আফগানিস্তান নিয়ে বাস্তববাদী পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে

আফগানিস্তান নিয়ে বাস্তববাদী পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

আফগান বিপর্যয়কে বিজয়ে পরিণত করার জন্য কিংবা জয়ের ন্যূনতম সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো বিকল্পই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োগ করা বাকি রাখেনি। যুদ্ধটিতে জয় ক্রমাগতভাবে আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়ার ফলে কেবল হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিরই কারণ হয়নি, সেইসাথে আ লিক রাষ্ট্র ও পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই তীব্র করেছে, সাবেক ‘মিত্রদের’ একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই সব পক্ষের কাছে স্পষ্ট বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন-সমর্থিত আফগান সরকারের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে যে আফগানিস্তানভিত্তিক তালেবানের বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা গ্রহণ’ না করার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করার কুখ্যাত ব্লেম গেম খেলেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা যাবে না। অন্যদিকে তেহরিক-ই-তালেবান এবং অন্যান্য আফগানিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের নিয়ে পাকিস্তানেরও নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে। অর্থাৎ আফগানিস্তান কাদায় ভরা খাদ। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে বাস্তববাদী পদক্ষেপ নিতে হবে, যে পদক্ষেপে ‘আরো কিছু করোর’ দাবি এবং তালেবানের প্রতি ‘বহিরাগত সমর্থনের’ অভিযোগ তুলেই ক্ষান্ত হবে না।

একেবারে মূল প্রশ্ন হলো : পাকিস্তানের প্রতি ‘কঠোর’ অবস্থান কি অর্থপূর্ণ কোনো সাফল্য এনে দেবে? বিকল্পভাবে বলা যায়, পাকিস্তানকে পাশে সরিয়ে রাখার মাশুল কি যুক্তরাষ্ট্র বহন করতে পারবে? আফগানিস্তানে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং তথাকথিত সৈন্য বৃদ্ধি করে কি যুক্তরাষ্ট্র সুফল পাবে?

মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ব্যাপক মতদ্বৈততা রয়েছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা সবেমাত্র পরিস্থিতি টের পেতে শুরু করেছেন। প্রশ্ন হলো যে ট্রাম্প নীতিনির্ধারণী বক্তৃতায় সমাধান দিতে পারেননি, সমন্বয় করতে পারেননি, তিনি কিভাবে পাকিস্তানকে ছাড়া কেবল সৈন্য বাড়িয়ে কিছু করতে পারবেন? আফগানিস্তানে আরো সৈন্য পাঠানোর অর্থ হলো আরো বেশি সরবরাহ ও লজিস্টিকসের প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের জন্য প্রধান সরবরাহ রুট হলো পাকিস্তান। অবাস্তব অভিযোগ এনে (বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্য স্পর্শকাতর বিবেচিত অভিযোগ) ব্যবধান না বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন পাকিস্তানের সাথে আরো সম্পৃক্ত হওয়া এবং সমন্বিত ভূমিকা পালন করা।

ফলে পাকিস্তানের দিকে হাত না বাড়ানো কি উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্র আর আফগানিস্তানের? হাত বাড়ানোর কাজটি যত দ্রুত হবে, ততই মঙ্গল। বস্তুত, এই বার্তাটি পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) নাসের খান জানজুয়া দিয়েছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে, তাদের ৩১ আগস্টের বৈঠকে।

বৈঠকটি কেবল আফগানিস্তান সঙ্ঘাত নিয়ে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরাজমান মতপার্থক্যই সামনে নিয়ে আসেনি, সেইসাথে দ্ব্যর্থহীনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, পাকিস্তান মনে করে, বর্তমান আফগান সরকার শান্তি-প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে সমর্থ্য নয়। এ কারণে পাকিস্তান চায় একটি ‘সমান্তরাল রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করতে। যুক্তরাষ্ট্রই এই কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ ক্ষমতা দেবে। তারা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে সামরিক কমান্ডারদের সাথে কাজ করবে এবং আফগানিস্তান যুদ্ধের দ্রুত স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করবে।

এখানে নিশ্চিতভাবে যেটা পরিষ্কার তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য বাড়িয়ে বা না বাড়িয়ে এই যুদ্ধ শেষ করতে পারবে বলে পাকিস্তান বিশ্বাস করে না। পাকিস্তান মনে করে, পূর্ণ মার্কিন প্রত্যাহারই এই যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করার বিশ্বাসযোগ্য পন্থা।
আফগান সঙ্ঘাত কিভাবে সমাধান করা যাবে তা নিয়ে সম্ভবত এবারই প্রথম পাকিস্তান প্রকাশ্যভাবে তার অবস্থান জানাল। তবে এই প্রস্তাবটি কাবুল সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক শক্তি এবং যুদ্ধ নির্দেশনার কারণে তাদের পক্ষে তা গ্রহণ করা কঠিন।
আফগান সরকার তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকছে। তালেবানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার মতো শক্তি নেই আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর। এ কারণেই ‘সমান্তরাল রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের’ প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে পাকিস্তান।

আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার জন্য মার্কিন প্রত্যাহার করার অর্থ দাঁড়ায় আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন হওয়া। আর এতে করে যুদ্ধবাজদের ঘাড়ে সওয়ার থাকা আফগান সরকারের সম্ভাব্য বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়। তাদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে অকার্যকর ও ভঙ্গুর এবং তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অন্তর্ভূক্তিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা।
আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ সমাপ্তির ফলে কাবুল সরকারে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে তা আফগান তালেবানের দাবির তালিকাতেও ফুটে ওঠেছে। তালেবানের তালিকায় আরো অনেক কিছুর সাথে ‘সাংবিধানিক নিশ্চয়তা,’ নির্বাচন তদারকির জন্য নিরপেক্ষ ও অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠা তালেবান-পরবর্তী আমলে এলিট ও শক্তিশালী যুদ্ধবাজদের (এদের অনেকে বর্তমান কাবুল সরকারের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন) ভূমি দখল তদারকির কথা ছিল।
তালেবানের দাবিগুলো কাবুল সরকারের স্বার্থের সাথে প্রবলভাবে সাঙ্ঘর্ষিক হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বলতে হবে, তা জাতিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট জগাখিচুরির চেয়ে বেশি কিছু। এই সরকার ক্ষমতা ও পৃষ্ঠপোষকতা কোনো নিরপেক্ষ সরকারের হাতে সমর্পণ করবে এমনটা কল্পনা করা খুবই কঠিন, ভবিষ্যতে তালেবানের অন্তর্ভূক্তির বিষয়টি অনিবার্য হওয়ার বিষয়টি না হয় না-ই বলা হলো।

আফগানিস্তানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই সৈন্য বৃদ্ধি কিংবা দোষারাপের খেলা পরিহার করতেই হবে। এই দুটি অস্ত্রে কোনোই লাভ হবে না। যুদ্ধ যদি থামাতেই হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতেই হবে। সংলাপের কৌশল গ্রহণ তাকে করতে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, আফগানিস্তানে ‘বিজয়’-এর অর্থ অনিবার্যভাবে তালেবানকে সামরিকভাবে পরাজয়ের অর্থ বহন করবে না। আফগানিস্তান থেকে ‘নিরাপদে প্রস্থান’ এবং ট্রাম্পের মতে তালেবান উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার প্রতিষ্ঠাতেও ‘বিজয়’ লাভ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনা শুরুর অ-সামরিক কোনো পদ্ধতির কথা বলেননি। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১৬ বছর নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সামরিক সমাধান তথা বিজয় অধরাই রয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে পুরনো কৌশল মৌলিকভাবে পর্যালোচনা করার এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করার। তাছাড়া আফগানিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর দিকেও নজর রাখতে হবে।

পাকিস্তানের প্রতি স্রেফ‘কঠোর’ দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাবুলের দুর্নীতি পরায়ণ সরকারের প্রতি বিরামহীনভাবে সমর্থন প্রদান করাটা কেবল পূর্ণ প্রত্যাহারের অনিবার্যতাকেই বিলম্বিত করবে।

print
শেয়ার করুন