জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া

আজম খান,
শেয়ার করুন

তারুণ্যে পাভেলের কাছে আদর্শ ছিলেন কামাল আতাতুর্ক। আধুনিক ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে বর্তমান তুরস্ককে গড়ে তোলার কারণে তার মধ্যেই তিনি প্রগতিশীল আদর্শ মুসলিম নেতৃত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। তারপর একদিন একটি ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তিনি যেসব তথ্য পেলেন, তাতে বিস্মিত হয়ে গেলেন। এখানে তার নায়ককে নির্মম, অধার্মিক, ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বৈরাচার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাভেল প্রতিবেদনটি যতই পড়তে লাগলেন, ততই তার মোহভঙ্গ হতে লাগল।

মিডিয়া এমনই শক্তিশালী। কলমের এক খোঁচায় মিডিয়া কোনো নায়ককে খলনায়কে পরিণত করতে পারে। অবশ্য পাভেলের সৌভাগ্য, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন, ম্যাগাজিনটির প্রকাশকেরা চরমপন্থী। তারা এমন সংগঠনের সদস্য, যেটি অনেক মুসলিম দেশে নিষিদ্ধ। তিনি ওই চিন্তাধারায় অগ্রসর হলেন না। তবে অনেক তরুণ কিন্তু ওই ধারাই অনুসরণ করছে। এই মিডিয়াই চরমপন্থী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, চরমপন্থী বানানোর জন্য, সহিংসতা, জঙ্গিবাদ ও মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

সৌভাগ্যবশত, বিপরীতটিও সত্য। মিডিয়া শান্তি ও সম্প্রীতি বিকাশে, মানুষে মানুষে ভালোবাসা বাড়াতে, সংহতি ছড়িয়ে দিতেও পারে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে মিডিয়াকে তেমনভাবে ব্যবহারও করা হচ্ছে না। তবে জঙ্গিবাদবিরোধীদের চেয়ে জঙ্গিরাই এই হাতিয়ারটি বেশি ব্যবহার করছে। আর ভুল হাতে অস্ত্র পড়লে তা যে কত বিপজ্জনক হতে পারে, তা জানা কথাই।

মিডিয়াই বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র

মিডিয়া এখন আর সংবাদপত্র, রেডিও ও টিভির মধ্যে সীমিত নেই। সামাজিক মাধ্যম একটি বিপ্লব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি এখন মূলধারার মিডিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় বলা হতো, ‘তরবারির চেয়ে কলম বেশি শক্তিশালী’। এখন কলমের স্থানে এসেছে ল্যাপটপ আর স্মার্টফোন।

অনেক সময় সাংবাদিকেরা যোদ্ধা হিসেবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে পারেন। জঙ্গিরা যদি স্মার্ট হয়, তবে মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের তাদের চেয়ে বেশি স্মার্ট হতে হবে। সাংবাদিকরা যদি হয় যোদ্ধা, তবে মিডিয়া হবে তাদের হাতিয়ার। সংবাদপত্র, জার্নাল, ম্যাগাজিনের চেয়ে এখনকার সামাজিক মাধ্যম অনেক বেশি ধারাল তরবারি।

অবশ্য মিডিয়া ধারল তরবরি হলেও সেটি দু’ধারী অস্ত্র। এর ভালো দিক রয়েছে, আবার অপব্যবহার হলে এর খারাপ দিকও রয়েছে। এটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সন্ত্রাসবাদ ছড়াতে পারে। জঙ্গিবাদের জন্য মিডিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়ই। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে এর ব্যবহার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ওসামা বিন লাদেনের কথা বলা যেতে পারে। তাকে মিডিয়ায় ব্যাপক কভারেজ দিয়ে এমন ক্যারিশমেটিক নেতায় পরিণত করেছে যে বিশ্বজুড়ে অনেক তরুণ তার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়। তাকে শয়তানের দুনিয়ার বিরুদ্ধে বিপ্লবে নিয়োজিত মুসলিম চে গুয়েভারা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। যেসব সাংবাদিক আল-কায়েদা বা লাদেনকে ছড়িয়ে দিতে চাননি, তারাও তাকে বিপুলভাবে সামনে এগিয়ে দেয়।

বাংলাদেশেও মিডিয়া অসচেতনভাবে একই ধরনের ‘ফাঁদে’ পড়ে গেছে। এটি দেখা গেছে সামান্য মোল্লা বাংলা ভাই ও তার চরমপন্থী সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ তথা জেএমবিকে তাদের ধর্মীয় শক্তির বাইরেও ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আধুনিককালের রবিনহুড হিসেবে তুলে ধরা হয়। চরমপন্থী কমিউনিস্ট সংগঠন সর্বহারাদের হাতে দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতিত লোকদের কাছে তারা ‘রক্ষক’ হিসেবে অভিহিত হয়।

অবশ্য সচেতন মিডিয়া ও মিডিয়ার সচেতনতা এ ধরনের দায়িত্বহীন ও অপরিণামদর্শী অবস্থা এড়াতে পারে। সাংবাদিকেরা এ ধরনের প্রতিবেদন এড়ানোর দায়িত্বটি পালন করতে পারেন। সর্বহারাদের চেয়ে যে জেএমবি কম নৃশংস নয়, তাও তারা তুলে ধরতে পারে।

মিডিয়া যদি শক্তিশালীই হয, তবে ফিকশনাল স্পাইডারম্যানের একটি কথাও সাংবাদিকদের স্মরণে রাখা উচিত: ‘বিপুল শক্তি থাকলে দায়দায়িত্বও থাকে বিপুল।’

সহিংস চরমপন্থা প্রতিরোধে

বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন যুগের সাংবাদিকদের অবশ্যই সঙ্ঘাত স্পর্শকাতর হতে হবে। এখনকার সাংবাদিকতা ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো হবে না। এখন যুদ্ধ হচ্ছে আঙিনায়। গুলশানের হলি আর্টিজান ধরনের ঘটনা যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বিস্ফোরিত হতে পারে।

সহিংস চরমপন্থা দমনে মিডিয়া পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ উভয় ধরনের ভূমিকাই পালন করতে পারে। অনেক কারণেই চরমপন্থার উদ্ভব ঘটতে পারে। এগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি অসন্তোষ। সরকার যদি তার নাগরিকদের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারে, তাদের নিরাপদ, সন্তুষ্ট রাখতে না পারে, হতাশা থেকে মুক্তির জন্য তাদের হাতে বিকল্প কোনো পথ না থাকলে তারা এ দিকে ঝুঁকতে পারে।

চরমপন্থার প্রতি পরোক্ষ হামলা করার লক্ষ্যে সাংবাদিকরা সুশাসনকে তুলে ধরতে পারে, খারাপ কিছুও প্রকাশ করতে পারে। সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্রও হয়তো সন্ত্রাসীদের হত্যা করতে পারে, তবে আমি নিশ্চিত, সুশাসনও সন্ত্রাসবাদকে হত্যা করতে পারে। ইতিবাচক উন্নয়ন কাহিনী প্রকাশ, দুর্নীতি তথ্য প্রকাশ, অপরাধের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার মাধ্যমে সুশাসনের পক্ষে কাজ করতে পারে সাংবাদিকরা।

ভাষ্য

ভাষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জঙ্গিরা তাদের কথা এমনভাবে বলে যাতে মনে হবে, তারা সব রোগের সমাধান দিতে পারে। গণতন্ত্রের শূন্যতা, মৌলিক মানবাধিকারের অনুপস্থিতি, মূল্যবোধ না থাকা, যথাযথ নির্দেশিকা না থাকার বিষয়গুলোকে কাজে লাগায় চরমপন্থীরা। কর্তৃপক্ষ এসব ভাষ্যের জবাব দিতে পারে। সম্ভবত এটিই তাদের প্রধান দুর্বলতা।

মিডিয়া পাল্টা বক্তব্য না দিয়ে আসল তথ্যও প্রকাশ করতে পারে। এতে করে চরমপন্থীরা রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হতে পারে।

সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলায় মিডিয়াকে সরাসরি ভূমিকা পালন করতে হলে তার প্রয়োজন সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা। চরমপন্থীরা অনেক চতুর। এ কারণে সাংবাদিকদের উচিত হবে তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকা। মিডিয়ার ভূমিকা বর্তমান সময়ের সহিংস চরমপন্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

মিডিয়া স্রেফ পেছনে বসে সংখ্যা গুণে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না: জেএমপি ১০ জনকে হত্যা করেছে, র‌্যাব ২০টি হাতবোমাসহ জঙ্গি আস্তানা খুঁজে পেয়েছে ইত্যাদি বলেই কাজ শেষ নয় তার। মিডিয়ার উচিত হবে কৌশলগত খেলোয়াড়, যোদ্ধা হিসেবে সাহসিতকতা ও চতুরতা প্রদর্শন করা। সাংবাদিক এখন আর অমনোযোগী দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।

এখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনী বিজ্ঞ হলে এবং তারা যদি সত্যিই সন্ত্রাসবাদের উচ্ছেদ চায়, তবে তাদেরকে মিডিয়ার সাথে সহযোগিতার বন্ধন জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি মিডিয়া হলো জাতিভিত্তিক নেটওয়ার্ক। তারা গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সাথে তুলনীয় হতে পারে।

বর্তমান সময়ের মিডিয়া অবশ্যই পক্ষপাতদুষ্ট। তবে তা কোনো রাজনৈতিক দলের বা সরকারের প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ হতে পারবে না। তাদের পক্ষপাত প্রদর্শন করতে হবে জনগণের প্রতি, মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে হবে, সব ভালো কিছু তুলে ধরতে হবে। আর তা করতে হলে তাদেরকে যেকোনো সহিংস চরমপন্থার বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।

চরমপন্থীরা গ্রিক মিথের হাইড্রার মতো। তার একটি মাথা কর্তন করা হলে দুটি গজায়। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের হতে হবে ফনিক্সের মতো। যদি জঙ্গিরা কিংবা বৈরী শাসনযন্ত্র মিডিয়াকে ধ্বংস করতে চায়, নির্মূল করতে চায়, তবে তাদেরকে ভস্ম থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। হাইড্রার কতটি মাথা গজাতে পারে? মিডিয়াকে সেজন্য তৈরি থাকতে হবে।

তাল মিলিয়ে চলা

এখনকার দুনিয়ার চরমপন্থীরা আর অজ্ঞ উন্মাদ নয়। বরং তারা শিক্ষিত, প্রযুক্তিবান্ধব ও আধুনিকতার মাধ্যমে তাদের বিকৃত বার্তা চতুরতার সাথে দিয়ে থাকে। এর সাথে তাল মেলাতে হবে মিডিয়াকে। সহিংস চরমপন্থীদের মোকাবিলা করতে হলে তাদেরকেও ধর্মীয় মতাদর্শ সম্পর্কে জানতে হবে। তাদেরকেও প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে, সাইবার কমিউনিকেশনের অগ্রগতি সম্পর্কে পুরো ধারণা থাকতে হবে তাদের।

শেষ কথা হলো, মিডিয়াকে সচেতন থাকতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে এবং আগ্রাসী হতে হবে (এটি সবসময় খারাপ নয়!)।

print
শেয়ার করুন