মিয়ানমারের শান্তি-প্রক্রিয়ার প্রতি পশ্চিমাদের আগ্রহ বাড়ছে

মিয়ানমারের শান্তি-প্রক্রিয়ার প্রতি পশ্চিমাদের আগ্রহ বাড়ছে

ল্যারি জ্যাগান,
শেয়ার করুন

মিয়ানমারে চলতি মাসের শেষ দিকে ২১ শতকের পাঙলঙ নামে পরিচিত পরবর্তী শান্তি সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শান্তি-প্রক্রিয়ার অগ্রগতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য কচিন ও শান রাজ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ, সহিংসতা ও উত্তেজনার অজুহাতে শান্তি সম্মেলন পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। সরকার অবশ্য ফেডারেল রাষ্ট্র সৃষ্টিতে জাতিগত গ্রুপগুলোকে রাজি করিয়ে চলতি বছরের মধ্যেই সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য তার পরিকল্পনা অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়।

এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শান্তি-প্রক্রিয়ায় প্রতি তার আগ্রহের কথা পুনঃব্যক্ত করেছে, যদিও গত ছয় মাস ধরে সহিংসতাপ্রবণ রাখাইন রাজ্যের সমস্যাবলীই তাদের উদ্বেগের বেশির ভাগ জায়গা দখল করে আছে। তবে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহায়তা পেতে বেপরোয়া চেষ্টা চালাতে থাকার প্রেক্ষাপটে এশীয় ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো একে তাদের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

বর্তমানে চীন রয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে, তার সুবিধাও অনেক। আর এটিই পরোক্ষ অনেক প্রতিযোগী তথা আসিয়ান, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রকে হতাশ করছে। এসব দেশের অনেকেই বেইজিংয়ের শক্তিশালী কূটনৈতিক সুবিধা নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে, তারা চীনা প্রাধান্যের পাল্টা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। এসব দেশের সবাই বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় শান্তি, সমন্বয় সাধন ও উন্নয়নে সহযোগিতা করতে চায়। তবে সবাই তা করতে চায় নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। ফলে মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চলমান রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দীর্ঘ দিন দেশটির আইকনিক নেত্রী ও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারী অং সান সু চির সমর্থক ছিল। দেশটির সর্বময় ক্ষমতাশালী সামরিক বাহিনীর প্রতি তাদের নজর বলতে গেলে ছিলই না। দেশটিতে এখন আর একক সরকার নেই, বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। কিন্তু তবুও দেশগুলো মিয়ানমারের শক্তির মধ্যস্ততাকারী হিসেবে রয়ে গেছে। এসব দেশ গত দু’বছর ধরে রাখাইন রাজ্যের সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, জাতিগত নির্মূলের জন্য সামরিক বাহিনীকে অভিযুক্ত করেছে, মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার জন্য আবারো সুনির্দিষ্ট কিছু অংশের ওপর অবরোধ আরোপ করছে।

এসব দেশ কয়েক দশকের সামরিক শাসনকালে অধিকার, আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য জাতিগত গ্রুপগুলোর সংগ্রামের প্রতি প্রবল সমর্থন জানিয়েছে, ২০১১ সালের শেষ দিকে ছায়া সরকারের সূচিত শান্তি পরিকল্পনার প্রতি ব্যাপকভাবে সমর্থন দিয়েছে। এর ফলেই ২০১৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি (এনসিএ) হয়েছে। এতে জাতিসংঘ, চীন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ভারত, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। ফেডারেল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার, সামরিক বাহিনী ও জাতিগত গ্রুপগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনার পূর্ব শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয় এনসিএকে।

অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এবং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ২০১৬ সালের এপ্রিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট থিন সিনের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পর শান্তি প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছ। কিন্তু ১৯৪৭ সালে অং সান এবং কয়েজন জাতিগত নেতার সাথে ঐতিহাসিক বৈঠকের এর নামকরণ করে পাঙলঙ। সু চির আমলে ইউনিয়ন পিস কনফারেন্সের দুটি সভা ইতোমধ্যেই হয়েছে। একটি হয়েছে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে, আরেকটি ২০১৭ সালের মে মাসে।

পাশ্চাত্য শান্তি-প্রক্রিয়ার প্রবল সমর্থক। তারা পর্দার আড়াল থেকে বিপুল আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘সঙ্ঘাত’ বিশেষজ্ঞরা থিন সিন সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে, জাতিগত গ্রুপগুলোর সাথে মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান সরকারের আমলেও এই সমর্থন অব্যাহত রয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে তাদের কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তা করে যাচ্ছে। তাদের এই সমর্থন অব্যাহত রাখার একটি কারণ হলো বিদ্রোহী কয়েকটি গ্রুপ খ্রিস্টান। বিশেষ করে চিন, কচিন ও কারেন বিদ্রোহী আর্মি অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন চার্চ থেকে দশকের পর দশক ধরে সহায়তা পেয়ে আসছে।

মিয়ানমারের শান্তি-প্রক্রিয়ার প্রতি ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর সমর্থন প্রদানের আরেকটি কারণ হলো দেশটির বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ব্যবসায়িক সুযোগ। দেশটি যদি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাজারক্ষেত্রে পরিণত হয়, তবেই তারা এই সুবিধাটি কাজে লাগাতে পারবে। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি যদি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়, তবে বিনিয়োগের জন্য দেশটি খুবই আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হবে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, থিন সিনের প্রাথমিক শান্তি উদ্যোগের প্রতি রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন বেশ কাজে লেগেছিল, বিনিময়ে ২০১৩ সালে টেলিনর টেলিকম লাইসেন্স পেয়ে যায়।

মিয়ানমারের অর্থনীতি ও শান্তি-প্রক্রিয়া উভয়টিতেই জাপান একটি বড় শক্তি। জেনারেল নে উইনসহ মিয়ানমারের উপর্যুপরি সরকারগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে টোকিও। ১৯৪০-এর দশকে মিয়ানমারের স্বাধীনতা নেতা জেনারেল অং সান এবং ৩০ কমরেড, যুদ্ধকালীন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জাপান সমর্থন দিয়ে গেছে।

জাপানি ব্যবসায়ীরা ১৯৮০-এর দশকে উন্নয়নশীল মিয়ানমারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিল। এর জের ধরে মিয়ানমারের ব্যবসায়ী ও সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়েছিল। ওই সময় থাইল্যান্ডে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল জাপান। ১৯৮৮ সালে গণতন্ত্র আন্দোলনের ফলে মিয়ানমার সরকার অচল হয়ে পড়লে থাই প্রধানমন্ত্রী চাতিচাই চুনহাভেনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করে জাপান। এই থাই প্রধানমন্ত্রী নিজেও মিয়ানমারকে যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে বাজারক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। তিনি সরকার এবং জাতিগত বিদ্রোহীদের কম্বোডিয়ায় শান্তি আলোচনায় রাজি করান। তবে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।

এরপর থিন সিন শান্তি উদ্যোগ শুরু করার পর সাহায্য ও বিনিয়োগের আশায় টোকিও সফর করেছিলেন। ২০১২ সালের এপ্রিলের ওই সফরে জাপানি সরকার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থিন সিনকে শান্তির ব্যাপারে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিল। তারা তাকে বুঝিয়েছিল, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ হবে নিরাপদ। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান ইয়োহেই সাসাকাওয়াকে মিয়ানমারের জাতীয় সমন্বয় প্রক্রিয়ায় বিশেষ দূত নিযুক্ত করে। তার মিশন ছিল  মিয়ানমার সরকার, সামরিক বাহিনী ও জাতিগত বিদ্রোহী এবং সেইসাথে বিদেশী গ্রুপগুলোর মধ্যে মধ্যস্ততা করা।

এরপর থেকে জাপানি দূত নিয়মিত মিয়ানমার সফর করেন, শান্তিপ্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে বৈঠক করেন। তিনি বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন থাই-মিয়ানমার সীমান্তের জাতিগত গ্রুপগুলোর সাথে। জাতিগত সীমান্ত এলাকায় তার ফাউন্ডেশন ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ মানবিক সহায়তামূলক বিভিন্ন প্রকল্পে প্রদান করে। বিশেষ করে কারেন ও শান রাজ্যে সহায়তা ছিল বেশি। এনসিএতে সই করায় তিনি কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে স্কুল, স্বাস্থ্য ক্লিনিক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন বেশি। তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, শান্তি-প্রক্রিয়ায় যোগ দিলে বেশ লাভ আছে।

শান্তি দূত ছাড়াও জাপান সরকারও ২০১২ সাল থেকে মিয়ানমারকে সহায়তা দিয়ে আসছে। এটি মিয়ানমারে জাপানি ব্যবসায়ী স্বার্থ জোরদার করে। জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে মিয়ানমারের শান্তি ও উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এগুলো মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক হলেও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের সাথে প্রতিযোগিতা করারও হাতিয়ার।

থাইল্যান্ডও শান্তি-প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে জড়িত। অবশ্য এর বেশির ভাগই পর্দার অন্তরালে। সীমান্ত যত নিরাপদ হবে, মিয়ানমারের সাথে থাইল্যান্ডের বাণিজ্যও তত ভালো হবে। উভয় দেশই সীমান্তে শান্তি চায়। এ কারণে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা প্রদানের নীতি থেকেও সরে এসেছে থাইল্যান্ড।

মিয়ানমারের শান্তি-প্রক্রিয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ অনেক কম সক্রিয়। তারা নিজেদের নিরাপত্তা ইস্যুতেই বেশি চিন্তিত। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাদের উদ্বেগ অনেক বেশি। এ দেশ দুটি আগ্রহীহীন, বিষয়টি এমন নয়। তবে তারা জাপান বা পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মতো ততটা সম্পৃক্ত নয়। দিল্লির মূল উদ্বেগ তাদের উত্তরপূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা এবং সীমান্তে জঙ্গি হানা।

সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, মিয়ানমারের শান্তি প্রক্রিয়ায় চীন এখনো সবচেয়ে প্রভাবশালী পক্ষ। তারা মিয়ানমার সরকারের বর্তমান শান্তি প্রয়াসকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে। বেইজিংয়েরও নিজস্ব এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত রয়েছে। তার নাম সান গোয়াজিয়াঙ। তিনি নিয়মিতভাবে মিয়ানমার সফর করে শান্তি-প্রক্রিয়ায় জড়িত সবার সাথে কথা বলেন। গত ডিসেম্বরে শান্তি-প্রক্রিয়ার জন্য চীন ৫৩ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তার কথা ঘোষণা করে। চলতি বছরই এক মিলিয়ন ডলার ছাড় করা হবে। তবে আর্থিক অবস্থার চেয়ে তাদের সমর্থন অনেক বেশি নর্দার্ন অ্যালায়েন্স নামে পরিচিত চীন সীমান্তের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সাথে মধ্যস্ততার কাজে।

চলতি মাসের শেষ দিকে তৃতীয় দফার পাঙলঙ শুরু হতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পাশ্চাত্যের দেশগুলো মিয়ানমারের ভঙ্গুর শান্তি-প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ ও প্রতিশ্রুতি দুটিই বাড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাই এতে প্রাধান্য বিস্তার করলেও আসল কথা হলো মিয়ানমারে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা।

print
শেয়ার করুন