ভুটানের অনুরোধ কানে তুলছে না ভারত

ভুটানের অনুরোধ কানে তুলছে না ভারত

তেনজিং লামসাং,
শেয়ার করুন

আন্ত:সীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের (সিবিটিই) ব্যাপারে গত বছর ডিসেম্বরে ভারত সরকারের জারি করা দিক নির্দেশনার অনেক বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে প্রায় দু’মাস আগে নয়াদিল্লিকে একটি চিঠি পাঠায় ভুটান। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য পরিচালনার জন্য সিবিটিই নির্দেশনা জারি করার কথা বলা হলেও এর অনেকগুলো দিক ভুটানের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে এতে শুল্ক নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া ভারতের বাজারে বিদ্যুৎ বিক্রি, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের ধরন এবং কোন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি করতে হলে তার ৫১% মালিকানা ভারতীয়দের থাকতে হবে, ইত্যাদি ছাড়াও আরো অনেক বিষয় ওই দিকনির্দেশনায় এসেছে।

গত ২৬ জুলাই ভারত সরকারের প্রধান বিদ্যুৎ কর্তুপক্ষ – বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) – ভুটান সরকারের পত্রের জবাব দিলেও তাতে থিম্ফুর উদ্বেগগুলো সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।

ভুটানের পত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয় তা হলো, এই নির্দেশনার ফলে ভারতের বাজারে ভুটানের প্রবেশ সুবিধা সীমিত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের মূল্য নিয়ে দরকষাকষি করার মতো সুযোগ ভুটানকে দেয়া হচ্ছে না। বরং, চুক্তির আগেই শর্ত বেধে দেয়া হচ্ছে। পরে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই স্বল্প মেয়াদী চুক্তি করা হচ্ছে।

সিবিটিই নির্দেশনা যৌথ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ভুটান-ভারত আন্ত:সরকার চুক্তি (আইজিএ)’র লঙ্ঘন বলেও থিম্ফু উল্লেখ করে। ২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত আইজিএ’তে বলা হয় যে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭০ শতাংশ দুই সরকারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করা হবে।

বাকি ৩০ ভাগ বাজার প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা যাবে। এর মানে হলো ভারতের বাজারে উচ্চমূল্যে এই বাড়তি বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভুটানের এই ৩০% বিদ্যুৎ ভারতের বাজারে বিক্রির ওপর একরকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সিবিটিই।

ভুটান সরকারের পত্রে বলা হয়েছে যে আইজিএ চুক্তি, উল্লেখিত যৌথউদ্যোগী প্রকল্প এবং ভুটান সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত প্রকল্প ও বাণিজ্য কোম্পানিগুলোকে ভারতের সব ধরনের বিদ্যুৎ বাজারে প্রবেশ সুবিধা দিতে হবে।

জবাবে সিইএ জানায় যে বিদ্যুতের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এ পর্যায়ে এসেছে এবং সিবিটিই শুধু ভবিষ্যতের শর্ত ও জরুরি চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

কোন স্পষ্ট জবাব দেয়া ছাড়াই সিইএ জানায় যে বিদ্যুৎ বিতরণ বাজারের বাকি সব ধরনের চুক্তি সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশনের (সিইআইসি) সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় পর্যালোচনার পর বিবেচনা করা যেতে পারে। দিক নির্দেশনায় কোন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি বলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে।

কিন্তু ভুটান এই জবাবে সন্তুষ্ট নয়। কারণ, সিবিটিই’র নীতি ও ভারতীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বিধান ইতোমধ্যে প্রাথমিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে। বিষয়টি এখন মৌখিক আশ্বাস বনাম সুস্পষ্ট বিধানের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভুটান বিদ্যুৎ বাজারের সব ধরনের চুক্তির ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান তৈরির পক্ষে। তবে বাজারে প্রবেশে নিশ্চয়তা থাকলে ব্যতিক্রম করা যেতে পারে বলে তারা মনে করে।
দাগাচু ১২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথাই ধরা যাক। এর ৭৪ শতাংশের মালিকানা ভুটান সরকারের। ২৪ শতাংশ ভারতের টাটা পাওয়ার কোম্পানির।
ভারতের বিদ্যুৎ বাজারে প্রবেশের জন্য সিইআরসি’র কাছ থেকে অনুমতি আদায়ের জন্য ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে টাটা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ব ‘পাওয়ার গ্রিড করর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া’র সাবসিডিয়ারি ন্যাশনাল লোড ডিসপাস সেন্টার (এনএলডিসি) ভারতের বাজারে দাগাচু’র প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। তাদের যুক্তি হলো ভুটানের বিভিন্ন কোম্পানি যখন ভারতের বাজারে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য প্রতিযোগিতা করবে তখনই শুধু ভুটানি বিদ্যুতের ‘সত্যিকারের মূল্য’ জানা যাবে। ফলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে নতুন নির্দেশনা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে সিইআরসি। তখনই ‘ইন্ডিয়ান পাওয়ার এক্সচেঞ্জ’র মাধ্যমে আন্ত:সীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা তৈরির জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়। এর ফলে ভুটান সরকারের হাতে গোনা কয়েকটি প্রকল্পের ভারতের বিদ্যুৎ বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে।

আরেকটি ব্যাপারে ভুটান উদ্বেগ প্রকাশ করে। সিবিটিই বলছে যে, অন্য দেশের এমন কোন বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে শুধু ভারত বিদ্যুৎ কিনতে পারবে যার মালিকানার ৫১ শতাংশ ভারতীয়দের। এই ঘোষণার ফলে ভুটান সরকারের নেয়া দ্রুক হোল্ডিং এন্ড ইনভেস্টমেন্ট (ডিএইচআই) পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে গেছে। গত বছর এই পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় ভুটান থেকে বিদ্যুৎ কিনে ভারতে বিক্রির জন্য কোম্পানি গঠনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিলো এর ফলে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে এবং ভারতের বাজার অনুসন্ধানও জোরদার হবে।

সিইএ বলছে যে, প্রতিবেশি কোন দেশের বিদ্যুৎ কোম্পানি, তা শত ভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানার হলেও, ভারতীয় কোন সত্ত্বার সঙ্গে বাণিজ্য করার কোন বিধান নেই। এমন প্রতিটি ক্ষেত্র আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে।

অংশগ্রহণকারী সকল সত্ত্বার জন্য সিইআরসি’র বিধিগুলো মানা বাধ্যতামূলক করার বিধানও বাতিলের দাবি জানিয়েছে ভুটান।

ভুটানের যুক্তি হলো সিইএ’র বিধানগুলো ভারতে অবস্থিত সকল সত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর কোম্পানিগুলোর জন্য তা প্রযোজ্য হতে পারে না।

ভুটান দেখায় যে ভারত, বাংলাদেশ ও ভুটান ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সিবিটিই দ্বিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের কথা বলছে বিধায় ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য আলাদা কাঠামো প্রয়োজন।

সিইএ বলছে, ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবহণ দেখভাল করবে সিবিটিই।

ভুটানের মতে সিবিটিই’র একটি ধারায় জ্বালানি সহযোগিতা সংশ্লিষ্ট সার্ক’র ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির চেতনার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ব্যাপারে ভারতের একটি গাইডলাইন তৈরি করা উচিত। সিবিটিই শুধু ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বিষয়টি মাথায় রেখেছে বলে মনে হচ্ছে।

সিইএ’র বক্তব্য অনুযায়ী, সার্ক ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে যে আন্ত:সীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট দেশের আইন দ্বারা পরিচালিত হবে। ফলে, ভুটান ও ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্যও দেশগুলোর নিজ নিজ আইন দ্বারা পারিচালিত হবে। অন্যদিকে, সিইএ জানায় যে ভারতের আন্ত:সীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য পরিচালনার জন্য সিবিটিই গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। অন্য দেশ থেকে বিদ্যুৎ আসুক বা অন্যদেশে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হোক বা ভারতের ভূখ-ের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করা হোক – সবক্ষেত্রে এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।

সিবিটিই নির্দেশনার একটি জায়গায় বলা হয়েছে যে, ভারতীয় কোন এনটিটি শুধু রাজ্য সরকার ও ভারত সকারের মালিকানাধিন, অর্থায়নকৃত বা নিয়ন্ত্রিত প্রকল্প এবং যেসব বেসকারি কোম্পানিতে ভারতীয়দের ৫১ শতাংশ মালিকানা রয়েছে সেগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে। এই ধারার ব্যাখ্যা চেয়েছে ভুটান। দেশটির মতে ভারত সরকারের মালিকাধিন বা নিয়ন্ত্রিত শব্দগুলো ভুটানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ও অন্যান্য প্রকল্পগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে।

এই ব্যাখ্যার জবাবে সিইএ শুধু জানিয়ে দিয়েছে যে সরকারের মালিকানা বললে দেশের আইন অনুযায়ী যা বুঝায় তা-ই বুঝানো হয়েছে।

ভারতের এই দিক নির্দেশনা ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ মডেলকে সীমিত করে দিতে পারে বলে থিম্ফুর আশংকা। বাংলাদেশ সরকার বা অন্য কোন বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি ভুটানের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চায় তাহলে এখন তারা পিছিয়ে যাবে।

ভুটান সরকারের একটি সূত্র জানায়, সিইএ’র কাছে পাল্টা জবাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে থিম্ফু। এতে বলা হবে, যে সব যৌথ প্রকল্প এখনো স্থবির অবস্থায় আছে ভারতের বাজারে সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ প্রবেশ সুবিধা পাওয়া না গেলে সেগুলো লাভজনক হবে না।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরও ৮.৮ শতাংশ উদ্বৃত্ত থাকার পাশাপাশি মূল্য কমার আভাস পাওয়ার পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

ভারতের এমন বিধিনিষেধ আরোপ নিয়ে থিম্ফুর কাছ থেকে কোন আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসায় অনেকেই বিস্মিত। অথচ এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এটা শুধু কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, একসময় তা দু’দেশের মধ্যে ‘রাজনৈতিক প্রকল্পে’ রূপ নিতে পারে।

print
শেয়ার করুন