ভারত-চীন দ্বন্দ্বে দম আটকে আছে ভুটানের

ভারত-চীন দ্বন্দ্বে দম আটকে আছে ভুটানের

স্টিভেন লি মেয়ার্স,
শেয়ার করুন
দোকলামের কাছে ভুটানের হা এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদর দফতর, ছবি: নিউইয়র্ক টাইমস

চীনের সঙ্গে ভুটানের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৩ কি.মি. দূরে এই হিমালয়ান রাজ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মূল সেনানিবাস। এখানে একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি, একটি সেনা হাসপাতাল ও একটি গল্ফ কোর্স রয়েছে। এগুলো এই ক্ষুদ্র দেশটির সুরক্ষায় ভারতের ভূমিকার প্রমাণ।

প্রায় দু’মাস আগে চীন ভুটানের সীমান্ত এলাকায় একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ভারত সেখানে সেনা ও সরঞ্জাম পাঠিয়ে নির্মাণকাজে বাধা দেয়। এই অনুপ্রবেশ নিয়ে তীব্র অচলাবস্থা তৈরি হয়। চীনা সৈন্যরা ভারতীয়দের থেকে মাত্র কয়েক শ’ মিটার দূরে প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ – ভারত ও চীনের মধ্যে এই অচলাবস্থা এমন এক সময় সৃষ্টি হলো যখন উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের হুমকি-ধমকি চলছে। সীমান্তে অচলাবস্থা যেমন ১৯৬২ সালের যুদ্ধের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে, তেমনি কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে। উচ্চাকাক্সক্ষা ও জাতীয়তাদের চেতনা ভারত ও চীনকে ফের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে – এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

অন্যদিকে, পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশির প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বে আটকা পড়েছে ভুটান। ক্ষদ্র এই পার্বত্য রাজ্যের জনসংখ্যা মাত্র আট লাখ, যাদের জীবনযাত্রা বেশ রহস্যপূর্ণ। দেশটির সাবেক রাজা তার প্রজাদের কল্যাণ পরিমাপের জন্য ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন।

চীনের সঙ্গে অচলাবস্থায় ভারত নাকি ভুটানের হয়ে কাজ করছে। কিন্তু ভারতের এই হস্তক্ষেপ নিয়ে ভুটানিদের মধ্যে খুব একটা কৃতজ্ঞতাবোধ দেখা যাচ্ছে না। বরং, অনেক ভুটানি মনে করেন যে ভারতের এই আগ বাড়িয়ে রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া তাদের জন্য শ^াসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

ভুটান পর্লামেন্টের বিরোধী দলীয় সদস্য পেমা জিয়ামতসো বলেন, ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে আমাদের অবস্থা হবে স্যান্ডউইচের ভেতরে দেয়া গোশতের কিমার মতো। এমন অবস্থা কারো কাম্য নয়। কিন্তু এখন অবস্থা তাই দাঁড়িয়েছে।

বহু যুগ ধরে ভারতকেই বন্ধু হিসেবে ভুটান বেছে নিয়েছে। অর্ধ শতাব্দি আগে চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লব এবং তিব্বত সংযুক্তি ভুটানিদের উদ্বিগ্ন করে। তিব্বতের সঙ্গে ভুটানের নিবিড় সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত বন্ধন রয়েছে। তখন ভুটানকে রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেয় ভারত। ভুটানও তা মেনে নেয়।

কিন্তু বর্তমান অচলাবস্থা দেশটিতে ভারতের বিরুদ্ধে ধূমায়িত ক্ষোভ প্রকাশ করে দিয়েছে। অনেক ভুটানির আশংকা চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে ভারত বাধা দেবে।

ভুটানের শিল্প-বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি ওয়াংসা সঞ্জয় বলেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবরকম অধিকার ভুটানের রয়েছে। সবকিছুর মূলে এটাই। আমরা আমাদের চাওয়া মতো বাঁচতে চাই, আমাদের চাওয়া মতো বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চাই।

সীমান্তে ৩৪ বর্গ মাইল আয়তনের একটি এলাকা নিয়ে এই বিরোধ। ভুটান ও চীন – উভয়েই এর দাবিদার। ভারত বলছে, ওই এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য চীন সড়ক নির্মাণ করছে। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের মতো চীনের তৎপরতাকে তুলনা করা হয়।

বিতর্কিত এলাকা কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র সরু সংযোগ পথের খুব কাছে। যুদ্ধ বাধলে চীন ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত এই সরু পথ আটকে দিয়ে ভারতের একটি অংশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে বলে আশংকা রয়েছে।

তাই ভুটানকে না জানিয়ে গত ১৬ জুন ভারত তার সেনাদের সীমান্তের ওপারে গিয়ে চীনের কাজে বাধা দানের নির্দেশ দেয়। ভুটান চীনের কাজের নিন্দা জানালেও তারা ভারতকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে কিনা সে বিষয়ে কিছু বলতে নারাজ। ভারত সরকারও এই প্রশ্নটি এড়াতে চায়।

কড়া সুরে কথা বলছে চীন, প্রায় প্রতিদিনই ভারতকে নানাভাবে হুশিয়ার করছে। গত সপ্তাহে দক্ষিণ চীন সাগরে চীন নৌবহরের ডেপুটি কমান্ডার লিউ তাং সতর্ক করে দিয়ে বলেন চীনের ধৈর্য্যরে একটি সীমা আছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির পত্রিকা লিখেছে, চীন- দেশটি অনেক বড়। তাই বলে এর এক ইঞ্চি জমিও ফেলনা নয়।

সম্প্রতি ভারত আরো বেশি সংখ্যক সেনা সদস্যকে প্রস্তুত অবস্থায় রেখেছে। এতে বুঝা যায়, পিছিয়ে আসতে রাজি নয় তারাও।

ভুটানের সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত অচলাবস্থা থেকে দূরে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, এমনকি বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমগুলোও সরকারের অবস্থান অনুসরণ করছে। হা এলাকার জনগণের মধ্যেও এই বিরোধ নিয়ে তেমন উদ্বেগ দেখা যায় না। তবে, এই ঘটনার পর থেকে সীমান্তের ওপারে তিব্বতের বিভিন্ন শহরে গিয়ে ভুটানিদের বাজার-ঘাট করা বন্ধ রয়েছে। পণ্য ঘোড়া-গাধার পিটে চাপিয়ে অথবা মাথায় নিয়ে ভুটানিরা বিক্রির জন্য ওইসব বাজারে যায়। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনে। যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে। ভুটানের মাথাপিছু আয় ২,৭৫১ মার্কিন ডলার। দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকার জনগণের জীবিকার বড় উৎস এ ধরনের ব্যবসা।

হা এলাকার এক দোকানি নিমা দর্জি বলেন যে, গত দু’মাস ধরে সীমান্তের ওপার থেকে জিনিসপত্র আসা বন্ধ রয়েছে। এর জন্য নতুন বাজার খুঁজতে হবে ভেবে তিনি উদ্বিগ্ন। সীমান্তের ঘটনা নিয়ে তিনি কোন কথা বলেন না। কারণ, তা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়।

এ বিষয়ে ভুটানের সরকারি কর্মকর্তাদের নীরবতাও লক্ষ্যনীয়। ভারত বা চীন – কাউকেই তারা চটাতে চান না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কথা বলে না; প্রধানমন্ত্রী শেরিং টবগে’র একই অবস্থা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দামচু দর্জি সম্প্রতি বলেন যে, পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে ও আপসে নিস্পত্তি হবে বলে তিনি আশা করছেন।

তবে ভুটানে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের বেশির ভাগ চীনের চেয়ে ভারতের কর্মকাণ্ডের ওপর বেশি ক্ষিপ্ত। কারো কারো মতে, ভারতের এই কাজ নিশ্চিতভাবে চীনের সঙ্গে সীমান্ত আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলবে। অথচ এই আলোচনার মধ্য দিয়ে দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পথ পরিষ্কার হয়ে আসছিলো। চীনের সঙ্গে ভুটানের চারটি এলাকায় বিরোধ রয়েছে। এর দুটি পূর্বদিকে, দুটি পশ্চিম দিকে। ১৯৯৮ সালে চীন পূর্ব এলাকায় ছাড় দেয়ার বিনিময়ে ভুটানের কাছে পশ্চিম এলাকায় ছাড় দাবি করে। ভুটান এ ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হলেও চূড়ান্ত চুক্তি সই বাকি ছিলো। গত বছর বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় দু’দেশে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছিল। তবে, পরবর্তী দফা আলোচনা কবে অনুষ্ঠিত হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

১৯৪৯ সালে মৈত্রী চুক্তিতে ভুটান তার প্রতিরক্ষার ভার বলতে গেলে পুরোটাই ভারতের হাতে তুলে দেয়। এখনো ভুটানিজ রয়্যাল আর্মিকে প্রশিক্ষণ ও বেতনাদি দেয়। ভুটানের পার্বত্য এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামতের কাজ করে ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা। সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা না হলেও ভুটানে ভারতের ৩০০-৪০০ সেনা রয়েছে বলে জানা যায়।

২০০৬ সালে ভুটানের রাজা জিগমে সিংঘে ওয়াংচুক সিংহাসন ত্যাগ করে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। মূলত এরপর থেকেই দেশটি চীনের দিকে দৃষ্টি দিতে শুরু করে। ২০১২ দেশটির প্রধানমন্ত্রী ব্রাজিলে গ্রুপ-২০ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এর শাস্তিস্বরূপ ভুটানের নির্বাচনের আগে ভারত দেশটিতে সরবরাহ করা রান্না ও জ্বালনি তেলের ওপর ভর্তুকি তুলে নেয়।

চীনের দিকে ভুটানের তাকানোর আরেকটি কারণ হলো অর্থ। শুধু সীমান্ত বাণিজ্য নয়, পর্যটনও ভুটানের একটি বড় শিল্প। ভুটানে যেতে ভারতীয়দের ভিসা লাগে না। কিন্তু চীনাদের এ ধরনের কোন ট্যুর প্যাকেজে যেতে হলে ২৫০ মার্কিন ডলার আগাম পরিশোধ করতে হয়। গত বছর ভারতীয়দের পর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক চীনা ভুটান সফর করে।

ভুটানের এক পর্যটন সংস্থার মালিক পেমা তাসি’র আক্ষেপ – ভুটান ও চীনের মধ্যে সরাসরি কোন বিমান নেই। চীনের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্ক জোরদারের পথে ভারত বাধা দেবে বলে তার আশংকা। বেইজিং-থিম্ফু সম্পর্ক জোরদার হলে বিমান যোগাযোগ চালু হতো।

ভারতের প্রতি ইংগিত করে তিনি বলেন, আমরা আমাদের বড় ভাইয়ের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা মনে করে আমরা যদি উত্তরের (চীনের) ঘনিষ্ঠ হই তাহলে আমাদেরকে তাদের ওপর আর নির্ভর করে থাকতে হবে না।

print