খুলনা সিটি নির্বাচন: আ’লীগ জিতেছে, বিএনপি হেরেছে, জিততে পারেনি ইসি

খুলনা সিটি নির্বাচন: আ’লীগ জিতেছে, বিএনপি হেরেছে, জিততে পারেনি ইসি

আফসান চৌধুরী,
শেয়ার করুন

খুলনা সিটি কর্পোরেশন যে কোন জাতীয় নির্বাচনের মতোই আগ্রহ ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এটা ছিল তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতার নির্বাচন। বিএনপি নেতা খালেদা জিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় এই নির্বাচন হলো। জামিনের জন্য লড়ছেন তিনি, যেটা যথেষ্ট কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

বিএনপি দাবি করেছিল জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে তারা যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং নির্বাচনে জেতার আশা করেছিল তারা। বর্তমান মেয়র বিএনপির। ২০১৩ সালে জিতেছিলেন তিনি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দাবি করেছিল, বিএনপি আদৌ কোন শক্তিই নয়। যে কোন নির্বাচন সহজেই জিতবে আওয়ামী লীগ। দুই দলের কাছে এখানে রাজনৈতিক মর্যাদাটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সাথে নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও ছিল যারা সম্প্রতি তাদের যাত্রা শুরু করেছে।

নদীর স্রোতে রাজনৈতিক কাদাও ভাসে

ক্ষমতাসীন দলের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং অবাধ মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার পরীক্ষাও ছিল এই নির্বাচন। ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপারে ধারণা ছিল তারা বিরোধী দলের জীবন যতটা পারা যায় বিষিয়ে তুলবে আর সেটা তারা আনন্দের সাথেই করেছে। বিএনপি তর্জন গর্জন করলেও খুব বেশি কিছু করতে পারেনি।

ইসির শক্তিমত্তারও পরীক্ষা হয়েছে এখানে এবং এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে তাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। সবগুলো সূচক দেখলে বোঝা যায়, নির্বাচন হয়েছে, ‘খুব খারাপ না’ এবং ‘ভাল না’– এই দুইয়ের মাঝামাঝি পর্যায়ের। কারচুপি এবং নির্বাচন সংক্রান্ত সহিংসতার অভিযোগ সত্বেও এতে জনপ্রিয়তার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের যে ঐতিহ্যগত দুর্বলতা, সেটা ঠিকমতোই বিদ্যমান রয়েছে।

এই আসনে নির্বাচিত ছিলেন বিএনপি প্রার্থী যাকে অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে। এবং তিনি জনপ্রিয়। তার বিরোধী আওয়ামী লীগ প্রার্থীও জনপ্রিয়। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হবে বলেই আশা করা হয়েছিল, যদিও দুই দলই ভূমিধস বিজয়ের আশা করেছিল। ফলাফল দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ভালোভাবেই জিতে গেছে।

যে সব বিশ্লেষকরা নির্বাচন পর্যালোচনা করছেন, এদের অধিকাংশই বলছেন বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলই মূলত তাদের পরাজয়ের জন্য দায়ি। গত নির্বাচনে যখন বিএনপি জিতেছিল, তখনও আওয়ামী লীগের ভেতরে অন্তর্কোন্দল ছিল। মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিএনপি প্রার্থীকে যেহেতু দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে, তাই বাস্তবে কতটা কার্যকর মেয়র হতে পারবেন তিনি, সেটা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাজ করেছে। তাই, নির্বাচনী আবহাওয়া সূচকের বিচারে ভোট দেয়াটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল না। সবচেয়ে বড় ছিল নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা।

নির্বাচন স্থানীয়, নির্বাচন কমিশন জাতীয়

সব পক্ষই স্বীকার করবে এখানে সমস্যা ছিল। তবে, অধিকাংশই বলেছেন, যতটা ধারণা করা হয়েছিল, সমস্যা হয়েছে তার চেয়ে কম। এতে বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্র অনেকটাই ফুটে উঠেছে। এটা ধরেই নেয়া হয়েছিল যে, সমস্যা আর সন্ত্রাস হবে যেহেতু রাজনীতির গভীরে এই সমস্যাটা রয়ে গেছে। তিনটি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয় আর প্রায় ৩০০ পোলিং সেন্টারের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক গ্রুপগুলো সাধারণভাবে বলেছে, নির্বাচন আরও ভাল হতে পারতো কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে এটাকে ‘গ্রহণযোগ্য’ বলা যায়। তবে তারা এটাও বলেছেন যে আগের দুটে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন এর চেয়ে বেশ ভালভাবেই হয়েছিল। তারা এটাও বলেছেন যে, অনিয়ম হয়েছে কিন্তু সেটা চুড়ান্ত ফলাফলে তেমন প্রভাব ফেলেনি। তাই নির্বাচনী ফলাফলের ব্যাপারে সম্মতি থাকলেও নির্বাচনের ব্যাপারে নেই। এদিকে, বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রভাবশালী মার্কিন দূত নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বিএনপির দিক থেকে প্রতিক্রিয়াটাও প্রত্যাশিতই ছিল। তারা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে, বিএনপিও হয়তো একটা অবাস্তব ফলাফল – বিজয়ের আশায় ছিল। দলের বর্তমান অবস্থা, কাঠামো এবং দক্ষতার বিবেচনায় সেটা প্রায় অবাস্তবই বটে। বিএনপি প্রচন্ড চাপের মধ্যে ছিল এবং শুধু নির্বাচনের সময়েই তাদের শতাধিক কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। বিএনপি হয়রানির অভিযোগ তুলেছে এবং এটা আসলেই হয়রানি ছিল কিন্তু গ্রেফতারগুলো অবৈধ ছিল না। এই লোকগুলোর বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা ছিল। তাই আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির জীবন দুর্বিসহ করতে পেরেছে, যেটা হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।

কিন্তু বিএনপি নিজেও জয়ের জন্য প্রস্তুত নয় কারণ দলটি এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। দলের নেতারাও আসলে নিশ্চিত নয় কে দলের কমান্ডার যেহেতু দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক জিয়া লন্ডনে বাস করছেন এবং তাই বাংলাদেশে দলের দায়িত্বে আসলে কেউ নেই। তাই বিএনপি শিবিরে এক ধরণের বিভ্রান্তি এবং সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে বলে মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ অসাধারণ পর্যায়ে রয়েছে এবং ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ অর্থ যা-ই হোক না কেন, সেটা হতে দেয়ার কোন আগ্রহ তাদের নেই।

এর অর্থ হলো মানসম্পন্ন নির্বাচনের জন্য অধিকাংশ প্রত্যাশা হলো নির্বাচন কমিশনের উপর। কিন্তু সে ধরণের দৃষ্টান্ত স্থাপনে তারা ব্যার্থ হয়েছে। কমিশন আরও বেশি কিছু করতে পারেনি কারণ আওয়ামী লীগ চায়নি আর বেশি কিছু তারা করুক। নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে চমৎকার নির্বাচন হয়েছে যদিও ভোটের মাঠ থেকে কারচুপির খবর এসেছে, তা সে যে মাত্রাতেই হোক। আর নির্বাচন কমিশনের এই প্রত্যাখ্যানের মানসিকতাটাই সবচেয়ে উদ্বেগের। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডও ততটা উদ্বেগের নয়।

নির্বাচন কমিশনের সেই পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে কি না বা তাদের সে ইচ্ছা আছে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। বিশ্বে যত ক্ষমতা রয়েছে, সব কিছু হাতে থাকার পরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই জিততে পারেনি কমিশন, জনগণ তাদের কাছে যেটা প্রত্যাশা করেছিল।

print
শেয়ার করুন