রাজি থাকলেও তার গ্রুপের অনেকের তা পছন্দ নয়। এরা ইউএনপি’র সঙ্গে সিরিসেনার হাত মেলানো পছন্দ করেন না। তারা রাজাপাকসার অংশের সঙ্গে মিলে এককভাবে এসএলএফপি’র নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে চান।

কয়েক মাস আগে কোয়ালিশন সরকার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সিরিসেনার ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিলো। তবে, বিষয়টি নিয়ে ইউএনপি’র সঙ্গে আলোচনার জন্য তিনি দলীয় সদস্যদের কাছে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে নেন।

ইউএনপি’র সঙ্গে মূল বিরোধ

এসএলএফপি’তে সিরিসেনাপন্থী এমপিদের অভিযোগ হলো ইউএনপি কোন নীতিগত বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করে না। এমন কি তাদের নির্বাচনী এলাকায় কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতাও তাদেরকে দেয়া হচ্ছে না। এই ফাঁকে নিজেরা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকার বিষয়টি সিরিসেনা নিজেই অনুভব করেন। এই বৈষম্য দূর করতে সম্প্রতি তিনি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ গঠন করেন। এই পরিষদ প্রধানমন্ত্রী’র নেতৃত্বাধিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটিকে নীতি নির্দেশনা দেবে।

কেন্দ্রিয় ব্যাংকের বন্ড কেলেংকারি ও চীনের সঙ্গে হামবানতোতা বন্দর চুক্তি যেভাবে প্রধানমন্ত্রী সামাল দিচ্ছেন তার রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে প্রেসিডেন্ট উদ্বিগ্ন।

হাবমানতোতা নিয়ে এ পর্যন্ত দুটি চুক্তি সই হয়েছে – একটি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে, অন্যটি এবছর জুলাইয়ে। তবে, সরকারের ভেতর ও বাইরে এই চুক্তির বিরোধিতা দেখে প্রেসিডেন্ট বলেন চুক্তিটি ফের সংশোধন করা হবে। তবে, প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন যে চীনের সম্মতি ছাড়া কোন সংশোধন সম্ভব নয়।

ক্ষমতায় গেলে হাবমানতোতা চুক্তি বাতিল করা হবে বলে যৌথ বিরোধী দলের হুমকির পর আইনমন্ত্রী বিজয়দাসা রাজাপাকসে ঘোষণা করেন যে বন্দরটি পুরোপুরি শ্রীলংকা সরকারের নিয়ন্ত্রণে না আনা পর্যন্ত তিনি শান্ত হবেন না। এই চুক্তি একটি উপহাস। এতে ৯৯ বছরের জন্য চীনা কোম্পানি সিএমপোর্টের হাতে বন্দরটি তুলে দেয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বিক্রমসিঙ্ঘের অনুগতরা। দুই মন্ত্রী সেনারতেœ ও ডি সিলভা আইন মন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন তিনি মন্ত্রিসভায় সম্মিলিতভাবে নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে রীতি ভঙ্গ করেছেন।

সাংবিধানিক হেঁয়ালি

বিভিন্ন ইস্যুতে বিজয়দাসা রাজাপাকসের অবস্থান সিরিসেনা-বিক্রমসিঙ্ঘে সরকারের জন্য আরো সমস্যা তৈরি করেছে। দেশের অভিন্ন সমস্যাগুলোতে অভিন্ন নীতি গ্রহণের অভাব রয়েছে – এটা তারই প্রমাণ। তালিমভাষী উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে বৃহত্তর স্বশাসন নিয়ে নতুন সংবিধান রচনার ব্যাপারে সিরিসেনা ও বিক্রমসিঙ্ঘে অন্তত মৌখিকভাবে প্রতিশ্রুতি দিলেও বিজয়দাসা ও তার মতাদর্শের ‘সিনহলী বৌদ্ধ জাতীয়ততাবাদী’রা এর ঘোর বিরোধী। এই ইস্যুতে বিজায়দাসা যৌথ বিরোধী দলের নেতা মাহিন্দা রাজাপাকসার সুরে কথা বলছেন।

সংবিধান পরিবর্তন ঠেকানো ও নিজেকে একজন সিনহলি-বৌদ্ধ-জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বিজয়দাসা রাজাপাকসে বৌদ্ধধর্মের তিন ধারার সর্বোচ্চ সংগঠন ‘মহানায়ক’কে বিবৃতি দিতে রাজি করান। বর্তমান সংবিধানে পরিবর্তনের কোন প্রয়োজন নেই বলে ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এর জবাবে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা আরেক বিবৃতি দিয়ে বলতে বাধ্য হন যে ‘মহানায়ক’র ঘোষিত অনুমোদন ছাড়া নতুন সংবিধান চূড়ান্ত করা হবে না।

ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তামিলরা

কিন্তু, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের বিবৃতি তামিলদের বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে সিরিসেনার নির্বাচনে তামিলদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শ্রীলংকার শীর্ষস্থানীয় তামিল দল – তামিল ন্যাশনাল এলায়েন্স (টিএনএ) দেশের ইতিহাসে এযাবতকালের সবচেয়ে ‘বিশ্বস্ত’ বিরোধী দলের পরিচয় দিয়ে এ পর্যন্ত বিরূপ পরিস্থিতিতে সরকারকে ঠেক দিয়ে রেখেছে। এই টিএনএ’কে পর্যন্ত হতাশ করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী শম্ভুক গতিতে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটছেন।
সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধিন স্টিয়ারিং কমিটিতে আটকে আছে। এই কমিটিতে সিরিসেনাপন্থী সদস্যরাও কোন সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী নন। হতাশ তামিলরা এখন কট্টরপন্থী তামিল ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সি সি বিগ্নেস্বরণের মতো টিএনএ-বিরোধী নেতাদের দিক ঝুঁকছেন।

আটকে আছে নির্বাচন সংস্কার

১৯৪৮ সাল থেকেই তামিলরা বৃহত্তর স্বশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাই সংবিধান পরিবর্তনে তাদের স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হলেও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের পেছনে সংখ্যাগুরু সিনহলি জনগোষ্ঠীর স্বার্থ কম নয়। কিন্তু সংখ্যালঘু ও ছোট ছোট দলগুলোর নানা বিতর্কিত দাবির কারণে নির্বাচন সংস্কার প্রক্রিয়াও আটকে আছে। সরকার ও সংখ্যাগুরু সিনহলিদের দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রাপ্তি-ভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে থাকলেও সংখ্যালঘু তামিল, মুসলমান ও ভারতীয় বংশোদ্ভুত তামিলরা এর বিরুদ্ধে। তারা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার পক্ষপাতি। ভোটার ও নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ নিয়েও সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

নির্বাচন স্থগিত

জাতিগতভাবে বিভক্ত একটি সমাজে এসব বিতর্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, উদ্বেগের বিষয় হলো এসব বিতর্ক কাজে লাগিয়ে সরকার স্থানীয় সরকার ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার পথ খুঁজছে। আগামি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রাদেশিক নির্বাচন হওয়ার কথা। সম্প্রতি সরকার মন্ত্রিসভায় তড়িঘড়ি একটি বিল আনে। এতে প্রাদেশিক নির্বাচন স্থগিত করতে সরকারকে ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়। এসএলএফপি’তে সিরিসেনাপন্থী ও টিএনএ’র মতো দলগুলো এর তীব্র নিন্দা জানায়। এটাই ‘সুশাসনের নমুনা’ এমন উপহাসও করা হয়।

অর্থনীতিতে ধীর গতি

নীতি নিয়ে বিভ্রান্তির কারণেই সরকার যে নির্বাচনে ভয় পাচ্ছে তা কিন্তু নয়। প্রশাসনিক কাজে সমন্বয়ের অভাব বা সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ধর্মঘট, আন্দোলন এখন সাধারণ ঘটনা। যখন তখন সরকারি সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।
অভ্যন্তরিণ ও বিদেশী – দু’ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের অবস্থা লবডঙ্কা। হোটেল ও বিলাসবহুল এপার্টমেন্ট খাতে শুধু কিছু বিনিয়োগ আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ওপর সরকারকে অব্যাহতভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে বড় ধরনের দেনায় সরকার ডুবে আছে।

টাকার অভাবে অবকাঠামো খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এক রকম বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো কোনঠাসা অবস্থায় আছে। এগুলো বাস্তবায়নের কোন সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ হামবানতোতা বন্দর চুক্তি নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে তা আসলে দেশের প্রশাসন ব্যবস্থার সার্বিক অসুস্থতার ফল।

print
শেয়ার করুন