পাকিস্তানে কার এবং কিসের বিচার চলছে?

পাকিস্তানে কার এবং কিসের বিচার চলছে?

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

পাকিস্তানের সদ্য ‘অযোগ্য ঘোষিত’ প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি দৃশ্যত তার পরিবার দুর্নীতি ও অর্থ পাচারে ‘প্রমাণিত’ এবং ‘সুপ্রতিষ্ঠিতভাবে’ সম্পৃক্ত থাকায় এখন তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিষয়টা কি এই?

ইতিহাস আমাদের বলে, পাকিস্তানে এমনটা নতুন নয়। এই দেশে প্রধানমন্ত্রীদের কোনো না কোনো কারণে আসা-যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। লিয়াকত আলী খান ছাড়া (তিনি ১৯৫১ সালে নিহত হওয়ায় বরখাস্ত এড়াতে পেরেছিলেন) অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি।

অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগে নওয়াজ শরিফের অযোগ্য হওয়াটা ব্যতিক্রম না হলেও এই ঘটনা এ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত ও অযোগ্যকরণ-প্রক্রিয়ার শুরু হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের পরিভাষায় পাকিস্তান কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে?

দুর্নীতির অভিযোগ এবং অযোগ্য ঘোষণা করা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট ভারসাম্যের বদলে বেসামরিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাতের চিত্রই তুলে ধরে। আর এর মাধ্যমে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং গণতন্ত্রের অসারতাই প্রকট হয়েছে।

এটাই যদি না হবে, তবে কেন শরিফ পরিবার অব্যাহতভাবে বিচার বিভাগ এবং সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের ওপর মৌখিক আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছে? একইভাবে কেন অযোগ্য ঘোষিত প্রধানমন্ত্রী জোরালোভাবে এস্টাবলিশমেন্টের সাথে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য ‘চুক্তির’ কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করা দরকার বলে ভাববেন?

‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন অর্ডার’ (এনআরও) নামে এক ধরনের চুক্তির কথা বাতাসে ভাসছে। গত সেপ্টেম্বরে এক সমাবেশে আওয়ামি মুসলিম লিগের নেতা শেখ রশিদ আহমদ বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, নওয়াজ শরিফ সেনাবাহিনীর কাছে এটি দাবি করেছেন। এ ধরনের পদক্ষেপের নজির আছে: পাকিস্তানের সাবেক সামরিক একনায়ক পারভেজ মোশাররফ ২০০৭ সালের ৫ অক্টোবর একটি এনআরও জারি করে দুর্নীতি, খুন, সন্ত্রাসবাদ ও অর্থপাচারের সাথে সম্পৃক্ত পিপিপির অসংখ্য রাজনীতিবিদ, সহযোগী ও আমলাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু নওয়াজ শরিফ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিচার বিভাগের প্রতি সরাসরি সমালোচনা করে এবং আগের এনআরও’র প্রতি ইঙ্গিত করে বিচারিক আদালতের শুনানির ঠিক এক দিন আগে শুক্রবার শরিফ বলেন, তিনি এনআরও’র মাধ্যমে কোনো চুক্তি চান না কিংবা ‘স্বৈরাচারকে স্বাগত জানানো, অনিবার্যতার মতবাদ অনুমোদনকারী এবং তাদেরকে মালায় ভূষিতকারী’ বিচার বিভাগের সমর্থক হতে চান না।

পর্দার আড়ালে এস্টাবলিশমেন্টের কথিত ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন শরিফ। তিনি ক্ষমতাসীন পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করায় পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলি জারদারির সমালোচনা করে বলেছেন, যখন ‘সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্যের’ তীব্র প্রয়োজন ছিল, তখন পিপিপি ‘নির্দিষ্ট মহলকে’ খুশি করার চেষ্টা করছে। তিনি এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বিধানের কৌশল নিয়ে কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন।

অবশ্য এই প্রসঙ্গে ১৯৯০-এর দশকের ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। ওই সময় পাকিস্তানের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো- নওয়াজ শরিফ ও বেনজির ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ ও পিপিপি জঘন্যভাবে একে অপরের পা ধরে টেনে ক্ষমতাসীন দলকে মেয়াদ পূরণ না করতে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল।

পরিণতিতে তথাকথিত ‘গণতন্ত্রের দশকে’ নওয়াজ শরিফ ও বেনজির ভুট্টো দুবার করে ক্ষমতাচ্যুত হন। ওই যুগটির সূচনা হয়েছিল ১৯৮৮ সালে সামরিক একনায়ক জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর এবং ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে পারভেজ মোশাররফের অভ্যুত্থান পর্যন্ত তা চলেছিল।

ওই দশকে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সংঘাত দৃশ্যমান হয়েছিল। ওই দশকেই প্রধানমন্ত্রী পদে নওয়াজ শরিফ থাকাবস্থায় পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে হামলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিনিই এই কাজটি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আজকে তার আদালতের সমালোচনা করাটা প্রায় ২০ বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হচ্ছে।

এই সংঘাত গুণগতভাবে তীব্র হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত জুনে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) এবং ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছিল। ওইসময় জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) শরিফ পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার অভিযোগ তদন্ত করছিল। তখন সুপ্রিম কোর্টের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় এই বলে, আইএসআই এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের (এমআই) ব্যক্তিসহ জেআইটি সদস্যদের ফোন টেপ করছে আইবি।

ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (এনএবি), ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ), স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান (এসবিপি) এবং সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অব পাকিস্তানের (এসইসিপি) জেআইটি সদস্যরাও অভিযোগ করেন, তাদের ফোনে আড়িপাতা হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী নিজে ফোনে আড়িপাতার নির্দেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

যা কিছু ঘটছে এবং যে বিবরণ সংক্ষেপে এখানে দেওয়া হলো, তা সত্ত্বেও সঙ্কটের ট্যাগলাইন ‘পানামা ইনভেস্টিগেশন’ বহাল থাকায় পাকিস্তানকে আরো উন্নত ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়ার মনমুগ্ধকর ছবির আভাস দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া এই মামলা পাকিস্তানকে একবারে চিরদিনের জন্য দুর্নীতিমুক্ত করার বিশাল পদক্ষেপ হিসেবেও অভিহিত করা হচ্ছে।

তবে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন এলিটরা দশকের পর দশক ধরে জনগণকে যেসব কল্পকাহিনী বলে আসছেন, তার আলোকে এ ধরনের সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখানো নতুন কিছু নয়।

এসব কল্পকাহিনী সত্ত্বেও পাকিস্তানের জনগণ দুর্নীতিমুক্ত বা গণতান্ত্রিক কোনো দেশই পায়নি।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় এবং সব প্রধান রাজনৈতিক দলের রাজনীতিবিদরা এ ধরনের সঙ্ঘাত এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে থাকায় যেটা মনে হচ্ছে তা হলো পাকিস্তানে যদি কারো বিচারের আয়োজন করা হয়ে থাকে তবে তা হচ্ছে গণতন্ত্রের। এই বিচারে একটি পরিবারের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আসলে গৌণ বিষয়।

আমি একথা বলছি না যে কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা উচিত নয়। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো এই প্রশ্ন অবশ্যই জিজ্ঞেস করতে হবে: কেন এ ধরনের তদন্ত রাজনৈতিক সঙ্কটে পরিণত হলো, বিচার বিভাগ ও এস্টাবলিশমেন্টের মতো প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন সম্পৃক্ত করা হলো?

এখনকার পরিস্থিতি ১৯৯০-এর দশকের তথাকথিত ‘গণতন্ত্রের যুগের’ মতোই মনে হচ্ছে। পাকিস্তানের তথাকথিত ‘গণতন্ত্রে রূপান্তর’ ক্রমবর্ধমান হারে এমনই হয়ে যাচ্ছে। এতে করে প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে, গত প্রায় এক দশক বলবত থাকার পরও এই রূপান্তর কতটুকু প্রকৃত ও অর্থপূর্ণ হয়েছে?

print
শেয়ার করুন