যুক্তরাষ্ট্রের আফগান কৌশল: সময় এখন ভারতের অন্য দিকে ফেরার

যুক্তরাষ্ট্রের আফগান কৌশল: সময় এখন ভারতের অন্য দিকে ফেরার

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘নতুন’ আফগান কৌশল এবং তাতে ভারতের ভূমিকার প্রতি সর্বাত্মক নজর দেওয়া সত্ত্বেও আফগানিস্তানের বাস্তবতা এবং সত্যিকারের অবস্থা হলো এই যে যুক্তরাষ্ট্র জয় তো দূরের কথা, পাকিস্তান এবং এর প্রধান মিত্র চীনের সহযোগিতা ছাড়া যুদ্ধটা শেষ করতে পারবে কিনা সেই আশা পর্যন্ত নেই যুক্তরাষ্ট্রের। তাছাড়া ভারতও পারছে না আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও সমন্বয় সাধনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পরিকল্পনা তৈরি করতে।

যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ভারত যেন আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যেই তার ভূমিকা সীমিত রাখে। যুক্তরাষ্ট্র এমনকি পুনর্গঠনেরও আশা করছে না, কারণ সমন্বয় না হলে পুনর্গঠন বাধা হয়েই থাকবে। ভূমিকা সীমিত রাখার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, সমন্বয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে পাকিস্তান ও চীনের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে একথাই স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে, আফগান সরকার এবং আফগান সমাজের ওপর ভারতের প্রভাব খুবই কম।

বর্তমানে বিরাজমান অবস্থা সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়া চার দেশীয় সহযোগিতা গ্রুপকে (কিউসিজি) চাঙা করার বিষয়টি বলা যেতে পারে। কিন্তু তা দৃশ্যত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নতুন’ আফগান কৌশলের অংশ নয়। আফগানিস্তানের বিভিন্ন অংশে তালেবান হামলার কারণেই গ্রুপটিকে চাঙা করা হয়েছে, তা নয়, বরং ১৬ বছর ধরে সামরিক সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষ করতে না পারার বাস্তবতা উপলব্ধির কারণেও তা করা হয়ে থাকতে পারে।

ভারতের জন্য এ ধরনের গ্রুপের পুনর্জীবনের অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে পাকিস্তানের সাথে সম্পৃক্ততা থাকাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকে।  ওবামা প্রশাসনের আমলে গঠিত কিউসিজিতে ট্রাম্পের আমলে কোনো ধরনের পরিবর্তন না আনাতেই বিষয়টি দৃশ্যমান। আফগানিস্তানে ভারতকে সামনে আনার মার্কিন প্রয়াস সত্ত্বেও সমন্বয় সাধন উদ্যোগ থেকে ভারতকে বাদ রাখা হয়েছে।

এই গ্রুপের পুনর্জীবনের পাশাপাশি ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন, তিনি পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন। কিন্তু তার প্রশাসন চরমপন্থীদের প্রতি জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করা সত্ত্বেও সন্ত্রাসের মোকাবিলায় সমানভাবেই পাকিস্তানের সহযোগিতা চাইছে। মনে হচ্ছে, কেবল ইন্ডিয়ান ফ্যাক্টরকে ব্যবহার করার জন্যই পাকিস্তানের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

কিন্তু পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা যদি না কমত, তবে এমনটা হতে পারত না। পর্দার অন্তরালে এবং গোপন কূটনীতির কারণেই ইতিবাচক ফল এসেছে, অকার্যকর হয়ে পড়া ফোরামটি পুনর্জীবন পেয়েছে।

গত ২০ অক্টোবর পাকিস্তান পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। আমাদের মধ্যে ইতিবাচক বোঝাপড়া এবং ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৪ অক্টোবরের বার্তাটির প্রশংসা করি। তাতে তিনি বলেছেন, আমরা পাকিস্তান এবং দেশটির নেতাদের সাথে আরো ভালো সম্পর্ক তৈরির কাজ শুরু করেছি। তিনি অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে অনেক বার্তা দিয়েছেন।

ফোরামটি পুনর্জীবন আরেক অর্থে ট্রাম্পের নতুন আঞ্চলিক নীতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি পদক্ষেপ। গত আগস্টে ট্রাম্প যে নতুন দক্ষিণ এশিয়া নীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন, তাতে তালেবানের সাথে শিগগির আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তালেবানের সাথে আলোচনার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক সমাধানের ওপর পুরোপুরি ভরসা করে থাকছে না।

আফগানিস্তানে ইচ্ছামতো ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে ভারতের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখানে অনিবার্যভাবে চীনকে তার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করে না।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেভাবে এগুচ্ছে, তাতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে ঘনিষ্ঠতাই বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় ট্রাম্প বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের চীন সফরকালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে আলাস্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য চায়না পেট্রোলিয়াম এবং কেমিক্যাল করপোরেশনের মধ্যে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি। এই চুক্তির আর্থিক সহায়তা আসবে চায়না ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন এবং ব্যাংক অব চায়না থেকে। চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দীর্ঘ মেয়াদি সরবরাহের জন্য চেরি এনার্জির সাথে প্রাথমিক চুক্তি করেছে। নতুন সিল্ক রোড/বিআরআই এগুনোর জন্য পিপলস ব্যাংক অব চায়নার সাথে সম্পর্কিত সিল্ক রোড তহবিল প্রতিষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ তহবিল প্রতিষ্ঠার জন্য। চায়না ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন যৌথ তহবিল প্রতিষ্ঠা করবে গোল্ডম্যান স্যাচের জন্য। আর বোয়িং থেকে আরো বিমান কিনবে চীন, আরো বেশি টেসলা গাড়ি আমদানি করবে।

কিউসিজি আবার চাঙা করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কেন চীনের সাথে থাকাতে ‘স্বস্তি’ অনুভব করে এবং তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে পাকিস্তানের সহায়তার সুযোগ নিচ্ছে তার ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যেতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য খুবই ভালো হয় এই বিশ্লেষণ করা যে, তালেবানকে সমর্থন দেওয়ার জন্য যে পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেই দেশের ওপরই যখন যুক্তরাষ্ট্র ভরসা করে এবং আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চীনের দ্বারস্থ হয়, তখন ভারত কিভাবে আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে তার নিজস্ব আঞ্চলিক শক্তি বাড়াতে পারবে?

এ কারণে আফগানিস্তানের ব্যাপারে নয়া দিল্লির উচিত হবে আরো বিচক্ষণ হওয়া এবং উপলব্ধি করা, যুদ্ধ অবসানের জন্য সংলাপ আবার শুরু করা আসলে পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার পাকিস্তানি পরিকল্পনার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের পরোক্ষ অনুমোদন। আফগান সমন্বয়-প্রক্রিয়া কোনো পর্যায়েই নয়া দিল্লি কোনো অংশ নয়। আর বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সাহায্য ছাড়া ভারতের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আর কিছু চায় কিনা সেটাও বলা কঠিন।

ফলে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে চালকের আসনে নিজেকে কল্পনা করার বদলে ভারতের প্রয়োজন আফগানিস্তানে কিভাবে ভূ-রাজনীতি পরিবর্তিত হচ্ছে তা লক্ষ্য করা। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কর্নেল লরেন্স সেলিন ঠিক এ কথাটিই বলেছেন। তার মতে, এটা স্রফ বিপরীত ধারার দিকে চলা। আপনি যদি তালেবানের সাথে যোগাযোগ করতে চান, তবে পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, আবার পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে চীনকে পেতে হবে। অর্থাৎ চালকের আসনে বসে আছে চীন।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের জয়-অসাধ্য যুদ্ধে অন্ধভাবে নিমজ্জিত হওয়ার বদলে ভারতকে এখন তার অবস্থানকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

print
শেয়ার করুন