‘পরিবর্তনের’ জন্য নতুন মার্কিন নীতি নিয়ে পাকিস্তানের ভাবনা

‘পরিবর্তনের’ জন্য নতুন মার্কিন নীতি নিয়ে পাকিস্তানের ভাবনা

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

গত ১৯ সেপ্টেম্বর টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার জন্য কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে’ যুক্তরাষ্ট্র। রিপোর্ট অনুযায়ী, কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তানের প্রতি পাকিস্তানের অসহযোগিতা এবং হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা। উত্তর ওয়াজিরিস্তান এবং পাকিস্তানের কেন্দ্র-শাসিত উপজাতীয় অঞ্চলে (এফএটিএ) এই সংগঠনের ঘাঁটি রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তান দাবি করছে। তবে পাকিস্তান এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

ওই প্রতিবেদনে এমন ধারণাও সৃষ্টি করা হয়েছে যে পাকিস্তান যাতে তার নীতি বদলাতে বাধ্য হয়, সেজন্য চাপ সৃষ্টি করার জন্য ‘কঠোর পদক্ষেপ’ গ্রহণ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা সেই কঠোর পদক্ষেপেরই অংশবিশেষ। আরো যেসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র নিতে চাচ্ছে, সে সবের মধ্যে রয়েছে অ-ন্যাটো মিত্র হিসেবে পাকিস্তানের মর্যাদা বাতিল করা। তাছাড়া ওয়াশিংটন মনে করছে, পাকিস্তান আর কার্যকরভাবে ‘চীনা কার্ড’ ব্যবহার করতে পারবে না, কারণ দেশটি ইতোমধ্যেই চীনের কঠোর মুঠোয় চলে গেছে। কিন্তু পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও সামরিক তহবিল হিসেবে যে বিপুল সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র করে আসছিল, তা বন্ধ করে দেওয়ার পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা পূরণ করতে পারবে না চীন।

অর্থাৎ টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, অবরোধ আরোপ করা মাত্র পাকিস্তানের ‘পতন’ ঘটবে। কিন্তু ‘আফপাক’ অঞ্চলের জন্য নতুন মার্কিন নীতির জবাব দিতে পাকিস্তান নিজে যে নীতি প্রস্তুত করছে, তাতে ওই প্রত্যাশিত পতনের ব্যাপারে বলতে গেলে কোনো ইঙ্গিতই নেই।

কোনো কোনো রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের নতুন নীতির ভিত্তি হচ্ছে পাকিস্তানের নিজস্ব ট্রাম্প কার্ড। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর সরবরাহ চলাচলের রুটগুলো বন্ধ করে দেওয়ার এই ট্রাম্প কার্ড পাকিস্তান আগেও অনেকবার ব্যবহার করেছে। এই নতুন নীতির তিনটি উপ-বিকল্প রয়েছে :

১.    যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে সীমিত করা

২.    সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত ইস্যুগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা হ্রাস করা

৩.    আফগানিস্তানের ব্যাপারে অসহযোগিতা। এর মধ্যে থাকবে ন্যাটো/মার্কিন লজিস্টিক সরবরাহের জন্য পাকিস্তানি ভূমি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা।

পাকিস্তান ও মার্কিন কর্মকর্তারা যখনই মিলিত হচ্ছেন (এই যেমন জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আব্বাসি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স বৈঠক করলেন), তখনই সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে থাকলেও উভয় পক্ষের চরমপন্থী কর্মকর্তারা সহযোগিতা অসম্ভব করে তুলছেন এবং হতাশাবাদীরা তাদের হাত শক্তিশালী করতে সক্ষম হচ্ছেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে আরো অন্তত এক দশকের জন্য আফগানিস্তানে সামরিকভাবে প্রাধান্য বিস্তার করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে পাকিস্তান সত্যিই কি তার কৌশলগত নীতি বদলানোর কথা ভাবতে পারবে? তাছাড়া মার্কিন অবরোধও কি সহ্য করতে পারবে পাকিস্তান? কারণ যুক্তরাষ্ট্র কেবল পাকিস্তানের প্রবাসী আয়ের বড় উৎসই নয়, সেইসাথে অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে : পাকিস্তান কতটুকু পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরিত্যক্ত’ করতে পারবে? আর অবরোধ আরোপের মতো অবস্থা সৃষ্টি করাই কি হবে পাকিস্তানের জন্য সঠিক কৌশল?

পাকিস্তানের সরকারি ভাষ্য দৃশ্যত ‘বৈরী’। তবে পাকিস্তানের কূটনীতিকরা (ব্যক্তিগতভাবে) মনে করেন, কার্যকর অবরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সীমিত কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্ভবও নয়, সম্ভাব্য নীতিও হওয়া উচিত নয়।

তাদের মতে, পাকিস্তানের এর বদলে আফগান যুদ্ধকে ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত যে, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তার পক্ষে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। তারা এটাও মনে করেন, পাকিস্তান কূটনৈতিক ফ্রন্টে দুর্বল হওয়ার কারণে তার স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এবং আফগানিস্তানে তার দুর্বলতার দিকগুলো তুলে ধরতে পারছে না। আর এর ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের মনে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে, তালেবানের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে না। কারণ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ পাকিস্তানের নিজস্ব সম্পৃক্ততার কারণে তাকে দেশে সৃষ্ট এবং বিদেশী তহবিলপুষ্ট সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে।

পরিচয় গোপন করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তান সম্ভবত হাক্কানি নেটওয়ার্কের ওপর হামলা না করার সিদ্ধান্তে বহাল থাকবে। কারণ হামলা হলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত কষ্টকরভাবে জয়ী হয়েছে, সেটার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খোলা হলে তারা হয়তো এখন প্রায় ভেঙে পড়া পাকিস্তান তালেবানের সাথে মিত্রতা তৈরি করে পাকিস্তানে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম শুরু করে দিতে পারে। পাকিস্তানে নতুন করে সন্ত্রাসবাদের সূচনা হলে তা কেবল চীনের সাথে ‘উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়’ বাধার সৃষ্টি করবে না, সামরিক ফ্রন্টে আরো বেশি খরচ করতে হবে। পাকিস্তান যথাযথভাবেই পাকিস্তানি ভূখ-ে আফগান যুদ্ধ চালাতে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে না করতে পারে।

‘আরো কিছু’ করার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করার অনেক অজুহাত পাকিস্তানের আছে। পাকিস্তান হয়তো সরাসরি এবং সামরিকভাবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পৃক্ত হবে না, তবে সে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার কৌশলগত সম্পর্ক নষ্ট করাটাও সহ্য করতে পারবে না। পাকিস্তানের উচিত হবে আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে বাস্তববাদী নীতি অবলম্বন করা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অবরোধ আরোপের ফলে ভারতের ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ করে দেবে। সেটা পাকিস্তানের জন্য কেবল ‘অগ্রহণযোগ্যই’ নয়, সেইসাথে ক্ষতিকরও।

তাহলে প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কিভাবে এই বর্ধিত ভূমিকা নাকচ করবে? এর একমাত্র সম্ভাব্য বিকল্প হলো, কূটনৈতিকভাবে বেশি ভূমিকা পালন করা এবং বৈরিতা কম প্রদর্শন করা। নিজের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা জেনে কোনো কৌশল গ্রহণ করা হলে তাতে করে স্থায়ীভাবে ফাঁদে পড়া এবং বলির পাঁঠা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

কিন্তু তারপরও কিছু লাল রেখা থাকে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের জন্য লাল রেখা হলো আফগানিস্তানে ক্রমবর্ধমান হারে ভারতের সম্পৃক্ততা। যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বুঝতে হবে, ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো সমাধানের অংশ নয় এবং তা কোনোভাবেই জয়ের কৌশল হতে পারে না।

অন্যদিকে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে গেলে এবং আফগানিস্তানে ভারতের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রসর হলে ভয়াবহ ত্রিমুখী জটিলতার সৃষ্টি হবে। এতে করে আফগানিস্তানের (এবং সেইসাথে পাকিস্তানের) যুদ্ধটি দিক-নির্দেশনাহীন হয়ে পড়বে। সেইসাথে এই অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় স্থবির হয়ে পড়বে।

print
শেয়ার করুন