আফগানিস্তানকে ‘ভাড়াটে বাহিনীর রণক্ষেত্র’ বানাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র?

আফগানিস্তানকে ‘ভাড়াটে বাহিনীর রণক্ষেত্র’ বানাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র?

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

ট্রাম্প প্রশাসনের আফগান কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক বিতর্কের পর আজ আমাদের সামনে একটি ভয়ানক ধ্বংসাত্মক প্রস্তাব হাজির করা হয়েছে। প্রস্তাবটি হলো পূর্ণ প্রত্যাহার বা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত বাহিনীকে সরিয়ে নিয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধের ভার বেসরকারি ঠিকাদার তথা মার্সেনারি বা ভাড়াটে বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া। এর চাইতে আত্মঘাতি কৌশল কি আর হতে পারে? সম্ভবত না।

যে ধরনের নীতি তৈরি করা হচ্ছে তাতে বুঝা যায় ‘সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ’ তার স্বীকৃত জায়গা থেকে সরে গেছে। তথাকথিত ‘পুনর্গঠন’ ও ‘জাতি-গঠন’ প্রকল্পগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ অবসানের জন্য তালিবানদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার কোন ইচ্ছা আছে বলে ইংগিত পাওয়া যায় না। অথচ সেই কুখ্যাত ব্লাকওয়াটার’র মতো বেসারকারি ঠিকাদারদের হাতে আফগানিস্তানের নিরাপত্তার ভার তুলে দেয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে আফগানিস্তানে যুদ্ধ ও সহিংসতার ক্ষেত্রটির আরো বিস্তৃতি হবে। কমে আসবে শান্তি ও সমঝোতার সুযোগ। সংঘাত আরো বিস্তৃত হলে তা প্রতিরোধের জন্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নতুন যুক্তি খুঁজে পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘যুদ্ধ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া’ বেশ লাভজনক। এতে অর্থের অনেক সাশ্রয় হয়। এর ফলে নানা উপায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে এবং আফগানিস্তানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। সেখানে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তানের মতো কোন দেশের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ প্রতিরোধ করা যাবে। আফগানিস্তানকে ইউরোশিয়ার একটি আউটপোস্টে পরিণত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে লক্ষ্য তা হাসিল হবে। আফগানিস্তান এমন জটিল একটি দেশ যাকে ছেড়ে যাওয়াও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন। একবিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকৌশল (গ্রান্ড স্ট্রাটেজি)’র অংশ এই দেশ। ইউরোশিয়ার প্রাণকেন্দ্র সামরিকীকরণের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আফগানিস্তান ছাড়লে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই মহাকৌশল পরিত্যাগ করতে হবে।

বেসরকারি ঠিকাদার দিয়ে আফগানিস্তানের যুদ্ধ সামলানোর প্রস্তাব নতুন নয়। তবে, দেশটিতে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে তার পটভূমিতে পুরনো প্রস্তাবটি নতুন প্রাণ পায়। এই হতাশার সুযোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশিল্প, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তারা এখন আমেরিকান বাহিনীকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। তারা যে আফগানিস্তানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের জন্য যুদ্ধ একান্তভাবেই একটি ব্যবসা। আর আফগানিস্তানে যুদ্ধ জারি থাকলে ব্যবসারও প্রসার ঘটবে।

ব্লাকওয়াটার যখন যুদ্ধের ভার তাদের হাতে ছেড়ে দিতে জনমতের পাশাপাশি আমেরিকার নীতি নির্ধারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা শুরু করে তখনই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

ট্রাম্পের মতে আফগান যুদ্ধ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এর আরেকটি মানে হলো যুদ্ধকে কম ব্যয়বহুল করতে হবে। অন্য কারো হাতে দায়িত্ব দিয়ে আমেরিকান করদাতাদের ওপর বোঝা লাঘব করার প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। কিন্তু মজার বিষয় হলো নিয়মিত বাহিনী যা করছে তারচেয়ে বেশি ব্লাকওয়াটার আর কি করতে পারবে তা তার প্রস্তাবে নেই। বরং নিয়মিত বাহিনীর মতো একই প্যাটার্নে যুদ্ধ পরিচালনার কথা বলা হয় তার প্রস্তাবে। তাছাড়া, ট্রাম্পের প্রস্তাবে আফগানিস্তানকে ‘উপনিবেশে’ পরিণত করার বীজ নিহীত। এটা ঠিক বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কৌশলের মতো – একটি একক কর্তৃত্ব ‘ভাইসরয়’-এর মাধ্যমে ভারতে অনুপ্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণ।

ভাড়াটে বাহিনী নিয়োগের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে অনেকে যুক্তি দেন যে আফগানিস্তানে হাজার হাজার বেসরকারি ঠিকাদার কাজ করছে। কিন্তু ভাড়াটে সৈন্যবাহিনী মোতায়েনের কুফল সুদূরপ্রসারি। যেমন, ব্লাকওয়াটারের হাতে যুদ্ধের ভার ছেড়ে দেয়ার মানে হলো যুক্তরাষ্ট্রের মিশনে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। তখন তাদের সামনে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত হওয়ার পথ খুলে যাবে। তারা দেশটিতে তৎপরতা চালানোর অনেক বেশি সুযোগ পাবে। তাদেরকে শুধু জঙ্গিদের সঙ্গে নয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গেও লেনদেন করতে হবে। এগুলোর প্রভাব হবে ব্যাপক। ইরাকে ব্লাকওয়াটারের কর্মকাণ্ড এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

২০০৭ সালে এরিক প্রিন্সের নেতৃত্বে ব্লাকওয়াটারের ভাড়াটে বাহিনী বাগদাদের একটি নগর চত্বরে গুলি চালিয়ে ১৭ ইরাকিকে হত্যা করে। ইরাক যুদ্ধের ইতিহাসে এটা বেসামরিক লোকজন হত্যার একটি মর্মান্তিক অধ্যায়। প্রিন্স আফগানিস্তানের ব্যাপারে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে বাগদাদের মতো একই ঘটনা এখানেও ঘটতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঘাঁটি বা দফতরের মাধ্যমে এসব ভাড়াটে সৈনিক (মার্সেনারি) জোগাড় করা হবে। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে চুক্তি করা বেসরকারি ঠিকাদারদের উপস্থিতিতে কি আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হবে না? বাগদাদের মতো আফগানিস্তানেও তারা যদি কোন ঘটনা ঘটনায় তাহলে কোন আইনে তাদের বিচার করা হবে? নিয়মিত বাহিনীর মতো এদেরকেও কি আফগান আইন থেকে বিমুক্তি দেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার?

তাছাড়া ভাইসরয়ের মতো কোন অবস্থানে ব্লাকওয়াটারকে বসানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা তাকে আফগানিস্তানের ‘জমিদারে’ পরিণত করবে। নির্বাচিত আফগান সরকারের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর হবে তারা। এ কাজ করা হলে, তালিবানসহ অন্য জঙ্গিগ্রুপগুলো আফগানিস্তানে ‘গণতন্ত্র’র যত না ক্ষতি করছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করবে।

বহু ভ্রান্তি ও চোরা বিপদ থাকার পরও আফগানিস্তানে প্রাইভেট বাহিনী পাঠানোর প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের একটি অংশের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রস্তাবের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যেমন জেমস ম্যাট্টিস ও ম্যাকমাস্টার এখনো মুখ খুলেননি। তবে, অন্য এক সিনিয়র কর্মকর্তা ও মুখ্য কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন বেসরকারি ঠিকাদার ব্যবহারের পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন।

হোয়াইট হাউজে এরিক প্রিন্সের পক্ষে সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এই ‘মূল্যসাশ্রয়ী’ পরিকল্পনা যে আফগানিস্তানের মধ্য থেকেই প্রবল বিরোধিতার সম্মুখিন হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে তালিবানদের সঙ্গে আফগান সরকারের সম্পর্ক আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে আলোচনা বা সংলাপের যতটুকু সম্ভাবনা আছে তাও উবে যাবে।

অন্যদিকে, এই পরিকল্পনা সহিংসতার বংশবৃদ্ধি ঘটাবে। সাবেক বেসরকারি ঠিকাদার সিয়েন ম্যাকফেট’র ভাষায়, “মার্সেনারিরাও যুদ্ধ ও দুর্ভোগের বংশবৃদ্ধি ঘটায়। মুনাফার লোভে এসব যুদ্ধবাজ সশস্ত্র সংঘাত বাড়িয়ে চলে। টাকা দেয়ার লোক থাকলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার লোকও পাওয়া যাবে। যুদ্ধ শুরু করা থেকে যতদূর বা যতদিন সম্ভব চালানো যাবে। ইতিহাস স্বাক্ষী ঠিকাদাররা সম্পদ লুণ্ঠনের পেছনে ছুটেছে, নিরপরাধ মানুষ তাদের শিকার হয়েছে।”

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজকের এসইব ‘নিরপরাধ’ মানুষগুলোই আগামী দিনের ‘তালিবান যোদ্ধা’। এভাবেই যুদ্ধ চলবে, আর মুনাফার একটি উৎস হয়ে হয়ে থাকবে। এই প্রস্তাব গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করা হলে সামনে ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে।

print
শেয়ার করুন