যুদ্ধব্যয় মেটাতে আফগানিস্তানের খনিজসম্পদের দিকে নজর যুক্তরাষ্ট্রের

যুদ্ধব্যয় মেটাতে আফগানিস্তানের খনিজসম্পদের দিকে নজর যুক্তরাষ্ট্রের

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও তার সামরিক বাহিনীর কাজে আরো সম্পদ নিয়োজিত করতে ও তালেবানকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করার নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে মার্কিন জাতি গঠন এবং পুনর্গঠন কর্মসূচি থেকে ইতোমধ্যে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন বলে মনে হলেও নতুন কৌশলের অংশবিশেষ অন্তত আফগানিস্তানের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ তাদের কাজে  ব্যবহার করার লক্ষ্যে প্রণীত। তারা তা ব্যবহার করবে তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের তহবিল সংস্থানের জন্য। অথচ এই সম্পদ আফগানিস্তানের টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহৃত হতে পারত।

কিছু কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘দক্ষ’ ব্যবসায়ী হিসেবে ট্রাম্প ধীরে ধীরে আফগানিস্তানে অনন্ত যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে দেশটিকে বাধ্য করার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

তবে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে সংগ্রহ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আফগানিস্তানে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের আনুমানিক মূল্য অন্তত তিন ট্রিলিয়ন ডলার। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত আফগানিস্তানের জন্য এই সম্পদ বিশাল কিছু। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ না থামিয়েই এসব সম্পদ উত্তোলনে জোর দিচ্ছে। আফগান প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার কথাও বলেছেন।

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আফগান রাষ্ট্রদূত হামদুল্লাহ মহিব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি গত জুনে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।’ আর হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, গত জুলাইয়ে হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠকে ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন, আফগান সরকারকে ‘সহায়তার’ বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে আফগানিস্তানের খনিজসম্পদের একটি অংশ দাবি করা।

আগস্টে বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যায় ট্রাম্পের একটি বক্তব্যে। ২১ আগস্ট ভার্জিনিয়ার ফোর্ট মায়ারে তিনি বলেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় মেটাতে সহায়তার জন্য  আমরা দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশ নিতে যাচ্ছি।

মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এবারই প্রথম আফগানিস্তানের খনিজসম্পদের কথা উল্লেখ করল না। গত ১৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে এখাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ট্রলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, কিন্তু কোনোই লাভ হয়নি, কিংবা এখানে তাদের একটিও একক সফল প্রকল্প নেই।

‘স্পেশাল জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশন’-এর মতে ২০০৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র আফগান খনি শিল্প উন্নয়নে এবং খনির ব্যাপারে তদারকি করতে কাবুল সরকারকে সহায়তা করতে ৪৮৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এসব বিনিয়োগ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত খনি খাতে বড় ধরনের কোনো উৎপাদনশীলতা সৃষ্টি হয়নি। মহাপরির্দশক অনেক প্রতিবেদনেই দুর্বল ধারণায় প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা, আফগান সরকারের ধৈর্যহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন কৌশলের অভাবকে দায়ী করেছেন।

এসব প্রতিবেদন আমাদেরকে অতীত সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়। তবে নতুন বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসন এসব সম্পদ কেবল আফগানিস্তানের জাতিগঠন কাজে নয়, মূলত তার যুদ্ধের কাজে লাগাতে চায়।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সম্পদ আহরণ জাতি-গঠন প্রকল্প নয়। অবশ্য এটাও ঠিক প্রথমে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ না করে, দুর্নীতির থাবা নিয়ন্ত্রণ না করে, পাহাড়-পর্বত থেকে এসব সম্পদ পরিবহন করার পর্যাপ্ত রাস্তা তৈরি না করে বড় আকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া যায় না।

তবে অমিমাংসিত এসব ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প আসলেই উদ্বিগ্ন নন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার প্রধান উদ্বেগ হলো এই যে, এই খাতে মার্কিন সম্পৃক্ততার ফলে আফগানিস্তানের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারে, আমেরিকানদের জন্য চাকরির সৃষ্টি করতে পারে, বিরল খনিজসম্পদের বাজারে মূল্যবান নতুন কর্তৃত্ব এনে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে। বর্তমানে এই বাজারে একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে চীনের।

তবে আফগানিস্তানের অন্যান্য বড় সমস্যাগুলো থেকে গেলে যুক্তরাষ্ট্র তার এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। এমনকি আগামীকালও যদি তালেবান যুদ্ধ শেষ করে, তবুও আফগানিস্তানের পরিচালনা এবং অবকাঠমোগত সমস্যা রয়ে যাচ্ছে। ফলে আফগানিস্তানের খনিগুলো গভীর করে খোদাই করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা ভাবতে হবে।

আর আফগান সরকারও চাচ্ছে তাদের খনিজ সম্পদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন আকৃষ্ট হন। তারা আরো বেশি করে সামরিক সম্পৃক্ততায় তাকে প্রলুব্ধ করার উপায় হিসেবে এই সম্পদকে ব্যবহার করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তালেবানের যুদ্ধ শেষ করার আগে অবকাঠামো নির্মাণ এবং খনিজ সম্পদ আহরণ কোনোটাই হবে না।

লিথিয়ামের প্রধান মজুত আছে তিনটি অঞ্চলে। এগুলো হলো পূর্বে গজনি প্রদেশ, হেরাত এবং পশ্চিমে নিমরোজ প্রদেশ। হেরাত ও নিমরোজে প্রায়ই আফগান বাহিনী এবং তালেবানের মধ্যে যুদ্ধ হয়ে থাকে। আর গজনির যেখানে লিথিয়াম রয়েছে, সেখানে তালেবানের শক্তিশালী উপস্থিতি এখনো রয়ে গেছে।  আফগানিস্তানের আরেকটি খনিজসম্পদপূর্ণ প্রদেশ হলো হেলমন্দ। সেখানেও তালেবান ভালোভাবেই আছে।

যুদ্ধ অব্যাহতভাবে চলতে থাকায় আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ আফগানিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়াকে আকৃষ্ট করার বস্তু হিসেবেই রয়ে যাবে। কিন্তু এই সম্পদ উন্নয়নের কাজে লাগবে না। কারণ যুদ্ধ আর উন্নয়ন পাশাপাশি চলতে পারে না। আর যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের তহবিল সংস্থানের জন্য এই সম্পদ ব্যবহারের কেবল স্বপ্নই দেখতে পারে।

print
শেয়ার করুন