যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী লড়াই তালেবানদের দুর্বল করতে পারবে না

যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী লড়াই তালেবানদের দুর্বল করতে পারবে না

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন
ছবিঃ প্রতিকী

আফগানিস্তানে পপি চাষের বিরুদ্ধে মার্কিন তৎপরতা এটাই প্রথম নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর তাৎপর্য বদলে গেছে। কারণ তালেবানদের আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করার জন্য তাদের উপর প্রবল চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। পপি ক্ষেত ধ্বংসের মাধ্যমে তালেবানদের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস ধ্বংস করে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, যেটা তারা জনবল নিয়োগ, অস্ত্র কেনা এবং এমনকি তাদের পূর্ণ বা আংশিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে প্রশাসন পরিচালনার কাজে ব্যবহার করে।

তবে, আফগানিস্তানের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই কৌশল শুধু যে বিভ্রান্তিকর তাই নয়, বরং ২০০১ সালে তালেবানদের পতনের পর কেন এবং কিভাবে পপি চাষের মাত্রা বেড়ে গেছে, সে ব্যপারেও ধারণা পরিস্কার নয় মার্কিনীদের।

এটা ভুলে গেলে চলবে না, তালেবান আমলে ইউএনও’র সহায়তায় পপি চাষ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং ২০০১ সালে মার্কিন হামলার আগ পর্যন্ত পপি চাষ হ্রাস পেয়েছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। গত ১৬ বছর ধরে আফগানিস্তান মার্কিন সেনাবাহিনীর দখলে থাকার কারণে পপি চাষ আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। মার্কিনীরা উৎপাদন বন্ধের জন্য ৮.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করার পরও এটা বেড়েছে।

ফলে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে: শুধু কি তালেবানরাই পপি চাষে জড়িত? না কি এর কারণ যুদ্ধ, যেটা আফগান অর্থনীতিকে ধ্বংস করে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, ভাল ব্যবসা বলতে এখন শুধু পপিই টিকে আছে, যার মাধ্যমে চাষী তার ন্যায্য প্রাপ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে?

সম্প্রতি ইউএনও জানিয়েছে, পপি চাষ ও সন্ত্রাসবাদী অর্থনীতির আকার ৮৭ শতাংশ বেড়েছে। এর কারণ হলো আফগানিস্তানের দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামো, নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতি, কাজের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, এবং আরো অনেক সমস্যা।

সম্প্রতি ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, তালেবানরা যখন হেলমন্দ প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়, সেখানে পপি চাষের মাত্রা ছিল অনেক বেশি। তারা এটা তখনই বন্ধ করতে চায়নি কারণ বহু পরিবার এগুলোর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে এবং এগুলো বন্ধের মাধ্যমে তালেবানরা তাদের সমর্থন হারাতে চায়নি, যাতে করে পরে জনপ্রিয় এবং আদর্শিক স্থাপনাগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর নিয়ন্ত্রণ তারা হারিয়ে ফেলে।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে, পপি চাষে নিষেধাজ্ঞা পুণর্বহালের পরিবর্তে কিছু এলাকায় তারা পপি চাষের উপর কর আরোপ করেছে। যাতে সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থে তারা নিজেদের কাজ চালাতে পারে। এর আগে তালেবান নেতা মোল্লা ওমর ফতোয়া দিয়ে পপি চাষ নিষিদ্ধ করেছিলেন।

এটা তাই তথ্যগতভাবে ভুল। তাছাড়া এমন ধারণা করাও ঠিক নয় যে, তালেবানরা সরাসরি পপি চাষে জড়িত বা এটাই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। যদি তাই হবে, তাহলে যে প্রশ্নটি উঠবেই, সেটা হলো: যুক্তরাষ্ট্র কেন আফগানিস্তানে অবস্থানের ১৬ বছর পরে এসে পপি ক্ষেত ও কারখানাগুলোকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সেখানে বোমা ফেলছে? এই প্রশ্নের একমাত্র সম্ভাব্য উত্তর হলো আফগানিস্তানে নিজেদের দীর্ঘ সময় অবস্থান করাটাকে বৈধতা দিতে একটা নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে তারা; অথচ পশ্চিমা মিডিয়া যেমনটা দাবি করছে, মাদকবিরোধী যুদ্ধ আসলে তালেবানদের দুর্বল করা বা ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এমন কিছু পরিবর্তন আনবে না, যেটা মার্কিনীদের অনুকূলে যাবে।

এর প্রধান কারণ হলো, পপি চাষ তালেবানদের আয়ের উৎসও নয়, আবার এমনও নয় যে, শুধুমাত্র পপিপ্রধান এলাকাতেই তালেবানদের তৎপরতা রয়েছে। এর অর্থ হলো, আফগানিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি জায়গায় কমবেশি তালেবাদনের অবস্থান রয়েছে। কিন্তু এই এলাকাগুলোর সব জায়গাতেই পপি চাষ হয় না। উল্টো দিক থেকে বললে, আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এ রকম বহু জায়গাতেও পপি চাষের মাত্রা অনেক বেশি।

এ থেকেই বোঝা যায়, কেন গত নভেম্বরে তালেবানরা তাদের কাতারের রাজনৈতিক অফিস থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বার্তা পাঠিয়েছে যে, পপি চাষ কমিয়ে আনতে তারা সহযোগিতা করতে চায়। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, সরকার যদি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পপি চাষ কমিয়ে আনে, তাহলে তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পপি চাষ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে।

কিন্তু স্পষ্টতই সেটা ঘটেনি। যারা পপি ব্যবসায় জড়িত, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেনি আফগান সরকার, যারা এই এলাকায় মার্কিনীদের প্রধান মিত্রও বটে।

সেই বিবেচনায়, মার্কিনীদের বোমা বর্ষণের প্রচারণা তালেবানদের খুব সামান্যই দুর্বল করবে। উল্টো এতে তারা বরং আরো বেশি শক্তি সঞ্চয় করবে। কারণ অধিকাংশ মাদক কারখানায় গড়ে উঠেছে ঘনবসতিপূর্ণ জায়গাগুলোতে, যেগুলো স্থানীয়দের জীবিকার প্রধান উৎস। তাই, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে এগুলো ধ্বংস করলে, স্থানীয় জনগণ সরকার ও মার্কিনীদের বিরুদ্ধে যাবে এবং তালেবানদের জনসমর্থন আরো বাড়বে। অন্যভাবে বলতে গেলে, আফগানিস্তানকে পপিমুক্ত করা তো দূরে থাক, নতুন এই মার্কিন প্রচারণা হবে অনেকটা তাদেরই “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের” মুখে চপেটাঘাত করার মতো।

আফগানিস্তানে যে কোন মাদকবিরোধী যুদ্ধে সফল হতে গেলে, দেশের বড় ধরনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করতে হবে। আর এটা ততক্ষণ পর্যন্ত হচ্ছে না, যতক্ষণ সেখানে জঙ্গী তৎপরতা থাকবে। আর জঙ্গি তৎপরতাও আপাতত কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

আফগানিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল একটি উপায়েই সম্ভব- সেটা হলো আফগান-নেতৃত্বাধীন এবং আফগান-নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা। শুধুমাত্র মাদক-পরিচালিত, পপি-চাষভিত্তিক গ্রুপ হিসেবে তালেবানদের বিবেচনা করলে কোন লাভই হবে না। একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে হলে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। তাদের এটা বুঝতে হবে যে তালেবানরা একটা আবেগের প্রতিনিধিত্ব করছে, যেটার শক্ত ভিত্তি রয়েছে।শুধু বোমা মেরে ওই মাটি থেকে তাদেরকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

print
শেয়ার করুন