প্রশান্ত সরোবর

প্রশান্ত সরোবর

প্রণয় শর্মা,
শেয়ার করুন

ভারতের দীর্ঘতম সময়ের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্করের প্রস্থানের সাথে চীন-ভারত দৃশ্যমান সম্পর্কোন্নয়নের কোন যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেই বিতর্ক উঠতেই পারে, যদিও ভারতের কূটনীতিকরা সেটা নাকচ করে আসছেন।

হাঁ, ভারতের পররাষ্ট্র দফতের ভেতরের ও বাইরের অনেকেই এই ডটগুলো মেলানোর চেষ্টা করছেন বিশেষ করে সাউথ ব্লকে সম্প্রতি যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। এর ভিত্তিতে এপ্রিলের শেষ দিকে উহানে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে, সেটার গুরুত্ব বুঝতে চাচ্ছেন তারা।

দুই নেতার মধ্যে অনন্য এই সংলাপ আশা নিয়ে এসেছে যেটা দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের জায়গাগুলোকে সহজ করতে এবং দুই দেশকে সহযোগিতা এবং বাস্তবধর্মী অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে সাহায্য করবে। দোকলাম পরবর্তী পরিস্থিতিতে দুই দেশই কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় কিছু আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ যেগুলো দুই দেশের জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ – সেগুলো সম্ভবত দ্রুততার সাথে একত্রে বসার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে, সাউথ ব্লকে কিছু পরিবর্তন এসেছে। চীনে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত বিজয় গোখলে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নিয়েছেন। আরও দুজন চীন বিশেষজ্ঞ গৌতম বাম্বাওয়ালে বেইজিংয়ের ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এবং প্রণয় ভার্মা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া বিষয়ক যুগ্ম সচিবের দায়িত্ব নেয়ায় চীনের প্রতি পরিবর্তিত নীতিটা অনেক দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

সম্পর্ক ভালো হোক বা কুয়াশাচ্ছন্ন হোক, ভারত আশা করে, চীন তাদের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোর ব্যাপারে সম্মান দেখাবে। কিন্তু নয়াদিল্লী একটা মৌলিক সিদ্ধান্তে এসেছে, সেটা হলো চীনের সাথে অপ্রয়োজনীয় সঙ্ঘাত এড়িয়ে চলা, বিশেষ করে সে সব জায়গায়, যেখানে আয়ের চেয়ে ব্যায় বেড়ে যায়। তিব্বত কার্ড একটা বড় উদাহরণ। এই ধারণা নিয়ে এমনিতে যত কথাই বলা হোক, এই অস্ত্র দিয়ে কতটুকু চাপ দেয়া সম্ভব সেটা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এই কারণেই গোখলে দালাই লামার নির্বাসনের ৬০ বছর পুর্তির অনুষ্ঠানমালা সঙ্কুচিত করে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ চীন সবসময় এটাকে দেখেছে চীনে অস্থিতিশীলতা উসকে দেয়ার একটা উপায় হিসেবে।

সিনো-ভারত সম্পর্ক বিষয়ের প্রথিতযশা ভাষ্যকার জন গার্ভার বলেছেন, আমার ধারণা মোদির হিসাব-নিকাশের মধ্যে ট্রাম্প ফ্যাক্টরটাও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে কাজ করেছে।

জর্জিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর এমেরিটাস গার্ভার বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তাদি মেনে নেয়, সেজন্য তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য চীনের উপর নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই ভারত ও চীনের সম্পর্কের উন্নয়ের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের উপর কতটা নির্ভর করা যায়, সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

ভারত খামাখা চীনের সাথে শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করতে চায় না। জয়শঙ্কর চলে যাওয়ার পর এই নীতিটি এগিয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্প এবং তার নিষেধাজ্ঞার হুমকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে চীনের। যেটা বাণিজ্য যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই চীনের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারত। কারণ দুই দেশই বড় বাজার এবং দরকারী জিনিসের সরবরাহও করে থাকে তারা। সে কারণেই চীনের বিরুদ্ধে আগের তিক্ত কথাবার্তা থেকে সরে এসে দেরিতে হলেও ট্রাম্প বলছেন যে শি জিনপিংয়ের ব্যাপারে তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। অন্যদিকে নিজেদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছে চীন। উত্তর কোরিয়া প্রশ্নে চুক্তির জন্য ট্রাম্পের এই যে চেষ্টা, সেটা বিবেচনায় নিয়ে যে প্রশ্নটি আসে, সেটা হলো কোন লড়াইয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্র কি ভারতের পাশে দাঁড়াবে? এমন প্রশ্ন তুলেছেন গার্ভার। তার বক্তব্য হলো, ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে সখ্যতা, সেটা দুর্বল। বারাক ওবামা, জর্জ ডাব্লিউ বুশ বা বিল ক্লিনটনের সময় সেটা বরং শক্তিশালী ছিল।

উহান সম্মেলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলে আফগানিস্তানে যৌথ প্রকল্পের পরিকল্পনা, যেটার ব্যাপারে ভারতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। যদিও এ ধরণের প্রস্তাব আগেও আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ভারতের সাথে যখন সম্পর্কের টানাপড়েন যাচ্ছিল, বেইজিং তখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্ঘাত-কবলিত আফগানিস্তানে কোন প্রকল্প থেকে ভারতকে দূরে রাখতে চেয়েছিল।

এক হিসাবে এই যৌথ প্রকল্পে ভারতের সম্মতির অর্থ হলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতের এক ধরণের সম্মতি দেয়া, যেটা নিয়ে ভারত আগে বিরোধীতা করেছিলো কারণ, এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেছে। চীনের দিক থেকে, তারা আশা করে সিপিইসির ব্যাপারে ভারতের আপত্তি থাকলেও প্রকল্পের অন্যান্য অংশের ব্যাপারে ভারত বাধা দেবে না। এতে করে প্রকল্পের গতি কমে যাবে এবং খরচ বেড়ে যাবে। আফগানিস্তানে যৌথ প্রকল্প সফল হলে দক্ষিণ এশিয়ায় সেটা ভারত-চীন সহযোগিতার একটা মডেল হতে পারে।

যদি সেটা ঘটে, তাহলে সেটা এ অঞ্চলে অনেক অর্থপূর্ণ প্রাচুর্য নিয়ে আসবে। সে ক্ষেত্রে ছোট দেশগুলোকে দুই বড় শক্তিধর দেশের মধ্যে একটিকে বাছাই করতে হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এতে করে ভারত ও চীন উভয়েই উভয়ের ব্যাপারে আরও স্বাচ্ছন্দ্য হয়ে উঠবে এবং সেটা কারোরও অগ্রগতিতে বাধা হবে না। কারণ সূর্যস্নানের জন্য তাপের অভাব হয় না কারও।

print
শেয়ার করুন