আরো ‘অনুগত’ পাকিস্তানকে চায় ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল

আরো ‘অনুগত’ পাকিস্তানকে চায় ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএস) দেশকে ক্রমবর্ধমান ‘বিপজ্জনক বিশ্বে’র কেন্দ্রে স্থাপন করেছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে এবং য্ক্তুরাষ্ট্রের নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলার জন্য অন্যান্য দেশকে বাধ্য করার মাধ্যমে হুমকির মাত্রা হ্রাস করার কথা ভাবছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ-ন্যাটো মিত্র’ পাকিস্তানকে স্বাভাবিকভাবেই এবং নির্মম বাস্তবতার আলোকে মার্কিন স্বার্থের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী দেশগুলোর মধ্যে ফেলা হয়েছে। আফগানিস্তানে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য যেসব দেশ কাজ করছে, সেই তালিকায় পাকিস্তানকে রাখা হয়নি। ফলে এনএসএস নথিতে থাকা বিষয়বস্তুর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পাকিস্তানকে ‘অস্থিতিশীল আচরণ না করার’ দিকে ফেরানো।

নথিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা পাকিস্তানকে সংশোধন করতে চাপ দিয়ে যাব। কারণ যে দেশ তার অংশীদারের সামরিক বাহিনী ও কর্মকর্তাদের টার্গেটকারী জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেয়, তাদের সাথে অংশীদারিত্ব টিকতে পারে না। পাকিস্তান যাতে তার পরমাণু সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করে সে ব্যাপারে দেশটিকে উৎসাহিত করে যাবে যুক্তরাষ্ট্র।’

ভাষা পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসপ্রতিরোধে পাকিস্তান কতটা কাজ করতে পারে, সেটার ভিত্তিতে।

পাকিস্তানকে ‘অনুগত’ হতে বাধ্য করার এই মার্কিন কৌশলে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে অবশ্যই তার মাটিতে সক্রিয় জঙ্গি ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এসব নতুন কৌশলের অনেক কিছুই প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন মার্কিন কর্মকর্তার বিবৃতির মাধ্যমে ইতোমধ্যেই জানা হয়ে গেছে। পাকিস্তানকে কোন দৃষ্টিতে দেখে যুক্তরাষ্ট্র, সে পাকিস্তানের কাছে কী চায় এবং কোন শর্তে পাকিস্তান ‘অ-ন্যাটো মিত্র’ মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে পারবে- এসব নিয়ে সব সংশয় সন্দেহ কেটে গেছে নতুন নীতিতে।

এই নথিতে আরেকটি ভয়াবহ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেনি যে পাকিস্তান সমাধানের অংশ।

এনএসএস নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে পাকিস্তানের ভেতর থেকে আসা জঙ্গি ও বহুজাতিক সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে রয়েছে।

কিন্তু তারপরও কেন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র? এর একমাত্র বোধগম্য কারণ হলো, পাকিস্তান এখনো আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য সরবরাহ পাঠানোর প্রধান রুট। এই রুট কখনো বন্ধ হয়ে গেলে আফগানিস্তানে যুদ্ধ আরো ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

পাকিস্তানের ‘অমার্জিত’ আচরণ পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারার কথা প্রকাশ করার একমাত্র কারণ হলো পাকিস্তানকে ‘অনুগত’ ও নিস্ক্রিয় হতে বাধ্য করা। এটা করতে পারলে পাকিস্তান যেমন সামরিক সাহায্য ও তহবিল পাবে, সেইসাথে আফগানিস্তানে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধ করতে সরবরাহ রুটটি উন্মুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো সমস্যা হবে না।

অর্থাৎ নথির ভাষ্যে পরিষ্কার, শিগগিরই আফগানিস্তান ত্যাগ করার কোনো ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। অন্যদিকে আফগানিস্তানের মতো দেশকে শক্তিশালী করাও তার অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। কারণ এসব দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা মার্কিন স্বার্থের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

এর আলোকে নথিতে ভবিষ্যতের যেকোনো সময় হুমকির মাত্রা বাড়লে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘দেশে এবং আমাদের মিত্রদের ওপর হুমকির অনুপাতের আলোকে এই অঞ্চলে আমেরিকার উপস্থিতি চাচ্ছি আমরা।’

অন্যদিকে পাকিস্তান তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার আত্মত্যাগ এবং তার নিজের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ অর্জিত সাফল্যের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

এই জবাবের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, আফগানিস্তানে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ অংশ নিতে পাকিস্তান এখন অনিচ্ছুক। পাকিস্তান এখন তার দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে, বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে আসা সরাসরি হুমকিগুলো দূর করার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।

এর ফলে যা ঘটতে পারে তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পাকিস্তানকে এখন আর রাশিয়া-চীন শিবিরের দিকে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

এর মাধ্যমে প্রকারন্তরে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের ভূমিকা খাটো করে আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধান মার্কিন মিত্র হিসেবে ভারতকে সামনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ওমাবা প্রশাসনের জাতীয় কৌশলে ভারতকে যে ভূমিকায় রাখা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলে দেশটির অবস্থান কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে এবং পাকিস্তানকে সেই অনুপাতে খাটো ও গুরুত্বহীন করা হয়েছে। এর ফলে খুবই সম্ভব যে, পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান হারে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন আফগান শান্তি-প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে।

এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি শিক্ষা রয়ে গেছে। সিরিয়া এবং সেইসাথে কুর্দিদের ব্যাপারে তুরস্কের স্বার্থের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র স্পর্শকাতরতার ফলে আঙ্কারা ও মস্কোর মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ঠিক একইভাবে পাকিস্তানের প্রতি দোষারোপ এবং ভারত-ফ্যাক্টরের কারণে চূড়ান্তভাবে যা হবে তা হলো ইসলামাবাদ ও মস্কোর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি।

বস্তুত ওই নথিতেও বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে চীন ও রাশিয়াকে ‘সংশোধনবাদী শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে মার্কিন আধিপত্য নস্যাতের চেষ্টাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাকিস্তানকে এই শ্রেণিতে না ফেলা হলেও এর ‘বেয়াদবি’ এবং আফগানিস্তানে দায়িত্বহীন আচরণের কারণে দেশটির পক্ষে মার্কিন স্বার্থ সম্প্রসারণ করা, সুরক্ষা করা এবং সহায়তা করা সম্ভব হবে না। বরং পাকিস্তানকে দেখা হচ্ছে এমন শক্তি হিসেবে যে গত ১৬ বছর ধরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র যে সাফল্য পেয়েছে তা নস্যাতের চেষ্টায় নিয়োজিত আফগান তালেবান গ্রুপকে অব্যাহতভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। এর ফলে পাকিস্তানকেও ‘সংশোধনবাদী শক্তি’ হিসেবে গণ্য করা যায় এবং তাকে রাশিয়া ও চীনের সহজাত মিত্রে পরিণত করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তানকে বৈরীভাবে তুলে ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রহণ করা অত্যন্ত অবাস্তব কৌশলের ফলে বর্তমানে তারা যে হুমকির মুখে পড়েছে, তার চেয়েও ভয়াবহ করুণ অবস্থায় পড়ার আশঙ্কায় পড়েছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধকে জটিল করবে অনেক গুণ।

print
শেয়ার করুন