শান্তির রোডম্যাপ খুঁজে পেয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান

শান্তির রোডম্যাপ খুঁজে পেয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান

সালমান রাফি,
শেয়ার করুন

বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও আফগান-পাক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটা রোড ম্যাপ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়েছে তাদের। প্রক্রিয়ার শুরু হয়েছে প্রস্তাব দিয়ে। এরপর সেটা বাস্তবায়নের জন্য পর্দার আড়ালে দর কষাকষি হয়েছে। দেখা গেছে দুই পক্ষের মধ্যে খারাপ ও সঙ্ঘাতপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিষয়টি অসম্ভব কিছু নয়। একই সাথে ২০০১ সাল থেকে যে সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সেটা সমাধানের জন্য কাবুল ও ইসলামাবাদের আন্তরিকতার দিকটিও উঠে এসেছে এখানে।

দর কষাকষির প্রক্রিয়াটিও ছিল কঠিন। বহুবার বৈঠক করতে হয়েছে। এরপরও চুক্তির বিষয়টি অধরাই ছিল এবং ঘটনা অন্যরকমও হতে পারতো যদি না গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাবুল সফর করে বিষয়টাকে সহজ না করতেন।

চুক্তিটির শিরোনাম হলো আফগানিস্তান-পাকিস্তান অ্যাকশান প্ল্যান ফর পিস অ্যান্ড সলিডারিটি (এপিএপিপিএস)। সাতটি মূল পয়েন্ট রয়েছে চুক্তিতে যেখানে পারস্পরিক সন্ত্রাস-বিরোধী ভিশন ও নীতিগুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। এগুলো হলো: (এ) আফগান নেতৃত্বাধীন এবং আফগানিস্তানের মালিকানাধীন শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সমর্থন, (বি) মীমাংসার অনুপযোগী শক্তির বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপ, (সি) কোন সন্ত্রাসী গ্রুপকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানোর জন্য নিজের ভূমি ব্যবহার করতে না দেয়া, (ডি) মধ্যস্থতাকারী কর্মকর্তাদের সহায়তায় যৌথ সহযোগিতা মেকানিজম তৈরি করা, (ই) একে অন্যের আঞ্চলিক ও আকাশ সীমা লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা, (এফ) উদ্বেগ ও দ্বিমতের বিষয়গুলো নিয়ে দোষারোপ না করে এপিএপিপিএস মেকানিজমের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা, এবং (জি) যে ছয়টি ওয়ার্কিং গ্রুপ বর্তমানে কাজ করছে, এগুলোর বাইরে এপিএপিপিএস ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে আরও ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা।

এটা সুস্পষ্ট যে চুক্তিটি আওতায় শুধু বাড়েনি, বরং উত্তেজনা সামাল দেয়ার জন্য একটা ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছে, আগে যেটা কখনও হয়নি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি এড়ানোর জন্য এটা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং এতে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটা হলো রাজনীতি নয়, কূটনীতিই এখানে মূল চালিকা নীতিমালা এবং সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে উভয়ের জন্যই এখানে দেয়া, নেয়া এবং দর কষাকষির অনেক সুযোগ রয়েছে। এ কারণেই সঙ্ঘাত ও বিভাজনের আশঙ্কা কমে আসবে।

এটা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই যে দুই দেশকেই চুক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য সত্যিকারের আগ্রহ দেখাতে হবে এবং এজন্য তাদেরকে কিছু সুনির্দিষ্ট এবং শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেখানে নিশ্চিতভাবেই দুই দেশের সীমা এবং নমনীয়তার একটা পরীক্ষা হয়ে যাবে। যেটা চুক্তির অংশ নয় এবং দুই পক্ষের কারো দিক থেকেই যেটা উল্লেখ করা হয়নি, সেটা হলো অন্য শক্তিগুলো বিশের করে চীনের ভূমিকা। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান এই ধরনের শান্তি ও স্থিতিশীলতা চুক্তির মধ্যে নিয়ে আসার জন্য অথবা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য চীন নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়।

‘আফ-পাক’ অঞ্চলে চীনের প্রবেশ

প্রবেশের ব্যাপারটি নতুন নয় বা গোপনীয়ও নয়। পাকিস্তানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর নাসের জাঞ্জুয়া এরই মধ্যে স্বীকার করেছেন যে চীনের ইতিবাচক কূটনীতি আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে সাহায্য করছে। দুই দেশেরই রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আলাদা রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যে কারণে চীন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, সেটা হলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ও সিপিইসির মতো সংযোগ প্রকল্পগুলোর জন্য পাকিস্তান-আফগানিস্তান সুসম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবতা হলো, পাক-আফগান সম্পর্ককে যখনই নিরাপত্তা সহযোগিতার বাইরে আরও সম্প্রসারণের প্রশ্ন এসেছে, তখনই চীনের ভূমিকা এখানে দারুণ কাজ করেছে। এটা বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান যদি টেকসই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়তে চায়, সেক্ষেত্রে চীনের সংযোগ প্রকল্পগুলো দুই দেশের মধ্যে ভূ-অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, যেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এটা ঠিক যে, এই সমন্বয়ের ফলে চীনের নিজের স্বার্থ পূরণ হবে। কিন্তু একইসাথে এর ফলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানও রুক্ষ ভূ-কৌশলগত মানচিত্রকে ভূ-অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে পারবে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয়েই এটা বুঝতে পেরেছে যে এ ধরনের একটা রূপান্তরের কতটা সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা বোঝা গেছে যখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মেরামতের জন্য পাকিস্তানের উদ্যোগে নেয়া কর্মসূচি (এপিএপিপিএস) চুক্তিতে রূপ নিয়েছে এবং আফগানিস্তান তাদের দিক থেকে পাকিস্তানের প্রতি ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

চুক্তির পর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। পাকিস্তানকে যেখানে আগে দেখা হতো ‘তালেবান সমর্থক’ হিসেবে, সেখানে এখন তাকে দেখা হচ্ছে ‘যুদ্ধ নিরসনে সমাধানের অংশ’ হিসেবে।

পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এপিএপিপিএসের বৈঠকে আফগান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আফগানিস্তানের ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেকমাত খলিল কারজাই। তিনি বলেন, “পাকিস্তান সমস্যা নয়, সমাধানের অংশ” এবং এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছাড়া নিরাপত্তা লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।

এই জায়গাতেই ‘চীন ফ্যাক্টরের’ ব্যাপক উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে, যেটা এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

এপিএপিপিএসের মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান যেটা অর্জন করেছে, সেটাকে আরও সংহত করার জন্য এবং আগে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় আলোচনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য চীন এরই মধ্যে বেইজিংয়ে তিন দেশের ভাইস-পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ঘোষণা দিয়েছে, যেটা এই মাসেই শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হবে।

চীনা কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ত্রি-পক্ষীয় সংলাপের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ইসলামাবাদের সাথে কাবুলের উত্তেজনা প্রশমন এবং তিন দেশের মধ্যে নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়া।

পাক-আফগানিস্তান কঠোর সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে চীনের এই সাফল্য তাদের নিজস্ব সংযোগ প্রকল্পকে সফল করার পেছনেও ভূমিকা রাখবে, যে সংযোগ প্রকল্পটি চীন থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম, পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়া অঞ্চল পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পুরো কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তান এবং দুই দেশ যদি তাদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে না পারে, তাতে চীনের নিজের সাফল্যও অধরা রয়ে যাবে এবং উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে। সে কারণেই চীনের এই ইতিবাচক কূটনীতি।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয়কেই তাই এটার উপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে হবে। তাদেরকে এটার পুণর্মূল্যায়ন করতে হবে যে যুদ্ধ এবং দোষারোপের খেলায় বহু বছর নষ্ট হয়েছে। যদি কোন পরিবর্তন আনতে হয়, তাহলে সেটা এখনই করতে হবে।

print
শেয়ার করুন