সর্বশেষ রাজনৈতিক ঝাঁকির পরও পাকিস্তানে স্থিতিশীলতা থাকবে?

সর্বশেষ রাজনৈতিক ঝাঁকির পরও পাকিস্তানে স্থিতিশীলতা থাকবে?

শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ শরিফকে অপসারণে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত (যদিও এ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে) রায়ের পর পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতৃত্ব পালাবদলের সহজ ব্যবস্থাপনার ফলে কয়েক মাসের রাজনৈতিক গোলযোগ সম্ভবত এড়ানো গেছে। নওয়াজের দায়িত্ব ত্যাগে বিচারকদের রায় ঘোষণার পর বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট তিক্ত সমালোচনায় মুখর হতে পারতো এবং ইমরান খান ও তার তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হতে পারতো। সেটা হলে সামরিক বাহিনী হয়তো হস্তক্ষেপ করার তাগিদ অনুভব করতো।

বিরোধীদের মধ্যে এক সময় মনে হয়েছিল শরিফ পরিবারের হঠাৎ পতনের পর নেতৃত্বের উত্তরসূরী নিয়ে লীগের মধ্যে ভাঙন দেখা দিতে পারে। কিন্তু সেটা এড়ানো সম্ভব হয়েছে দলের অনুগত শহিদ খাকান আব্বাসিকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করার মাধ্যমে। জাতীয় পরিষদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধাকার প্রেক্ষাপটে তিনি সম্ভবত আগামী গ্রীস্মে নির্ধারিত জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন সম্পন্ন করার দায়িত্বটি পালন করতে সক্ষম হতে পারেন। গত প্রায় ৩০ বছর ধরে বিরাজমান শরিফ পরিবার সম্ভবত এখন বেশ শক্ত অবস্থানেই রয়েছে। নওয়াজের ছোট ভাই শাহবাজ শরিফ দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ পাঞ্জাব প্রদেশে দলের নির্বাচনী ব্যবস্থার কমান্ডেই রয়েছেন। আর পর্দার অন্তরাল থেকে দৃঢ় উপস্থিতি বজায় রেখেছেন নওয়াজ।

তবে কিছু শিথিল সমাপ্তি রাজনীতিবিদদের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিতে পারে এবং এমনকি দেশকে সঙ্কটেও ফেলে দিতে পারে। শাহবাজ ও ইমরানের বিরুদ্ধেও আদালতে মামলা ঝুলে আছে। তাছাড়া নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হবে কিনা সেটাও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তার পরও বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে, দেশটির এলিটরা, বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের জন্য শীতল সময়কেই বেছে নিতে পরেন। অন্তত আগামী নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সম্ভাব্য তৎপরতা স্থগিত রাখতে পারেন তারা।

পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসাটা দেশটির নীতিগত এজেন্ডার ধারাবাহিকতায় সম্ভবত উল্লেখযোগ্য বিষয় হবে। শরিফ আমলের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে বর্তমানে চীনা অর্থায়নে হতে থাকা উন্নয়ন প্রাধান্য পাবে। মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাবলী কাটানোর প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সংস্কার বাধাহীনভাবে চলতে দেওয়া হবে। এলিটরা স্থিতাবস্থাতেই স্বস্তি পাবেন বলে মনে করা হয়ে থাকে। দেশটির জঙ্গি চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে মিশ্র সাফল্যপূর্ণ অভিযানও খুব শিগগির বন্ধ হচ্ছে না। কারণ এসব গ্রুপের প্রতি নির্বাচিত দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে থাকা উদ্দেশ্য আগের মতোই রয়ে গেছে।

পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পরও নির্বাচিত সরকারের সাথে সামরিক বাহিনীর পার্থক্য ব্যাপকভাবে অটুট থাকবে। বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের বিশেষ কিছু জটিলতা কমানো হতে পারে। জেনারেলরা মাঝে মাঝেই শরিফের লাগাম টেনে ধরতেন। তবে আব্বাসি এবং শাহবাজ শরিফ উভয়েই সামরিক বাহিনীর সাথে মসৃণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচিত।

পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতা নিয়ে চীনের ভীত হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে আপাত সাবলীল রাজনৈতিক পালাবদলে তারা স্বস্তি পেয়েছে বলেই মনে হতে পারে। চীনের সাথে সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বেসামরিক কর্মকর্তারই নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের ফলেই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারত ও আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক সম্ভবত অপরিবর্তিতই থাকবে। নওয়াজের মতো কাজে বিশ্বাসী আব্বাসি ও শাহবাজ সম্ভবত ভারতের সাথে সতর্ক সম্পর্ক রক্ষা করে চলবেন। তবে তারাও সামরিক বাহিনীর তৈরি লালরেখার মধ্যেই থাকবেন। আফগানিস্তানের সাথে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণে সীমিত থাকবে। আফগানিস্তান প্রশ্নে আরো সহযোগিতার জন্য চাপ দিয়ে হতাশ ট্রাম্প প্রশাসনকে খুশি করার জন্য নির্বাচনী বছরে পাকিস্তান বড় ধরনের কিছু করার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

যারা এখনো পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির পতন দেখতে আগ্রহী এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন কামনা করেন, তাদের চোখ ইমরান খানের ওপরই থাকবে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে পর্দার অন্তরালের চালিকাশক্তিই ছিলেন তিনি। রাজপথে বিক্ষোভ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনিই সঙ্কটের সূচনা করেছিলেন। তিনি নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তুলে নওয়াজ শরিফ সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি দুর্নীতি নিয়েও শরিফ সরকারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেন। জনসাধারণের রাজনৈতিক বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন, ইমরান খান বর্তমান ব্যবস্থার বৈষম্য এবং আরো স্বচ্ছ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে জনগণের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন।

প্রতিবাদের রাজনীতি ইমরান খানকে যা দিতে পারেনি, সেটা দিয়েছে বিচার বিভাগ। ইমরান বিচার বিভাগের দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। এই বিচার বিভাগের বিচারকেরা তার মতো একই নগর মধ্যবিত্ত সামাজিক শ্রেণীর শিক্ষায় শিক্ষিত। এই অংশের মধ্যেই রয়েছে ইমরান খানের প্রধান সমর্থন। ন্যায়সঙ্গত ও সুষ্ঠু সমাজের গণ আকাংক্ষা পূরণের জন্য জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছ সুশাসনে তার আইডিয়ার প্রতি এই শ্রেণীর সুপ্ত সমর্থন রয়েছে। নওয়াজ শরিফ যে তার মেয়ে মরিয়মকে সামনে এনে পারিবারিক রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার নীতি অনুসরণ করেছিলেন, সেটার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই বিচারকেরা এই রায় দিয়েছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরীর সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে চ্যালেঞ্জ করার বিচার বিভাগীয় তৎপরতার রেশই সম্ভবত এখন দেখা যাচ্ছে। বর্তমান আদালতের চূড়ান্ত রায়ে নওয়াজ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আইনগত বিষয়াদির চেয়ে সম্ভবত নৈতিক অভিযোগই বেশি কাজ করেছে।

ইমরানও সম্ভবত নিশ্চল থাকবেন না। তিনি সরকার পুনঃগঠনের জন্য চাপ বাড়াবেন। তিনি উদ্দীপ্ত হয়েছেন, সাহসীও। সুপ্রিম কোর্ট রায়ের মাধ্যমে যে গতির সঞ্চার করেছে, তিনি সেটা কাজে লাগাতে প্রলুব্ধ হতে পারেন। রায় প্রদানের সময়টাতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে ইমরান নিজেকে এবং তার আন্দোলনকে বেগবান করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আগে মনে করা হতো, ইমরান খানকে সামরিক বাহিনী সমর্থন করছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তিনি সামরিক বাহিনীর সাথে সরাসরি সঙ্ঘাতে যেতে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ক্ষমতায় যেতে পারলে তিনি বেসামরিক শাসন জোরদার করবেন, সেনাবাহিনী যাতে সরকারে ফিরতে না পারে তা নিশ্চিত করবেন।

অধিকন্তু, পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ইমরান পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তানীতিতে সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করতেই প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। তিনি আমেরিকান প্রভাব থেকে পাকিস্তানকে পুরোপুরি সরে আসার এবং সব ধরনের মার্কিন সাহায্য প্রত্যাখ্যান করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের বিরোধি যুদ্ধ থেকে সরে আসার পুরনো দাবির ওপর আবার জোর দিয়ে বলেছেন, ওই যুদ্ধ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী পরিভাষায় সুর চড়াও করে ইমরান আমেরিকান উদ্দেশ্য সম্পর্কে ৯/১১-পরবর্তী ভাবাবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।

আগাম নির্বাচনে বাধ্য করার ব্যাপারে ইমরান খান সফল হননি। এই ব্যর্থতা হয়তো পাকিস্তানিদের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস চাঙ্গা করেছে, গণবিক্ষোভের চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার ধারণা জোরালো করেছে। স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি প্রতিরোধে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সক্ষমতাও এতে প্রমাণিত হয়েছে। ইমরানকে কেবল তার দলের সমর্থকেরাই নয়, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরাও সমর্থন দিচ্ছে। তাদের অনেকে হয়তো তার সামগ্রিক এজেন্ডা সমর্থন করছে না, তবে দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী তার এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করছে।

কোন বেসামরিক সরকারের বদলে কে স্থলাভিষিক্ত হবে- সেনাবাহিনীর তা নির্ধারণ করার দিন থেকে পাকিস্তান সরে এসেছে। এখন যা প্রয়োজন তা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে ইচ্ছুক অংশীদার খুঁজে নেওয়া। সহজেই বোঝা যায়, নওয়াজের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা তৈরিতে সামরিক বাহিনী সহায়তা করেছিল। তবে তার এই সম্পৃক্ততা ছিল সহায়ক হিসেবে, চালিকাশক্তি হিসেবে নয়। অতীতের চেয়ে এবার তারা অনেক কম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এখন ইমরান খানের মতো কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে ক্ষমতায় আরোহণকে তারা অনুমোদন করতে পারে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।

গণতন্ত্রের জন্য আরেকটি আসন্ন পরীক্ষা হলো নওয়াজের নগর বিক্ষোভ এবং পাঞ্জাবের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড দিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া। তার দলের ঐক্য প্রদর্শন এবং তার পরিবারের মধ্যে তার শীর্ষ অবস্থান প্রমাণের জন্যই তিনি এমনটা করেছেন। তিনি এর মাধ্যমে রাজনৈতিক পুনর্বাসনও চাইছেন। তার রাজনৈতিক বিরোধীরা যেসব কৌশল অবলম্বনের জন্য পরিচিতি, নওয়াজ দৃশ্যত সে সবই গ্রহণ করতে প্রস্তুত। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সঙ্ঘাতে জড়িত না হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে যেকোনো বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী বিক্ষোভ স্বাভাবিক মেয়াদকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

পাকিস্তানের গণতন্ত্র পরিণত হয়নি, শক্তিশালীও নয়। এটা টলমলে, তবে স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর দেশটি আইনের শাসন সমুন্নত করার পথেই অগ্রসর হয়েছে। বিষয়টি বিচার বিভাগের অব্যাহত স্বাধীনতা এবং বিচার-প্রক্রিয়ায় গণআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠারই প্রমাণ। আর দেশের জন্য এসব সংস্থা কল্যাণকর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের পারিবারিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্বেও স্বাভাবিকতা রয়েছে। আর অনেক পাকিস্তানি যখন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত, তখন নীতিগত স্থবিরতাও বিরাজ করছে।

মারভিন জি ওয়েনবাম মিডল ইস্ট ইনস্টটিউটের আফগানিস্তান ও পাকিস্তান স্টাডিজের পরিচালক এবং আরবান-ক্যাম্পেইনের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরিটাস।

তৌকির হোসাইন সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত এবং প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজুট্যান্ট প্রফেসর।

print