কানাডায় মুসলিম উদ্বাস্তুদের পুনঃবসতি স্থাপন করার সুপারিশ

কানাডায় মুসলিম উদ্বাস্তুদের পুনঃবসতি স্থাপন করার সুপারিশ

সেহের আসাফ,
শেয়ার করুন

গত বছর প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা পায়ে হেঁটে কিংবা নৌকায় করে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তাদের মধ্যে আনোয়ার আরকানির তিন বোনও ছিলেন।

আরকানি কানাডায় গিয়েছিলেন ১৯৯৮ সালে। তিনি এর আগে প্রায় এক দশক ছিলেন বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের উদ্বাস্তু শিবিরে। ফলে জানেন, উদ্বাস্তু শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের অবস্থা কত ভয়াবহ। গত শরতে খাদ্য বিতরণ করতে ওইসব ক্যাম্পে যাওয়ার সময় তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

তার বোন ও তাদের সন্তানদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া আরো কঠিন ব্যাপার।

আরকানি বলেন, আমার বোনের মেয়ে বলেছে, সে ফিরে গেলে তাকে কারাগারে নেওয়া হবে। তারা ফিরলে যে নিরাপদে থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা বরং এখানে মরতেও প্রস্তুত।

আরকানি বর্তমানে রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন অব কানাডার সভাপতি। বর্তমানে কানাডায় প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা মুসলিম বাস করে। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই সম্প্রদায়টি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে তাদের স্বজনদের জন্য খুবই উদ্বিগ্ন।

প্রধানত মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ১৯৮২ সাল থেকে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব প্রদান করা হচ্ছে না। তারা শত শত বছর ধরে দেশটিতে থাকার পরও তাদেরকে রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের বর্তমান সঙ্কটকে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসাইনি ‘পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত জাতিগত হত্যাযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মিয়ানমার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রাখাইন রাজ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিক সহিংসতা ঘটে ২০১৭ সালের আগস্টে। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা কয়েকটি পুলিশ ক্যাম্প ও সেনাঘাঁটিতে হামলা চালালে নিরাপত্তা বাহিনী নির্মম দমন অভিযান শুরু করে। এতে করে রোহিঙ্গরা দলে দলে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে থাকে।

গত মাসে মিয়ানমারে নিযুক্ত কানাডার বিশেষ দূত বব রাই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কানাডা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করার ব্যাপারে কানাডার সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত প্রদান করা। তিনি আগামী চার বছরের জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলারের কানাডার তহবিল প্রদানেরও আহ্বান জানান।

গত সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড বাংলাদেশের কুতুপালং-বালুখালি শিবির পরিদর্শন করেন। তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নৃশংসতার তীব্র সমালোচনা করে কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে ‘দৃঢ় প্রতিশ্রুতির’ ঘোষণা দেন। তবে তিনি রাইয়ের সুপারিশ মতো নতুন কোনো অর্থ প্রদানের কথা জানাননি।

গত শরতে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা পাঁচ লাখ উদ্বাস্তুকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি চুক্তি করেছিল। এতে দুই বছরের মধ্যে সব উদ্বাস্তুকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

জানুয়ারিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এই আশঙ্কায় যে উদ্বাস্তুদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে। প্রত্যাবাসনের নতুন তারিখ কবে নির্ধারিত হবে তা জানা যায়নি।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কানাডার উদ্বাস্তু অধিকারবিষয়ক কর্মী গ্লোরিয়া নাফজিনগার বলেন, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বাস্তুদের ফেরানোর উপযোগী নয়। তিনি নাগরিক অধিকার প্রদান না করা, স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও শিক্ষার সুযোগ না থাকার কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা এখনো ওই অঞ্চল থেকে লোকজনকে পালিয়ে আসতে দেখছি।

তিনি বলেন, তাদেরকে এখনো নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না, তারা সেখানে জীবন-জীবিকার অধিকার নিয়ে মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারবে তার নিশ্চয়তা নেই।

তিনি বলেন, তিনি বলেন, কানাডা সরকারের উচিত বাংলাদেশ, মিয়ানমার বা অন্যান্য দেশে বসবাসরত যেসব উদ্বাস্তেুর পরিবার কানাডায় থাকে, তাদের পুনঃমিলনের ব্যবস্থা করা।

তিনি বলেন, কানাডায় অবস্থানরত রোহিঙ্গারা স্পন্সর করলে তারা তাদের পরিবার সদস্যদের কানাডায় যাতে নিয়ে আসতে পারে সে সুযোগ দেওয়া উচিত।

রাইয়ের প্রতিবেদনে ১৭টি সুপারিশ ছিল। এর মধ্যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের অন্যান্য দেশে স্বাগত জানানোর কথাও রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সহিংসতার কারণ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশে মানবিক ও উন্নয়নে ৫০ লাখ ডলারের তহবিল গঠনের আহ্বান জানান।

কানাডার জাতিসংঘ উদ্বাস্তুবিষয়ক প্রতিনিধি জ্যাঁ নিকোলাস বেউজ বলেন, রোহিঙ্গাদের অন্যত্র পুনর্বাসন না করিয়ে তাদের বরং মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিরই অগ্রাধিকার প্রদান করা উচিত।

কানাডার অবশ্য এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।

অভিবাসনমন্ত্রী আহমদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কোনো এক্সিট ভিসা না থাকায় তার দেশ বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সরিয়ে নিতে পারছে না।

আরকানি বলেন, এক্সিট ভিসা ছাড়াই রোহিঙ্গারা যাতে কানাডায় যেতে পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

print