শ্রীলংকায় আসছে নির্বাচন, প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপে সিরিসেনা

শ্রীলংকায় আসছে নির্বাচন, প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপে সিরিসেনা

পি কে বালাচন্দ্রন,
শেয়ার করুন

শ্রীলঙ্কার স্থানীয় সরকার এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হওয়ার কথা ২০১৮ সালে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা এবং প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিঙ্ঘের নেতৃত্বাধীন কলম্বোর ইয়াপালান্ন বা সুশাসন সরকার এর জন্য প্রস্তুত নয়।

নির্বাচন স্থগিত করার প্রতিটি কৌশলের মধ্যেই তাদের প্রস্তুতির অভাবের বিষয়টি প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, নির্বাচন পেছনো রাজনৈতিকভাবে সম্ভব নয়।

শিগগিরই নির্বাচনে যেতে সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি) এবং বিক্রমাসিঙ্ঘের নেতৃত্বাধীন ইউনাটেড ন্যাশনাল পার্টিকে (ইউএনপি) নিয়ে গঠিত ঐক্য সরকারের অনীহার অন্যতম কারণ হলো তাদের বড় ধরনের সাফল্য না থাকা।

প্রত্যয়দীপ্ত সূচনা

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সুশাসন সরকার জাতিসংঘ, পাশ্চাত্য ও ভারতের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাফল্য পেয়েছে। অথচ প্রবল ক্ষমতাশালী এসব শক্তিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।

সরকার সংবিধানের ১৯তম অনুচ্ছেদ পাস করানোর মাধমে দুইবারের বেশি কাউকে প্রেসিডেন্ট হওয়া নিষিদ্ধ করেছে, রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো তদারকির জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি অন্য যেসব সমস্যায় জর্জরিত, সেগুলো নজরের বাইরেই থেকে যায়। ফলে তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে থাকে।

পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় ধরনের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে সাধারণ মানুষের জন্য চাকরির সুযোগ বাড়েনি। সরকারি অর্থের বেশির ভাগ নির্মাণ খাতে চলে গেলেও স্থানীয় শ্রমিক সঙ্কটের কারণে সেটা কাঙ্খিত সাফল্য দিতে পারেনি। আবার রাজনৈতিক অনীহার কারণে বিদেশী শ্রমিক এনে চাহিদাও মেটানো সম্ভব হয়নি।

সুশাসনের সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার এবং পূর্বসূরী মহিন্দা রাজপাকসের আমলের হাজার হাজার মামলা তদন্তে নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেও প্রক্রিয়াটি এগিয়েছে সামান্যই।

সরকারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্যের জের ধরে একে অপরকে দোষারোপ করছে। এমনকি একবার প্রেসিডেন্ট নিজে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করেছেন রাজাপাকসের সাথে গোপন চুক্তি করার জন্য। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর দল ইউএনপি প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে বলে, তিনি রাজাপাকসের অনুগত এসএলএফপি অংশকে তার সাথে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

সরকারের মধ্যে ঐক্যের অভাবে নীতি নির্ধারণ, বাস্তবায়নে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।  ইউএনপি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণ করা সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করে দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। এতে করে চীন ও ভারতের মতো প্রধান বিনিয়োগকারীদৈর মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

সাংবিধানিক জটিলতা

সবার মধ্যে সুসম্পর্ক থাকার সময় সরকার সংবিধান নতুন করে প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আশা করা হচ্ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি এবং সংখ্যালঘু তামিলদের মধ্যে ৭০ বছর ধরে বিরাজমান সমস্যাবলী এর মাধ্যমে নিরসন হবে। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, এই কাজে আগ্রহ তত কমছে। উভয় সম্প্রদায়ই আশঙ্কা করছে, নতুন সংবিধানে তাদের অবস্থা আরো নাজুক হবে। পরিণতিতে উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে আরো বেশি করে অনড় থাকছে।

সিংহলিদের মধ্যে এই ধারণা ক্রমশ দানা বাঁধছে, সংবিধান তামিলদের অনেক বেশি সুযোগ দিচ্ছে। আর তামিলরা মনে করছে, সিংহলি ভোটারদের হারানোর ভয়ে সরকার তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে।

নতুন সংবিধানবিষয়ক অন্তর্বর্তী রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে রাজাপাকসের মতো জাতীয়তবাদী এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীর্ষ নেতাদের মতো জাতীয়বাদীরা অভিযোগ করছেন, শ্রীলংকা ‘এককেন্দ্রিক’ রাষ্ট্র থেকে সরে গিয়ে ‘ফেডারেল’ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। তাদের মতে, এর ফলে উত্তর ও পূর্বে তামিল এলাকাগুলো স্বাধীন হওয়ার পদক্ষেপ জোরদার হবে।

প্রত্যাখ্যাত এবং ক্ষমতা হারানোর ভয়ে প্রেসিডেন্টের পক্ষে থাকা সরকারি নেতারা নমনীয় হয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তারা ‘এককেন্দ্রিক’ সরকার থেকে সরে যাবেন না। তারা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীর্ষ অবস্থানেরও কোনো পরিবর্তন ঘটাবেন না।

তামিলদের নিঃসঙ্গতা

সরকারের অবস্থান তামিল নেতাদের উদ্বিগ্ন করছে, তামিল জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অথচ ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা সর্বোতভাবে সিরিসেনাকে সমর্থন করেছিল এই আশায় যে, তিনি তাদেরকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধান দেবেন।

তামিলদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ছাড়াও জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলকে (ইউএনএইচআরসি) দেওয়া ওয়াদাও রক্ষা করতে পারেনি সরকার।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করার (ওএমপি) কাজ এখনো শুরু হয়নি। কথিত যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে তদন্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমও হিমাগারে পড়ে রয়েছে। তামিল বেসামরিক নাগরিকদের কাছে বাজেয়াপ্ত জমি ফেরত দানের কাজে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু নর্দার্ন প্রভিন্সে সামরিক বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি এখনো বেশ অস্বস্তি সৃষ্টি করছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান না পাওয়ার পাশাপাশি এখনো প্রায় ১৩২ জন তামিল বন্দির কারাগারে থাকাটাও তামিলদের জন্য আবেগঘন ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

তামিলরা তাদেরকে ‘রাজবন্দি’ মনে করে। তাদের ২০০৯ সালের মে মাসেই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তবে রাষ্ট্র তাদেরকে এলটিটিই’র ক্যাডার বিবেচনা করে। রাষ্ট্র দাবি করছে, গৃহযুদ্ধের শেষ সময় তারা ৩৮ জন শ্রীলংকার সৈন্য-বন্দিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।

টিএনএ’র সিদ্ধান্ত

তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (টিএনএ) নেতারা মনে করছে, সরকার তদন্ত ও বিচারকাজে গতি আনছে না। অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সিংহলি জাতীয়তাবাদীরা ক্ষেপে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় বন্দিদের মুক্তিও দিচ্ছে না।

এদিকে তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে। তারা মনে করছে, টিএনএ সরকারের ‘অনুগত বিরোধী দল হিসেবে’ প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তাদের মুক্তির জন্য পর্যাপ্ত প্রয়াস চালাচ্ছে না।

তামিলদের এই অবস্থা বিবেচনা করে টিএনএ গত শুক্রবার নর্দার্ন প্রভিন্সে হরতালে পূর্ণ সমর্থন এবং শনিবার জাফনায় সিরিসেনার সফর বয়কটের প্রতি সমর্থন দেয় টিএনএ।

তীব্র বিরোধী এম কে শিবাজিলিঙ্গমের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভকে বেশ সাহসিতকার সাথে মোকাবিলা করেন সিরিসেনা। তিনি তাদের পরিষ্কারভাবে হুঁশিয়ার করে দেন, তামিলরা যদি তার প্রয়াসে সমর্থন প্রদান করা বন্ধ করে দেয়, তবে ‘দানব’ (রাজাপাকসে) তার জায়গা দখল করে নিতে পারেন।

অর্থনৈতিক দিক দিয়েও তামিলদের সহায়তা করতে পারছে না সরকার। তামিল জনসাধারণের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

দল থেকে সুবিধা পাওয়া যাবে কি?

এসএলএফপি-এ নিজের অবস্থান সুসংহত রাখতে সিরিসেনা হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি ‘হাউজ’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারলে ৩১ ডিসেম্বর দলটি ভেঙে যেতে পারে।

একসময় তিনি রাজাপাকসের অনুগতদের মূলা ঝুলিয়ে তথা তাদেরকে মন্ত্রীর পদ দিয়ে কাছে টানার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এই চেষ্টা কাজে লাগেনি। এখন তিনি সাংগঠনিক অবস্থান থেকে তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজের অনুগতদের তাতে বসাচ্ছেন।

তিনি আশা করছেন, রাজাপাকসের শিবির পাবে ক্লান্ত বুড়ো লোকজন আর তার দলে নবীনরা এসে বিরাট কিছু করবে। কিন্তু সরকার যদি গড়পরতা মানের চেয়ে খারাপ করে, তবে নবীনরা কাঙ্খিত  সাফল্য এনে দিতে পারবে না।

print
শেয়ার করুন