সু কি’র উপর চাপের বোঝা বাড়ছে

সু কি’র উপর চাপের বোঝা বাড়ছে

ল্যারি জ্যাগান,
শেয়ার করুন

মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার সব দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছে। অন্তত সেটাই মনে হচ্ছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সবার দিক থেকেই চাপ রয়েছে। ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে সু কি’র জীবন, তা সে যে দিক থেকেই হোক।

পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া প্রায় এক মিলিয়ন মুসলিম শরণার্থীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সরকারকে, সেটার সাথে আরও সমস্যা যুক্ত হয়েছে। কাচিন প্রদেশে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক। সেই সাথে শান ও কারেন রাজ্যেও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছে। সব মিলিয়ে সরকারের দুর্দশা বেড়েই চলেছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে সরকারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। দেশের ‘দ্বৈত নেতা’ স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু কি’র সাথে সেনা কমান্ডার-ইন-চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং লিয়াংয়ের সম্পর্ক এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। পরিস্থিতি আরও খারাপ করার জন্য এর সাথে যোগ দিয়েছে জ্যোতিষিরা। তারা ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতার পালাবাদল ঘটতে পারে।

এই জ্যোতিষিরা বলছেন, দেশের উপর ত্রিশ বছরের অভিশাপ আবার পড়তে যাচ্ছে। এর আগের দুটো বিপর্যয়কর সময়ের দিকে ইঙ্গিত করছেন তারা। একটা হলো ১৯৫৮। সে বছর পার্লামেন্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উ নূকে বাধ্য করা হয়েছিলো সেনাপ্রধান জেনারেল নে উইনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। সেটা চলেছে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৮ সালে ব্যাপক গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভের কারণে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। এখন ২০১৮ সালে বড় ধরনের ঘটনা সরকার উৎখাতের দিকে নিয়ে যাবে।

জ্যোতিষিদের ভবিষ্যৎবাণীর সাথে মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা হয়তো মিলবে না, কিন্তু এর পরও দেশ আসলেও কঠিন সময় পার করছে। দেশ একটা বিপজ্জনক ও ভয়াবহ সময়ে প্রবেশ করেছে। বিভাজন, হতাশা, নিরাশা বাড়ছে, যেটা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভালো নয়। আর এই পরিস্থিতি যে বদলাতে পারে, সে রকম লক্ষণ খুব সামান্যই দেখা যাচ্ছে।

সরকারের বহুল প্রচারিত শান্তি প্রক্রিয়া দ্রুত ভেঙ্গে পড়ছে। কারণ, সরকারের দূরদর্শিতার ঘাটতি রয়েছে এখানে আর জাতিগত গ্রুপগুলোর মধ্যে বিতৃষ্ণা বাড়ছে। অধিকাংশ জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন – যারা জাতীয় অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে সই করেছে এবং যারা করেনি – সবাই এরা আগামী পাংলং পিস কনফারেন্সে যোগ না দেয়ার কথা সক্রিয়ভাবে ভাবছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সম্মেলন হওয়ার কথা। এ বছর অবশ্য একবার সম্মেলন স্থগিত করতে হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক জাতিগত কাচিন নেতা জানান, “কিভাবে আমরা শান্তি সম্মেলনে যোগ দেবো, সেনাবাহিনী যেখানে আমাদের উপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে মানুষজন পালিয়ে যাচ্ছে”।

এই সুস্পষ্ট ভণ্ডামির কারণে বহু জাতিগত নেতাই সতর্ক হয়ে গেছেন। এমনকি যারা সামরিক প্রচারণার আওতায় পড়েননি, তারাও। তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এপ্রিলের শুরু থেকে কাচিন রাজ্য থেকে প্রায় ৭৪০০ মানুষ ঘরবাড়িছাড়া হয়েছে। আগে থেকেই সেখানে এক লাখ মানুষ ঘরবাড়িছাড়া রয়েছে, যারা জাতিসংঘ থেকে কোন মানবিক সহায়তা পায় না, কারণ সামরিক বাহিনী তাদেরকে ওই এলাকায় ঢুকতে দেয় না।

সঙ্ঘাত কবলিত অং লাট এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় দুই হাজার মানুষ জঙ্গলের মধ্যে প্রায় চার সপ্তাহ ধরে আটকা ছিল। পরে অবশ্য কাচিন রাজ্যের অন্যান্য শহরে তারা আশ্রয় নিয়েছে। যে সব জায়গায় এখনও সঙ্ঘাত চলছে, সেখানে আরও বহু মানুষ আটকা পড়েছে। ওই সব জায়গা থেকে পালানো খুবই কঠিন। পর্বত ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ওই সব এলাকা থেকে বের হতে হয়। কিন্তু মানবিক সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে ওই সব এলাকার মানুষের জন্য।

এ সপ্তাহে শান রাজ্যে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হামলায় অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরও প্রায় ২০ জন। জবাবে সেখানে হামলার তীব্রতা বাড়াচ্ছে সামরিক বাহিনী। ক্রসফায়ারে তিনজন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছে। জবাবে বেইজিং এই সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছে। ওই এলাকায় সেনাবাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র এবং বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করেছে বলে কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে। কাচিনের লোকজন প্রায়ই তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ করে থাকে। শানের উত্তরাঞ্চলের নামতু টাউনশিপ থেকে ছয় শতাধিক মানুষ ঘরবাড়িছাড়া হয়েছে।

যুদ্ধ এবং বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর বেপরোয়া আচরণে নাগরিক সমাজ এবং কমিউনিটি গ্রুপগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। কাচিন রাজধানী মাইটকিনা এবং ইয়াঙ্গুনে এটা নিয়ে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইয়াঙ্গুনে সেনাবাহিনীর নির্দয় জবাবের কারণে বিক্ষোভ শুধু বেড়েই চলেছে। যেহেতু বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ এখনও মানবেতর পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে আছে, তাই এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এখনই থামার সম্ভাবনা কম। কাচিনের মানবাধিকার কর্মী যারা এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা মনে করছেন তাদের এই বিক্ষোভ বাড়তেই থাকবে এবং এক পর্যায়ে জাতীয় শান্তি আন্দোলনে রূপ নেবে।

সরকার এ পর্যন্ত এই বিক্ষোভের ব্যাপারে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো উত্তরাঞ্চলের এই সব পরিস্থিতির ব্যাপারে খুব সামান্যই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। জাতিগত গোষ্ঠিগুলো বিশেষ করে কাচিনদের মধ্যে যে জনরোষ দেখা দিয়েছে, এটা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে যতক্ষণ না সরকার সেখানকার মানবিক সঙ্কটের মোকাবেলা করে – সামরিক অভিযানের কারণে যেটা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকে সেখানে নিরস্ত করে। এই জাতিগত এলাকাগুলোতে অং সান সু কি’র যশ খ্যাতি খুবই নড়বড়ে অবস্থার মধ্যে রয়েছে। একজন শীর্ষ কাচিন মানবাধিকার কর্মী সাউথ এশিয়ান মনিটরকে জানান, “তিনি আমাদের কাছে মৃত, পুরোপুরি মৃত”। আর এটা ২০২০ সালের নির্বাচনের জন্য কোন ভাল সংবাদ নিয়ে আসবে না, যে নির্বাচনে জাতিগত ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) এই সব ভোটারদের সমর্থন পাবে না। এরা ভোট দেবে জাতিগত রাজনৈতিক দলগুলোকে।

অং সান সু কি যেন স্থবির হয়ে পড়েছেন। সব দিক থেকেই আটকা পড়েছেন তিনি এবং পরিবর্তনের জন্য কোন ভিশন দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। যেটা তার ২০১৫ সালের রাজনৈতিক শ্লোগানে ছিল। সে সময় তার এই শ্লোগান পুরো দেশের মানুষের হৃদয়, মন জয় করেছিলো। সরকারের অবস্থা কল্পকথার স্প্যানিশ অভিজাত ডন কুইটোটের মতো, যিনি উইন্ডমিলের সাথে লড়াই করেছিলেন, চতুর্দিকে খুব সামান্যই প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন তিনি। দেশকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে বাঁচানো, রয়েছে ব্যাপক জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগ যেগুলোকে একাধিক জাতিসংঘ প্রতিবেদনে গণহত্যার সাথে তুলনা করা হয়েছে, মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন এবং পুণরায় বসতির ব্যবস্থা করা এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা – সব চ্যালেঞ্জই রয়েছে সরকারের সামনে।

এই সব কিছু কার্যত নিজেদেরকেই করতে হচ্ছে কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদেরই এককালের গণতান্ত্রিক নায়িকার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যদিও মিয়ানমার একেবারে বন্ধুশূণ্য নয়: এই অঞ্চল, আসিয়ান, চীন, ভারত ও রাশিয়া তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছে, যেটা তাদের জন্য বিষাক্তও হয়ে উঠতে পারে। এখন যেটা দরকার, সেটা হলো একটা সমন্বিত কৌশল ও পরিকল্পনা যাতে সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা যায়। অন্তত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন সেই রাখাইন সমস্যার সমাধান করতে হবে। এবং একই সাথে সারা দেশের জন্য শান্তি পরিকল্পনা নিতে হবে, যেটাতে সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন হবে।

সরকারের নিশ্চিতভাবেই রাখাইনের ব্যাপারে একটি মৌলিক পরিকল্পনা রয়েছে। রাখাইন নিয়ে আনান কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এটা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং রাখাইনের উন্নয়নের বিষয়গুলো রয়েছে। কিন্তু এতে দূরদর্শিতা ও সারবস্তুর অভাব রয়েছে। অং সান সু কি বুঝতে পেরেছেন যে রাখাইন সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারকে সফল হতে হলে সেখানে জাতিসংঘের সমর্থন ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দুটো প্রধান সংস্থা – ইউনাইটেড নেশান্স ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং ইউনাইটেড নেশান্স হাই কমিশনার ফর রিফিউজিস – যারা এখানে কাজ করবে, এই সংস্থা দুটোর সাথে সরকারের বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারক কিছু দিনের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হবে বলে সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মিয়ানমারের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে অভিজ্ঞ সুইস কূটনীতিক ক্রিস্টিন শ্রানার বার্জেনারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মিয়ানমান এই মুহূর্তে যে সব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সহযোগিতার ক্ষেত্রে তার এই নিয়োগ হয়তো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক সমালোচনা বন্ধের ব্যাপারেও হয়তো সহায়তা করতে পারবেন তিনি। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন তিনি এবং নিয়োগের শর্ত ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সাথে দীর্ঘ পথচলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন তিনি।

ইয়াঙ্গুনের কূটনীতিকরা বলছেন, তার সামনে এখন লম্বা তালিকা রয়েছে। কারণ তার মিশনের মধ্যে রয়েছে রাখাইন সমস্যা, শান্তি প্রক্রিয়া, ২০২০ নির্বাচনের আগে সরকারকে সমর্থন দেয়া, এবং দারিদ্র ও অসমতা দূর করা। জুনের শুরুতে তিনি মিয়ানমারে প্রথমবারের মতো সফর করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যমান নানা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকে ইতিবাচক অবস্থানে নিয়ে আসার বিরাট দায়িত্ব এখন বর্তেছে তার উপর।

অনেক দায়িত্ব তার উপর, আশাও অনেক। জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিল তার নিয়োগকে সমর্থন দিয়ে বলেছে, তাদের আশা “এই নিয়োগ সঙ্কট নিরসন করে শরণার্থীদের তাদের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করবে”। অবশ্যই এখানে অনেক কিছু করতে হবে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি যদি করা যায় তাহলে সেটা মিয়ানমার এবং এর অবরুদ্ধপ্রায় নেতা অং সান সু কির জন্য কিছুটা নিঃশ্বাস নেয়ার পরিবেশ হয়তো তৈরি করবে।

print
শেয়ার করুন