শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব যেভাবে সঙ্কটে ফেলল প্রেসিডেন্টকে

শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব যেভাবে সঙ্কটে ফেলল প্রেসিডেন্টকে

কলম্বো প্রতিনিধি,
শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিঙ্গের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের সময় যে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা প্রধানমন্ত্রীর মাথা উপহার চেয়েছিলেন নাটকটির তিন দিন পর সেই তিনিই এখন ভিন্ন সুরে কথা বলছেন।

সিরিসেনা তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এখন আর তার শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসার দল শ্রীলংকা পদুজনা পেরামুনার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন না। বরং গত তিন বছর ধরে গিরগিটির মতো প্রয়োজনীয় ভোল পাল্টানোর রেশ ধরে এখন ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত টিকে থাকার পরিকল্পনা করছেন।

অনাস্থা প্রস্তাবের একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত বিক্রমাসিঙ্গের বিরোধিতা করে গেছেন সিরিসেনা। সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসার জয়েন্ট অপজিশনের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের মোকাবিলা যখন করছিলেন বিক্রমাসিঙ্গে, তখন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তার কাছ থেকে সরিয়ে নিচ্ছিলেন সিরিসেনা।

সিরিসেনা ২৯ মার্চ নজিরবিহীন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রধানমন্ত্রীর আওতা থেকে সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করেন। তার এ পদক্ষেপে পরোক্ষভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তার অনাস্থাই প্রকাশ পায়।

কিন্তু এখন তিনি মনে করছেন, বিক্রমাসিঙ্গের মাধ্যমেই তিনি টিকে থাকতে পারবেন।

শুক্রবার সম্পাদকদের সাথে ব্রেকফাস্ট অনুষ্ঠানে সিরিসেনা ঘোষণা করেন, শ্রীলংকাকে এগিয়ে নিতে পারে কেবল জোট সরকারই। কারণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো দলেরই নেই।

ডেইলি এফটিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই সভায় সিরিসেনা বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এ সরকারকে দুর্বল করা নয়, বরং শক্তিশালী করা। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোর ব্যাপারে আমি পুরোপুরি সচেতন রয়েছি। যেসব এমপি এ ব্যাপারে সমর্থন দেবে, আমি তাদেরকে সরকারে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাব।

জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তাদের দুই দলের সদস্যদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন নিয়ে ইতোমধ্যেই আলোচনা হয়েছে। তারা জাতীয় ঐক্য সরকার বজায় রাখার জন্য কৌশল নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা করেছেন।

কয়েক দিনের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় রদবদল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিরিসেনার মধ্য বাম এসএলএফপি ও বিক্রমাসিঙ্গের উদার ডানপন্থী ইউএনপির মধ্যে কিভাবে সহাবস্থান সম্ভব তা নিয়ে ২০১৫ সালের নির্বাচনের পর থেকেই আলোচনা চলছে। ক্ষমতাসীন এই দুই দলের মধ্যে আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণ করা অনেক সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট বাতিল করে দিয়েছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে হাম্বানতোতা বন্দর চীনের কাছে লিজ দেওয়া (প্রথম চুক্তিটির ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট আপত্তি জানানোর পর সরকার তা সংশোধন করতে বাধ্য হয়) এবং কলম্বো বন্দরের পূর্ব টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি ভারতের দুটি কোম্পানিকে দেওয়া।

এদিকে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে যেসব এসএলএফপি সদস্য ভোট দিয়েছে, তাদেরকে যদি সরিয়ে দেওয়ার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তারা জয়েন্ট অপজিশনের সদস্য হয়ে যাবে। এ হুঁশিয়ারির পর প্রধানমন্ত্রী তার ইউএনপি গ্রুপকে বলেছেন, ওই ধরনের কোনো পদক্ষেপ যাতে গ্রহণ করা না হয়। তবে প্রেসিডেন্টের দলের যেসব সদস্য প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট দিয়েছেন তাদের অনেকেই এখন মন্ত্রিত্ব থেকে সরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা সিরিসেনাকে জানিয়ে দিয়েছেন। তারা একটি চিঠির মাধ্যমেই সিরিসেনার কাছে এ আবেদন করেছেন। উল্লেখ্য, সিরিসেনা ওই দলের সভাপতিও।

সিরিসেনা জানিয়েছেন, এসএলএফপির সদস্যরা যদি রাজাপাকসার শিবিরে যোগ দেয়, তবে তিনি সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৩ জন এমপি পেয়ে যাবেন।

তবে তা হোক বা না হোক, অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হওয়ার ফলে রাজাপাকসার জয়েন্ট অপজিশনের তেমন কিছু হয়নি, ক্ষতি হয়েছে সিরিসেনার দলের সদস্যদের। সিরিসেনার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তার দলের সদস্যদের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। তারা এখন মুখ রক্ষার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাপাকসার শিবিরে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।

অনাস্থা প্রস্তাবটিকে জয়যুক্ত করতে না পারলেও রাজাপাকসার শিবির মনে করছে, এর মাধ্যমে তিনি সিরিসেনার এসএলএফপিকে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত বিভক্ত রাখতে পারবেন।

print
শেয়ার করুন