আফগানিস্তান: নতুন মার্কিন কৌশলে সৃষ্টি হবে নতুন তালেবান

আফগানিস্তান: নতুন মার্কিন কৌশলে সৃষ্টি হবে নতুন তালেবান

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

আফগানিস্তানে গত কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে দেখা গেছে, জয়ের জন্য বিশেষভাবে আচ্ছন্ন মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারো আফগান তালেবানের ওপর বোমাবর্ষণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেছে। ওয়াশিংটনের বেসামরিক নেতৃত্ব জেনারেলদের যে ছাড় দিয়েছে, সেটা তারা বিশেষভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। আবার আফগান নেতৃত্ব এবং আফগাস্তিানের ঘনিষ্ঠতম মিত্ররাও জয়ের ব্যাপারে মোহগ্রস্ত হয়ে রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, জয় কোনোভাবেই হবে না, এমনটা সুস্পষ্টভাবে না বলা গেলেও সেটা যে কঠিন হয়ে পড়ছে তা ঠিক।

আফগানিস্তান দেখছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির জনগণের ওপর ২০১২ সালের পর অনেক বেশি বোমা পড়ছে। এই কৌশল কিভাবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জয় পেতে সহায়তা করবে তা পরিষ্কার নয়। বর্ধিত বোমায় তালেবানকে হত্যা করলেও সামরিক ক্ষতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ভাবাবেগের জন্ম দিচ্ছে।

এই বিমান হামলা অন্যান্য হামলায় যে সীমিত সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে, সেটাকেও ম্লান করে দিচ্ছে। ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর উত্তরাঞ্চলীয় নগরী জারচিতে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে মার্কিন বিমান হামলা হয়। ওই অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী ছিলেন আফগান পুলিশ বাহিনীর সদস্য আহমদ জাই। তিনি চার মাস আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সবে বাড়ি ফিরেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি মিত্র হিসেবে পরিচিতদের বিমান হামলাতেই নিহত হলেন।

যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় এ ধরনের ক্ষতি আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের আফগানিস্তানে আরো তিন হাজার সৈন্য মোতায়েন করা এবং বিমান হামলার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণ আসলে দেশটিতে সিআইএ’র তাড়া করে হত্যা করার মিশনের নবসূচনা।

তালেবানের ওপর চাপ সৃষ্টি বাড়ানোর জন্য ট্রাম্প প্রশাসন যে ব্যাপক পরিকল্পনা করেছে, তার অংশ হিসেবে অভিযান পরিচালনা করার ব্যাপারে সিআইএর ওপর থেকে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্ব বিবেচনা করে বেসামরিক হতাহত এখন অনেকটাই অনুমোদিত হয়ে পড়েছে।

এত দিন সিআইএ’র প্রধান কাজ ছিল আল-কায়েদাকে পরাজিত করা এবং আফগান গোয়েন্দা বাহিনী এবং মিলিশিয়াদের সহায়তা করা। সংস্থাটিকে নতুন মিশনের দায়িত্ব দেওয়া মানে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসা। এ থেকে আরো বোঝা যায়, রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে নয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন চাচ্ছে সামরিক সমাধান। এটা সংঘাত সমাধানে আলোচনাকে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করারও সামিল।

সিআইএ’র নতুন আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু পার্থক্য সৃষ্টি করবে, তা অস্পষ্ট। অন্যদিকে সংস্থাটির বর্ধিত কলেরবে উপস্থিতির ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্নের সৃষ্টি করবে। গত ১৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধে যক্তরাষ্ট্র যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, এবং ক্ষতি সাধন করেছে, নতুন পরিকল্পনা কি তা পূরণ করতে পারবে?

সম্ভাবনা খুবই কম! যা হতে পারে তা হলো, তালেবানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে যা হবে তা হলো যুদ্ধ আরো তীব্র হবে এবং আরো বেশি লোক মারা যাবে। মার্কিন বোমা হামলায় বেসামরিক হতাহত বাড়ার চিত্রটি ফুটে ওঠেছে এসআইজিএআর’র সর্বশেষ প্রতিবেদনে। গত ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বেসামরিক হতাহতের হার ৫২ ভাগ বেড়ে গেছে।

এসব ঘটনায় এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছে, আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই এবং আফগানিস্তান ‘যুদ্ধ-পরবর্তী’ পরিস্থিতি থেকে অনেক দূরে রয়েছে। আফগানিস্তানবিষয়ক জাতিসংঘ সহায়তা মিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালেবান সারা দেশে অবস্থান করছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

মার্কিন জেনারেল আফগানিস্তান পরিস্থিতিতে ‘স্থবির’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এর বিপরীতে জাতিসংঘ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগান তালেবান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও ‘তারা সামরিকভাবে মার্কিন বাহিনীর চেয়ে ভালো অবস্থানে’ রয়েছে। এ কারণেই তালেবান পক্ষ রাজনৈতিক নিষ্পত্তি প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে না।

আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর মার্কিন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে পক্ষ ত্যাগের হার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। আবার মার্কিন বাহিনী ১৬ বছর যুদ্ধ করেও তালেবানকে হারাতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংলাপই সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে বিরাজ করছে।

জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার এবং সশস্ত্র বিরোধীদের সাথে শান্তি আলোচনা (তালেবানের সাথে সরাসরি শান্তি আলোচনাসহ) হলো আফগানিস্তানের রক্তাক্ত সশস্ত্র সংঘাত সমাধানের একমাত্র বিকল্প।

কিন্তু দৃশ্যত দুটি মৌলিক কারণে সংলাপ হতে পারছে না। প্রথমত, সংলাপের ব্যাপারে তালেবানর নিজেদের থেকে কোনো ধরনের ইচ্ছা প্রকাশ করছে না। অন্তত তাদের ভাষায় আফগানিস্তান যত দিন ‘মার্কিন দখলদারিত্বে’ থাকবে, ততদিন তারা আলোচনায় আগ্রহী নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, আফগানিস্তানে যে ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা সংলাপ আয়োজনের জন্য অনুকূল নয়।

এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে কেবল আফগানিস্তানকে বর্ধিত সামরিকরণের কারণে নয়, বরং নতুন মার্কিন কৌশলে আফগান তালেবানের বৈধতা খারিজ করার জন্যও হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কাতারে আফগান তালেবানের অফিস বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

এই লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের নতুন ধারা সৃষ্টি এবং যুদ্ধ তীব্র করার ক্ষমতা দিয়েছেন।

এর ফলে কী হবে? আর যা-ই হোক না কেন, অন্তত আরো বেশি তালেবান সৃষ্টি করবে।

আফগান যুদ্ধ হলো রাজনৈতিক বিষয়। এর প্রধান রাজনৈতিক শক্তি দুটি: তালেবান এবং আফগান সরকার। দুই পক্ষই পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ চায়। আর বেসামরিক হতাহতের ঘটনা থাকলে যেকোনো যুদ্ধই ব্যাপকমাত্রায় রাজনৈতিকপ্রবণ হয়ে ওঠে। জারচির মতো দায়দায়িত্বহীন বোমা হামলায় বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। আর তাদের দাবি মানা না হলে এবং কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়া না হলে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়, তাদের জঙ্গি বানানোর কাজ সহজ হয়ে পড়ে। জারচির স্থানীয় অ্যাডভোকেট কাবার ওরিয়াখেলের মতে, ‘তারা হয়তো তালেবান বাহিনীতে যোগ দেবে।’

তখন কি যুক্তরাষ্ট্র আরো সৈন্য মোতায়েন করবে, ব্ল্যাক ওয়াটারের মতো অন্যান্য সংস্থাকে কর্তৃত্ব দেবে তালেবানকে তাড়া করে হত্যা করার মাধ্যমে সিদ্ধান্তসূচক জয় অর্জন করতে? হয়তো তা-ই হবে!

print
শেয়ার করুন