কাশ্মির: সাতচল্লিশে সৃষ্ট, টিকিয়ে রেখেছে ভারত-পাকিস্তান

কাশ্মির: সাতচল্লিশে সৃষ্ট, টিকিয়ে রেখেছে ভারত-পাকিস্তান

আফসান চৌধুরী,
শেয়ার করুন

১৯৪৭ সালের আগস্টে পাওয়া স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে পাকিস্তান। ভারতে উদযাপন ও বিলাপ চলছে একই সঙ্গে। আর এমন এক যুদ্ধে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে কাশ্মিরে রক্ত ঝরছে যে যুদ্ধকে বহু নামে ডাকা হয়। ভারত বলছে কাশ্মির দু’টুকরা হয়ে আছে, একটি টুকরা পাকিস্তানের দখলে। পাকিস্তানের বক্তব্যও অন্যভাবে একই রকম। কাশ্মিরিদের মধ্যেও বহু বিভক্তি। ওপরের দুই পক্ষের একটিকে বেছে নিচ্ছে কেউ। আবার কারো প্রত্যাশা তৃতীয় আরেকটি পথ – কাশ্মিরের আজাদি বা স্বাধীনতা। রাজনীতিতে যা-ই থাক না কেন, আসল কথা হচ্ছে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে কাশ্মির সবচেয়ে তিক্ত ও রক্তপাতের উত্তধিকার বয়ে চলেছে।

১৯৪৭ সালে কি ঘটেছে সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার এখন কোন মানে হয় না। তখনকার ঘটনাবলী আজকের কাশ্মিরে দুর্ভোগের জন্য দায়ি হলেও এই ভূখণ্ডটি ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের জন্যই সহিংসতার একটি ক্ষেত্র হয়ে আছে। এই ভূখণ্ড নিয়ে সেই ১৯৪৭ সালের বিষ এখনো অবিরাম উগড়ে দেয়া হচ্ছে, বিষের তীব্রতা আরো বেড়েছে।

যুদ্ধটি কখনোই কশ্মিরের জন্য ছিলো না, এটা পাকিস্তান-ভারতের অহমিকার দ্বন্দ্ব। পরস্পরের প্রতি এই বিদ্বেষ জোরদার করা হচ্ছে বহুরকম অভ্যন্তরিণ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। অভ্যন্তরিণ রাজনীতিতে এই ঘৃণার মূল্য অনেক এবং তা দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। শত্রু বিদেশী হলে কোন রকম বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশংকা ছাড়াই তা একটি নিরাপদ সামাজিক-রাজনৈতিক ‘সেফটি ভালব’ হতে পারে।

যে ধারণার ভিত্তিতে ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রটির সৃষ্টি হয়েছিলো ঠিক একইভাবে ‘কাশ্মির’র জন্য যুদ্ধ পাকিস্তানের জাতীয় মানসিকতা নির্ধারণ করে চলেছে। পাকিস্তান কখনো একটি সংযুক্ত রাষ্ট্র ছিলো না এবং বিভিন্ন শাখা ও প্রদেশ সবসময় ছিলো ‘ঔপনিবেশিক’। ১৯৭১ সালে অত্যন্ত করুণভাবে এই শিক্ষা পায় পাকিস্তান।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর যখন ভারত চাইলে পূর্ব পাকিস্তান দখল করে ফেলতে পারতো বলে অভিযোগ উঠলো তখন পাকিস্তান বললো, পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার ভার পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। এর মানে হলো কাশ্মির রক্ষা করাকে সবসময় অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের ‘জামিনদার’ হলো সেনাবাহিনী এবং ওই সেনাবাহিনী কাশ্মিরের জন্য লড়াই করে, অনেকবার তারা ভারতের সঙ্গে এ লড়াই করেছে। আর সে কারণে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে শেখ মুজিবের মতো একজন ‘পূর্ব পাকিস্তানী’র হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া অসম্ভব ছিলো। যার দলীয় ইশতেহারে কাশ্মিরের স্বাধীনতার ব্যাপারে নজরকাড়া কোন উল্লেখ ছিলো না।

কাশ্মির নিয়ে ভারতের সঙ্গে যে তীব্র শত্রুতা চলছে তা টিকিয়ে রাখা হবে – এ ব্যপারে পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবের ওপর আস্থা রাখা যায়নি। এই কাশ্মির পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে টিকিয়ে রেখেছে। এটা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর টিকে থাকার প্রশ্ন। তাই সেনাবাহিনীকে বাঁচানোর জন্য ক্রাকডাউন ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিলো না। ‘জামিনদার’ হিসেবে সেনাবহিনীর ভূমিকা পালনের অজুুহাতটি তুলে ধরতে সাহায্য করছে কাশ্মির।

অন্যদিকে, শুধু কাশ্মির নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বিচলিত থাকলে চলে না। কারণ, চীনসহ আরো অনেক শত্রু রয়েছে তার। কিন্তু ‘বৈরিতা’ জিইয়ে রাখতে কাশ্মির অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এর ফলে ‘জাতির ১ নং শত্রু’ হিসেবে অভ্যন্তরিণভাবে জনগণের মধ্যে একটি ঐকমত্য সৃষ্টি হয়। অনেক সাংস্কৃতিক রীতিনীতিতে মিল থাকা দু’দেশের এলিট শ্রেনিরও এতে সুবিধা হয়।

সে লক্ষ্যে ভারত সন্ত্রাসী ও কাশ্মিরকে এক পাল্লায় নিয়ে আসতে সফল হয়েছে। এভাবে দেশটি জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই অজুহাতে কাশ্মিরে তার অনেক কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে বাইরের শত্রু আসলে সামাজিক সংহতি সৃষ্টির পক্ষেই কাজ করছে। কাশ্মির না থাকলে ভারত অভ্যন্তরিণভাবে অনেক ভঙ্গুর হয়ে হয়ে পড়বে।

আসাম: বিস্মৃত বিভাজন

এখন পাঞ্জাব ও বাংলা ছাড়া ১৯৪৭ সালে আর কোন অংশের বিভাজন নিয়ে কেউ কথা বলে না। ১৯৪৭ সালে আসামও ভাগ হয়েছিলো। সেই বিভক্তি ঘটেছিলো মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে। এক গণভোটের মধ্য দিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সিলেট অঞ্চল পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

আসামের বিষয়টি সবার বিশেষ করে ভারতবাসীর ভুলে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্ভবত এটি ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত এবং পাকিস্তানের এই অংশের সঙ্গে ভারতের প্রকাশ্য কোন শত্রুতা ছিলো না। কিন্তু আসামের রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশের অভিবাসী’ ইস্যুটি বেশ পীড়াদায়ক। এই ইস্যুর উৎস খুঁজতে গেলে সেই অষ্টাদশ শতাব্দিতে ফিরে যেতে হবে। হিন্দু পুনরজ্জীবনবাদি দলগুলো ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে সেখানে।

তবে, আসামও যে দেশভাগের একটি ইস্যু ছিলো তা ভুলে যাওয়াই ভালো। কারণ, সীমান্ত সংঘাত না থাকায় এ নিয়ে দু’দেশের রাজধানীতে তেমন কোন আলোড়ন তৈরি হয় না। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের এ বিষয়ে আগ্রহও কম। বিভক্তি কোন বিষয় না হলেও বিভক্তি-পরবর্তী সংঘাত ও রক্তপাত ইস্যু হয়েছে।

বিভক্তির কারণে অব্যাহত বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে – সমস্যা তা নয়। সমস্যা হলো ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রগুলোতে আধুনিক বিনির্মাণের অভাব ছিলো। শাসনযন্ত্রের মনোভাব ছিলো অনুন্নত, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঔপনিবেশিক মনোভাব অব্যাহত থাকে।

কাশ্মিরের সমস্যা এর ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যেই নিহিত। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগুরু রাজ্যটি শাসন করতেন হিন্দু রাজা। রাজনীতি ও জনসংখ্যাগত চালিকা শক্তি যা-ই হোক না কেন, দুই দেশই একে নিয়ে যুদ্ধ করছে। তবু ৭০ বছরেও কোন সমাধান খুঁজে পায়নি। কাশ্মিরবাসীর সীমাহীন দুর্ভোগ বৃটিশদের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার জন্য নয়। বরং তা ওই দেশগুলোর জন্য যারা পরবর্তী ইতিহাসের উত্তরাধিকার হয়েছে, যারা একে নিয়ে যুদ্ধ করেছে। তারা নিজেদেরকে পুরোপুরি আধুনিক রাষ্ট্রের মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

print
শেয়ার করুন