ভারতের আফগান-উদ্যোগে রয়েছে সীমাবদ্ধতা

ভারতের আফগান-উদ্যোগে রয়েছে সীমাবদ্ধতা

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্রের আফগানবিষয়ক ‘আঞ্চলিক নীতি’র সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি পুনর্গঠনে ভারতের ভূমিকা। এই নীতির ফলে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ভয়াবহ দ্বন্দ্বের আশঙ্কা সৃষ্টি হলেও গত ১৫ বছর ধরে আঞ্চলিক খেলায় ভারতের সম্পৃক্ততার আলোকে বলা যায়, তা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে সম্ভবত যাবে না।

অবশ্য তার মানে এ কথা বলা হচ্ছে না, ভারত এতে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হতে চাইবে না এ কারণে নয় যে, সে একটি ছায়া যুদ্ধ শুরু করতে চায় না। মূল কারণ হলো আফগানিস্তান নিয়ে ভারতের সরাসরি উদ্বেগ নেই। ফলে দেশটি তার অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।

ভারতের সম্পৃক্ততা যে সীমিত পর্যায়ের হতে যাচ্ছে তা ইতোমধ্যেই সুস্পষ্ট হয়েছে আফগানিস্তানে সৈন্য না পাঠানোর তার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে। এই সিদ্ধান্তের যে কারণ সরকারিভাবে বলা হয়েছে তা হলো, আফগানিস্তানকে ভারত অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে সহায়তা করবে। এর অর্থ হলো আফগানিস্তানে তালেবানের মতো ইসলামি গ্রুপগুলোকে ভারত বৈরী করে তুলবে না। কারণ এতে করে তালেবানের মতো গ্রুপগুলো ভারত অধিকৃত কাশ্মিরসহ ভারতের ভেতরকার এ ধরনের উপাদানগুলোকে চাঙ্গা করে ভারতের জন্য আরো বেশি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের বিবেচনা যদি আমলে নেওয়া হয়, তবে বলতে হবে, ভারত আগে থেকেই আফগানিস্তানে তাদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি ঘটিয়েছে। ভারত ওই উপস্থিতির মাধ্যমেই পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবানের মতো সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে প্রশিক্ষণ, তহবিল এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

ভারত কৌশলগত ও রাজনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখলেও সৈন্য না পাঠানোর মূল কারণ নিহিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর সামরিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার পরিণামের মধ্যে। দেড় দশকের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী জয়ের মুখ দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো যেখানে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, সেখানে তারা কেন সৈন্য পাঠাবে, এমনটাই ভাবছে দিল্লি।

অর্থাৎ প্রশ্নটা দাঁড়ায় এমন: আফগানিস্তানে ভারতীয় সৈন্যরা কি কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারবে? সত্যিই পারবে না। অন্যদিকে যেটা ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে তা হলো, সামরিক সম্পৃক্ততায় ভারতকে জয়হীন ব্যয়বহুল পরিস্থিতিতে নিয়ে ফেলবে। এতে করে আফগানিস্তানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন কাজ করে যে ইতিবাচক ভাবর্মূতি গড়ে তুলেছে, তা কালিমালিপ্ত হবে।

২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তানে ভারত প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এর মাধ্যমে সে এই অঞ্চলের বৃহত্তম দাতায় পরিণত হয়েছে। অবশ্য ভারত তার অনেক নিকটতম প্রতিবেশীর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আফগানিস্তানকে প্রদান করলেও দেশটি কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভারতীয় সাহায্য ও সহায়তা গ্রহণকারী নয়।

আফগানিস্তানে ভূমিকা বাড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে ভারত উৎসাহ পেতে থাকলেও দেশটিতে সাহায্য ও সহায়তা সম্ভবত একই থাকবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৭ সালে আফগানিস্তানের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সহায়তা ছোট্ট ভুটানকে দিয়েছে ভারত। আফগানিস্তানের চেয়ে নেপালও বেশি অর্থ পাবে। এগুলো ভারতের নিজস্ব উন্নয়ন প্রয়োজন ও কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হচ্ছে।

এই অঞ্চলে যে গুটিকতেক স্থানে ভারত তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে, এসব দেশ তার অন্যতম। আর আফগানিস্তান এমন এক দেশ, এখন পর্যন্ত যা ভারত বা চীনের কারো কাছেই বিপুল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন হয়ে ওঠেনি, এই দেশকে অগ্রাধিকার তালিকায় ফেলার মতো আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না ভারতের কাছে।

এমনকি ভারত যদি তার অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়, তবুও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ে জানে, তা হিতে বিপরীত হবে। কারণ একেবারে সহজ: পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে, আফগানিস্তান প্রশ্নে শান্তি আলোচনায় তালেবানের যোগদান যদি কাম্য হয়, মার্কিন বাহিনীর সরবরাহ লাইন যদি পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই আফগানিস্তানে ভারতীয় নিরাপত্তা উপস্থিতি অনুমোদন করতে পারবে না। ভারতের উপস্থিতি যদি অনুমোদন করা হয়, তবে যুদ্ধ শেষ হবে না, শান্তি আলোচনাও হবে না।

অতি সম্প্রতি বিষয়টি স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস। আফগানিস্তানে ভারতীয় সৈন্য পাঠানো হলে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি নতুন করে আরো জটিল হবে- এই কারণে নয়া দিল্লি সৈন্য পাঠাচ্ছে না বলে পাকিস্তানের ব্যাখ্যার জবাব দিতে গিয়ে ওই স্বীকারোক্তি করেন ম্যাটিস।

আফগানিস্তানের বৃহত্তম আঞ্চলিক দাতা হওয়া সত্ত্বেও ভারতের ভূমিকাকে কেন তাহলে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহিত করছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ে বোঝে, পাকিস্তানের আঞ্চলিক নীতি কেবলমাত্র মার্কিনমুখী করার ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে অনেকাংশে খুইয়ে ফেলেছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত মনে করছে, আফগানিস্তানের ব্যাপারে ‘আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি’ যদি ভারতমুখী করা যায়, তবে হয়তো পাকিস্তানকে তার আগের আফগান নীতি পরিবর্তন করার জন্য চাপ দেওয়া যাবে।

আফগানিস্তানে বিশৃঙ্খলার জন্য ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই পাকিস্তানকে চাপ দিতে থাকায় তাদের ওই পরিকল্পনা মনে হচ্ছে না কাজে আসবে।

কঠোর বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ভারতের সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করবে, এমনকি ভারতের অর্থনৈতিক ভূমিকাও একই অবস্থার সৃষ্টি করবে, অন্তত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য।

ভারতের সম্পৃক্ততার পর পাকিস্তান ‘সাইজ’ হওয়ার বদলে দেশটি তখন পাকিস্তানে আরো চীনা ও রুশ উপস্থিতির ব্যাপারে সক্রিয় হবে।

এই প্রেক্ষাপটে চীনা নেতৃত্বাধীন পাক-আফগান-চায়না বাস্তবমুখী সহযোগিতা সংলাপে পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পাকিস্তান-রাশিয়া যৌথ সামরিক মহড়া পাকিস্তানের আঞ্চলিক নীতিই প্রতিফলিত করে।

এই নীতি যে কেবল আফগানিস্তানে ভারতীয় সম্পৃক্ততাকে অকার্যকর করে দেবে না, সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে।

এটা সুস্পষ্ট যে আফগানিস্তান ক্রমবর্ধমান হারে দাবার ঘুঁটি হয়ে পড়ছে, বড় বড় খেলোয়াড়রা একে অপরকে পরাস্ত করার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। যে পদক্ষেপই গ্রহণ করা হোক না কেন, যা-ই করা হোক না কেন, বাস্তবতা হলো যুদ্ধের বদলে আলোচনাই প্রধান অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়ে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত আফগানিস্তানে শান্তি উপহার দিতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো যদি আফগানিস্তানে ‘সামরিক জয়ের’ ধারণায় মজে থাকে, তবে পাকিস্তান, কিংবা রাশিয়া ও চীন কিভাবে আফগান তালেবানকে যুদ্ধ থামিয়ে সংলাপে যোগ দিতে রাজি করাবে?

আফগানিস্তান যুদ্ধের দুষ্ট চক্র সম্পর্কে ভারত সচেতন রয়েছে। আর এ কারণেই সে আফগানিস্তানকে প্রধান অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়ে পরিণত করেনি, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থনৈতিক সহায়তা ও সমর্থনের বাইরে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা কামনা করছে না। এর সীমিত সম্পৃক্ততার একমাত্র অর্থ হলো, আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে সে আফগানিস্তানে নিজস্ব খেলা খেলতে চায়, কাশ্মিরে পাকিস্তানের খেলায় ভারসাম্য আনার জন্য সীমিত আকারে খেলার দিকেই তার আগ্রহ।

print
শেয়ার করুন