ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা: মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর্যালোচনা

ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা: মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর্যালোচনা

শেয়ার করুন
সন্ত্রাসী হামলার পর জ্বলছে মুম্বাইয়ের তাজমহল হোটেল

বর্তমান সময়ে আমরা মিডিয়ায় একটি কাহিনী থেকে আরেকটিতে ছুটি, সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে অবগত থাকার চেষ্টা করি। গতকাল প্যারিসে, আজ লন্ডনে, আগামী কাল কোথায়? কে জানে? ধর্মীয় চরমপন্থীরা যখন আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বোকা বানিয়ে হামলা চালায়, তখন তা হয় বেশ মর্মান্তিক ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে এসব ঘটনার অনেকগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষবাবে আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আয়োজনে করা হয়ে থাকে। এসব ঘটনা কেবল মানুষের দুর্ভোগই বাড়ায় না, সেইসাথে তা নাগরিক সমাজ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথেও প্রতারণা। তারা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থার হাতেই প্রতারিত হচ্ছে, ভীতির শিকর হচ্ছে, শাস্তি পাচ্ছে, এমনকি তাদের ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে চলা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যা হচ্ছে, তা আসলে এ ধরনেরই জালিয়াতি।

কিন্তু যেসব সংস্থার হামলা তদন্ত ও প্রতিরোধের দায়িত্বে ছিল, তারাই যদি হামলায় অংশ নিয়ে থাকে, তবে নাগরিক সমাজ কিভাবে নিজেদের রক্ষা করবে? তারা কি প্রমাণ সংগ্রহ করে আসলেই কারা হামলা চালিয়েছিল, তা নির্ধারণে এগিয়ে আসবে? বছরের পরিক্রমায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকেরা বিভিন্ন ধরনের গ্রুপ গঠন করে তথ্য বিনিময়ের জন্য নাগরিক তদন্তের ধারা সৃষ্টি করছে।

এ ধরনের এক তদন্তকারী হলেন ইলিয়াস ডেভিনসসন। তার ‘হাইজাকিং আমেরিকারস মাইন্ড অন ৯/১১’ কিংবা আরো সাম্প্রতিক লেখা ‘সাইকোলজিচে ক্রিয়েজসফুহহাঙ আন্ড জেগেসলচটলিচে লেগনাঙ’-এর সাথে অনেক পাঠক পরিচিত। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলা নিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ করেছেন। ‘দি বিট্রেয়াল অব ইন্ডিয়া: রিভিজিটিং দি ২৬/১১ ইভিডেন্স’ নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে নয়া দিল্লি থেকে।

ওই হামলা নিয়ে ভারত সরকার যে ভাষ্য দিয়েছে, তা পাঠ করার পর আর উইকিপিডিয়া না পড়লেও চলে। সরকারি গোয়েন্দাদের ভাষ্যের বাইরে তো তারা যায় না। তাতে বলা হয়েছে: ওই হামলাটি হয়েছিলো ২০০৮ সালের নভেম্বরে। পাকিস্তানভিত্তিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার ১০ সদস্য ১২টি সমন্বিত হামলা চালিয়েছিল। মুম্বাইয়ে তাদের ওই হামলার স্থায়িত্ব হয়েছিল চার দিন। এতে ১৬৪ জন নিহত ও অন্তত ৩০৮ জন আহত হয়েছিল।

এই ভাষ্য অবশ্যই ত্রুটিপূর্ণ। ঘটনাটিকে ভারতের ৯/১১-এর মতো ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করার জন্যই এ ধরনের ভাষ্য প্রদান করা হয়েছিল। আমরা জানি, ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ। যখন এ ধরনের কাজ পাকিস্তান সমর্থন করে বলে অভিযোগ করা হয়, তখন আমাদের বুঝতে হবে এ ধরনের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার দেড় শ’ কোটি মানুষের ওপর কত বড় বিপদ ঝুলছে।

এ ধরনের ভাষ্যের ভিত্তি যে কত সহজ, সেটাও আমরা বুঝতে পারব যদি মুম্বাই পুলিশের তহবিল ও সরঞ্জামে মচ্ছব (৭৩৫-৭৩৬) শুরু হয়ে যায় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে যুদ্ধের জন্য সমরিক ব্যয় ২১ শতাংশ বাড়তে থাকে।

উইকিপিডিয়ার অনুচ্ছেদে সোজাসাপ্টা কাহিনী বলছে। তবে সোজাসাপ্টা কথায় অনেক কিছুই কাটছাঁট করা হয়। পাকিস্তান ও লস্কর-ই-তৈয়বা উভয়েই হামলার দায়িত্ব অস্বীকার করেছে। ডেভিডসসন জানিয়েছেন, তাদের অস্বীকার করার পেছনে যুক্তি রয়েছে।

বইয়ের শেষভাগে ডেভিডসসন সত্যিকারের হামলা এবং হামলা সম্পর্কে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান নিয়ে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে আমাদের উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, খুবই সম্ভব যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভবত ইসরাইলের প্রধান প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক কুশীলবেরা ২৬/১১ হামলার পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিচালনা ও সম্পাদনের কাজটি করেছে।

তবে তদন্তকাজে প্রতারণা সম্পর্কে আরো জোরালো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেছেন। তিনি তার বইতে দেখিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার, পার্লামেন্ট, আমলাতন্ত্র, সশস্ত্র বাহিনী, মুম্বাই পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ ও মিডিয়া পরিকল্পিতভাবে ২৬/১১ সম্পর্কিত সত্য চাপা দিয়েছে এবং এখনো তা করে যাচ্ছে। ওই ভয়াবহ ঘটনা সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ উপস্থাপন করতে উল্লেখিত পক্ষগুলোর কোনো ইচ্ছাই দেখা যায়নি।

এ বিষয়টিই নাগরিক সমাজের তদন্তকারীদের জন্য খুবই কার্যকর। প্রমাণ গোপন করার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার কারণ রয়েছে দুটি। প্রথমত অপরাধ ধামাচাপা দেওয়াটাও অপরাধ। যেসব কুশীলবের কথা বলা হয়েছে, তারা অপরাধটির সাথে জড়িত না থাকলে অন্তত তদন্ত চালানোর চেষ্টা করত। কিন্তু তারা তা করেইনি।

এখন তদন্ত নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। প্রমাণ ধামাচাপা দেওয়ার কয়েকটি প্রমাণের কথা উল্লেখ করা যাক

১.  অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণ

পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আগেই যখন কর্মকর্তারা অপরাধী ব্যক্তি বা গ্রুপ সম্পর্কে দাবি করেন, তখনই বোঝা যায়, ভুয়া একটি ধারণা দেওয়ার প্রয়াস চলছে এবং জনগণের মধ্যে তা গেঁথে দিতে সঙ্ঘবদ্ধ প্রয়াস চলবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লি হার্ভে অসওয়াল্ডকেই নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেলের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে হত্যার জন্য একমাত্র দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেন। অথচ তখন তেমন কোনো তদন্তই হয়নি, তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণও উপস্থিত করা হয়নি। একই ঘটনা দেখা যায় ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাতেও। ওসামা বিন লাদেন ও তার গ্রুপকেও প্রমাণ ছাড়াই নাইন ইলেভেনের জন্য দায়ী করা হয়।

মুম্বাই ঘটনায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের দিকে আঙুল তাক করেছিলেন।

একইভাবে হামলার পর হেনরি কিসিঞ্জারও পাকিস্তানকে সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টা করেন। মুম্বাইয়ের প্রধান হামলাটি হয় তাজ হোটেলে। হামলার তিন দিন আগে ওই হোটেলেই ছিলেন কিসিঞ্জার। তিনি আমেরিকান রাজনীতি নিয়ে গোল্ডম্যান স্যাচস ও ভারতীয় টাটা গ্রুপের কর্মকর্তাদের সাথে সেখানে কথাবার্তা বলেন। ভারতীয় এলিটদের সাথে (টাটা পরিবার ভারতের সবচেয়ে ধনী এবং টাটা গ্রুপ হলো তাজের মালিক) কিসিঞ্জারের খোশগল্প প্রশ্নের জন্ম দেয়। অধিকন্তু পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে তার বক্তব্য প্রদানেও সন্দেহ জাগে।

২.  সরকারি তদন্তকারীদের প্রমাণ নষ্ট করা

পরিকল্পিতভাবে প্রমাণ নষ্ট করার প্রমাণ রয়েছে। ডেভিডসসন দেখিয়েছেন, কর্মকর্তারা কত তাড়াহুড়া করেছেন।

  • পুলিশ, বিচারক- কেউই একমাত্র বেঁচে যাওয়া সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করেননি।
  • প্রধান সাক্ষীদের স্বাক্ষী দিতে ডাকা হয়নি। যারা সন্ত্রাসীকাজ চালাতে দেখেছে, তাদের সাথে কথা বলেছে কিংবা একই কক্ষে ঘুমিয়েছে, তাদের সবাইকে আদালত অগ্রাহ্য করেছে।
  • পরস্পরবিরোধী ও কাকতালীয় ঘটনাগুলো আলাদা করা হয়নি। পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় মৃত ঘোষিত একজন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন। আবার দ্বিতীয় এক লোক দুই জায়গায় মারা গিয়েছিলেন। আবার এক লোক তো মারা গেলেন তিন জায়গা। কেন এমন হলো, তা কেউ খতিয়ে দেখেনি।
  • প্রত্যক্ষদর্শীরা সন্ত্রাসীদের পোশাক ও গায়ের রঙ সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন।
  • এক সাক্ষী তো বলেই ফেলেছেন, তিনি সন্ত্রাসী ও ‘বন্ধুদের’ মধ্যে পার্থক্য করতে পারেননি।
  • কতজন সন্ত্রাসী এতে অংশ নিয়েছিল, তা নিয়ে একেকবার একেক রকম তথ্য দেওয়া হয়।
  • ঘটনাস্থলের দৃশ্যপট পরিবর্তন করা হয়। পরীক্ষা করার আগেই লাশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
  • সন্ত্রাসীরা একে-৪৭এস ব্যবহার করেছিল বলে বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু কামা হাসপাতাল একটি একে-৪৭ বুলেট উপস্থাপন করতে পারেনি।
  • ক্যাফে লিওপোল্ড, তাজমহল প্যালেস হোটেল, ওবেরিও ট্রাইডেন্ট হোটেল বা নরিম্যান হাউসের শত শত সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু তাদের একজনও আট অভিযুক্তের কাউকে হত্যা করতে দেখেননি।
  • নরিম্যান হাউস নামের ইহুদি কেন্দ্রে নিহতদের লাশের ময়না তদন্ত করতে অস্বীকার করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এখানে নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই ইসরাইলি নাগরিক। বলা হচ্ছে, ইহুদি ধর্মে ময়না তদন্তের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা থাকায় তা করা হয়নি।

৩.  জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে হামলা সম্পর্কে মৌলিক তথ্য জনসাধারণকে জানানো হয়নি।

* বেঁচে যাওয়া সন্ত্রাসীর প্রকাশ্যে বিচার হয়নি।

* তার গোপন বিচারের ভাষ্য প্রকাশ করা হয়নি।

* আসামির পক্ষে কাজ করতে আগ্রহী এক আইনজীবীকে আদালত খারিজ করে দেয়, অপরজন গুপ্তহত্যার শিকার হন।

* জনসাধারণকে বলা হয়, হামলা সম্পর্কে বিপুল সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। কিন্তু শুনানির দিন সিসিটিভি ফুটেজের বেশির ভাগই অকেজো বলে বলা হয়।

* আট সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অভিযানে নামা ৪৭৫ থেকে ৮০০ কমান্ডোর একজনকেও আদালতে সাক্ষী দিতে তলব করা হয়নি।

* সন্দেহভাজনের ‘স্বীকারোক্তি’ প্রকাশ করা হয়নি। তা গোপনই রাখা হয়েছে।

ডেভিডসসন দেখিয়েছেন, ওই হামলার ফলে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য আর্থিক বরাদ্দ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ভারত সন্ত্রাসী হামলার হুমকিতে- এমন আশঙ্কা সৃষ্টি করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। হামলার ব্যাপারে এফবিআই বেশ আগ্রহ দেখায়। এই সংস্থাকে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ইসরাইল লাভবান হয় ব্যাপকভাবে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন ভারত।

তাহলে ডেভিডসনের বই থেকে আমরা কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি? ৯০০ পৃষ্ঠার বইটিতে ধৈর্যশীল পাঠক কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য সহজেই ধরতে পারবে। যাদের পুরোটা ধৈর্য ধরে পাঠ করার অভ্যাস নেই, তাদের জন্য সংক্ষিপ্তসারের ব্যবস্থা করা রয়েছে।

এসব কারণে বইটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

 

লেখক ড. গ্রায়েম ম্যাককুইন কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের সাবেক পরিচালক। তিনি টরোন্টো হেয়ারিংস অন ৯/১১-এর একজন সংগঠক, কনসেনসাস ৯/১১ প্যানেলের একজন সদস্য।

print