স্বীকৃতির অপেক্ষায় পাকিস্তানের ইংরেজি সাহিত্য

স্বীকৃতির অপেক্ষায় পাকিস্তানের ইংরেজি সাহিত্য

মানিজা নাকভি,
শেয়ার করুন
লাহোর সাহিত্য উৎসব ২০১৩ তে স্টল ঘুরে দেখছেন পাঠক

পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত যারা ইংরেজিতে লিখছেন, দেশের বাইরে তারা রীতিমতো আলো ছড়াচ্ছেন। আর দেশে পাঠকদের মধ্যে উত্তেজনার একটা মশাল যেনো আস্তে আস্তে জ্বলে উঠছে। উদযাপনের সময় এখন। এই লেখকের যদি অ্যাওয়ার্ড দেয়ার ক্ষমতা থাকতো, তাহলে এ বছর অসাধারণ ‘স্নাফিং আউট দ্য মুন’ বইটার জন্য সেটা পেতেন ওসামা সিদ্দীক। আর ‘বয় অব ফায়ার অ্যান্ড আর্থের’ জন্য পুরস্কার পেতেন সামি শাহ। ব্যতিক্রমী এই দুটো উপন্যাসের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী ইংরেজি সাহিত্যের স্বাদ আর গন্ধই বদলে গেছে।

জ্বিনে ধরা বা জ্বিন নামানোর ব্যাপার-স্যাপারগুলো পাকিস্তানের সাহিত্য রয়েছে। এ ধরণের অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ নিয়ে এসেছে মাহভেশ মুরাদ আর জেয়ার্ড শুরিনের ছোটগল্পের সংকলন দ্য জিন ফলস ইন লাভ। হতবাক করে দেয়ার মতো গল্প রয়েছে সংকলনটিতে। সামি শাহ এবং উসমান টি মালিকসহ পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত লেখকরা লিখেছেন গল্পগুলো।

যাদের পরিচয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তৃতীয় বা চতুর্থ বই প্রকাশ করছেন যারা, তাদের দিকেই মনোযোগটা বেশি। ২০১৭ সালের ম্যান বুকার প্রাইজের লংলিস্টে মোহসিন হামিদ (এক্সিট ওয়েস্ট) আর কামিলা শামসির (হোম ফায়ার) নাম ছিল। ২০০৭ সালেও ওই তালিকায় ছিলেন হামিদ। তার দ্য রিলাকট্যান্ট ফানডামেন্টালিস্ট বইয়ের জন্য।

উর্দু কবিতার পাশে স্থান পেয়েছে শিশুদের ওয়ার্কবুক

পাকিস্তানী ঔপন্যাসিকরা দেশে, দেশের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। শুরুর দিকে নারীরাই ছিলেন বেশি। এখন সংখ্যাটা বেড়ে পুরুষ নারী প্রায় সমান হয়ে গেছে। প্রায় ৭০ বছর ধরে লিখছেন এরা। এম্পায়ারের ভাষায় তাদের এ সব লেখা নজরে পড়েছে কখনো, কখনো নজর এড়িয়ে গেছে। তাদের লেখায় ‘আমাদের’ আর ‘তাদের’ কথা রয়েছে, রয়েছে ঔপনিবেশিত আর ঔপনিবেশিকদের কথা, রয়েছে সাম্রাজ্য পরবর্তী সময় বা নতুন সাম্রাজ্যের আখ্যান।

সংখ্যাটা ভালোই বাড়ছে। শুধু এই খবরটাই আনন্দের কারণ হতে পারে। শতাধিক লেখক দেড় শতাধিক উপন্যাস লিখেছেন। রয়েছে বহু সংকলনও। কিন্তু দেড়শ’র বেশি আলাদা স্বাদের ভাল গল্পের হয়তো জন্ম হয়নি যেগুলো সীমিত অভিযান শ্রেণীর বাইরে অন্যদের মাঝে পৌঁছেছে। এর কারণ হয়তো আমরা ঔপনিবেশিক অতীতের থাবা থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারিনি।

সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর পাকিস্তানের মানুষ যেটুকু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছে, সেটি হয়তো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যে কারণে পাকিস্তানীদের ইংরেজি ভাষায় লেখার সংখ্যা বাড়ছে। পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লেখার সুযোগ পেয়ে লেখকরা তাদের লেখার দক্ষতা বাড়াতে পারছেন। এরপর সামাজিক গণমাধ্যম বিপ্লব তো রয়েছেই। লেখকদের সেখানে আর ঠেকায় কে। কয়েক ডজন টেলিভিশন চ্যানেল এবং প্রতিশ্রুতিশীল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কারণে স্ক্রিপ্ট লেখক ও কপিরাইটারদের চাহিদাও বাড়ছে।

কামিলা শামসি

লেখকদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। আশা করা হয় যে তারা বুদ্ধিমান হবেন, অন্যায়, যুদ্ধ ও সামরিক দখলদারদের হিসেব নিকেশ কিংবা সত্যের বিকৃতি করার বিষয়গুলো ঠিকঠাক বুঝতে পারবেন তারা। বিশ্ব ব্যাবস্থা সম্পর্কে তাদের ভালো জানাশোনা থাকবে বলেও আশা করা হয়। এ সব না থাকলে তারা পাল্প ফিকশান লিখবেন।

অনুবাদের কাজও চলছে। আলী মাদিহ হাশমি সম্প্রতি আলী আকবর নাতিকের ছোটগল্পগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। বইয়ের নাম দিয়েছেন হোয়াট উইল ইউ গিভ ফর দিস বিউটি। উর্দু থেকে ইংরেজি অনুবাদের কাজ আরও অনেকেই করছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন জাহরা সাবরি, ফ্রান্সিস ডাব্লিউ প্রিচেট, মুশাররফ আলি ফারুকি, বিলাম তানবীর এবং আমের হুসেন।

পাকিস্তানের প্রথম ইংরেজি উপন্যাস হলো মুমতাজ শাহনাওয়াজের লেখা দ্য হার্ট ডিভাইডেড। বই প্রকাশের আগে লেখিকা ১৯৪৮ সালে মারা যান। একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা থেকে দেশভাগের যাতনা তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসটিতে। ১৯৪০ সালে আহমেদ আলী লিখেন টোয়াইলাইট ইন দিল্লী। তখনও দিল্লীতেই বাস করতেন তিনি। অনিচ্ছায় পাকিস্তানে আসতে হয় তাকে। করাচিতে চলে আসার পরও দিল্লীর ঘর-বাড়ির টান ছাড়তে পারেননি তিনি। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় জুলফিকার গোসের দ্য মার্ডার অব আজিজ খান। আশির দশকে বাপসি সিধওয়া নিজের লেখা উপন্যাস দ্য ক্রো ইটার্স নিজেই প্রকাশ করেন। এরর আইস ক্যান্ডি ম্যান নামে তার আরেকটি বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। ভারতে এই বইয়ের উপরে ভিত্তি করে ‘আর্থ’ নামে একটি সিনেমাও তৈরি হয়, যেটা পুরস্কার পেয়েছিল। আরও অনেক উপন্যাস লিখেছেন তিনি পরে।

করাচি লিটারেচার ফেস্টিভাল ২০১৩

লেখক ও মানবাধিকার কর্মী তারিক আলী সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান।  ১৯৭১ সালের গৃহযুদ্ধের পর তিনি লেখেন ক্যান পাকিস্তান সারভাইভ। সে সময় পাকিস্তানে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু উপন্যাস ছিল না এটা। তার উপন্যাসগুলো আসে পরে। পাঁচটি বইয়ের সিরিজ লিখেছেন তিনি যার প্রথমটি হলো শ্যাডোজ অব দ্য পোমগ্রানেট ট্রি।

১৯৮৯ সালে মিটলেস ডেইজ উপন্যাস দিয়ে সাহিত্যের দৃশ্যপটে আসেন সারা সুলেরি। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় রুখসানা আহমেদের উপন্যাস দ্য হোপ চেস্ট। এই লেখকের প্রথম উপন্যাস ম্যাস ট্রানজিট ১৯৯৮ সালে প্রকাশ করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। পরে আরও চারটি উপন্যাস লিখেছি আমি।

পাকিস্তানের ইংরেজি সাহিত্যিকদের তালিকায় প্রতিদিনই নতুন লেখকের আবীর্ভাব হচ্ছে। যত লেখক আসবে, গল্পগুলো তত শক্তিশালী হবে। আগের লেখকরা যেটা করেছেন, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে আরও বিভিন্ন অবস্থান থেকে প্রশ্ন করা যাবে। যে পৃথিবীতে নতুন একটা ঔপনিবেশকতার জন্ম হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলবেন। আর এভাবেই একটা অর্থপূর্ণ উপায়ে গঠণমূলক পন্থায় বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবেন তারা।

এই নতুন লেখকদের সংবাদপত্রের কলামে দেখা যাচ্ছে। ম্যাগাজিনের ফিচার পাতাতেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে। তারা বিচ্ছিন্নভাবে বাস করছেন না। এটা আর দশজনের সাথেই পাবলিক বাসে যাতায়াত করছেন। তিনবার বাস বদল করে কর্মস্থল থেকে বাড়িতে পৌঁছতে হচ্ছে তাদের। তারা বিচ্ছিন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোন ঘরে বসে নেই।

পুরনো ধারণা মানার জন্য প্রস্তুত নন এরা। তারা ছুটছেন, নোট করছেন, সংবাদ কক্ষে বসে এডিট করছেন। সবাই এরা প্রাণবন্তু লেখক। তারা পরিবর্তনে প্রভাব ফেলবেন। আমার সেটাই আশা। এই লেখকরা প্রথামত প্রজ্ঞার ধারণা ছিঁড়ে ফেলবে, কুসংস্কার উড়িয়ে দেবে এবং সামর্থের অনেক উর্ধ্বে উঠে অন্য এক বাস্তবতা আমাদের জন্য তৈরি করবে এরা।

 

 

print
SOURCE হেরাল্ড
শেয়ার করুন