রাশিয়া থেকে ইরান: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্রসফায়ারে ভারত

রাশিয়া থেকে ইরান: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্রসফায়ারে ভারত

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন

রাশিয়া ও ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে আইন করেছে ভারতের জন্য সেটা বড় মাথাব্যাথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত একদিকে রাশিয়ার সাথে সামরিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরানের চাহাবার বন্দরের মাধ্যমে আফগানিস্তানের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাদের এই দুই প্রচেষ্টাই এখন হুমকির মুখে।

গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য একটি আইনে স্বাক্ষর করেছেন: ‘দ্য কাউন্টারিং অ্যামেরিকা’স অ্যাডভার্সারিজ থ্রু স্যাঙ্কশান্স অ্যাক্ট’ বা সিএএটিএসএ। এই আইনের ২৩১ ধারায় বলা হয়েছে, যে সব দেশ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা শাখার সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লেনদেন করবে, তাদের উপরও সেকেন্ডারি অবরোধ আরোপ করা হবে।

রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সামরিক সহযোগী ভারত। ক্রিমিয়াতে রাশিয়ার সীমালঙ্ঘন, সিরিয়া গৃহযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাদের কথিত হস্তক্ষেপের অভিযোগে রাশিয়াকে শাস্তি দেয়ার জন্য যে আইন করা হয়েছে, তার তাপ ভারতের গায়েও লাগছে।

রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে যে অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, এই নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সেখানে আলোচনা হবে।

বৈঠকে আলোচনার প্রধান মনোযোগ থাকবে রাশিয়ার কাছ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ভারতের পাঁচটি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনার বিষয়টি, যেটাকে ভারতের সামরিক বাহিনী ‘গেম চেঞ্জার’ মনে করছে। এই সিস্টেম ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং স্টেলথ আকাশযান ঠেকাতে সক্ষম এবং একই সাথে এটা অর্জন করতে পারলে ভারত পাকিস্তানের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে।

এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমই ভারতের একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়। রাশিয়ার সাথে ঐতিহাসিকভাবে সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে ভারত। ভারতের সামরিক বাহিনীর সরঞ্জামাদির একটা বিরাট অংশই রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা।

গত পাঁচ বছরে ভারত যত সামরিক সরঞ্জামাদি আমদানি করেছে, এগুলোর মধ্যে ৬২ শতাংশই রাশিয়ার তৈরি। ২০০৮-২০১২ সালে ভারতের আমদানিকৃত সামরিক সরঞ্জামের ৭৯ শতাংশই ছিল রাশিয়ান। ভারতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামোর জন্য রাশিয়ার যন্ত্রাংশ, সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাশিয়ার সাথে সামরিক বাণিজ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেটা এই অঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

রাশিয়া যেহেতু পশ্চিমাদের সাথে টালমাটাল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই পশ্চিমাদের সাথে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইনের কারণে সদ্য নির্মিত ইরানের চাবাহার বন্দর নিয়েও ভারতের সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কারণ ইরান চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেহরানের উপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।

ভারতের সহায়তায় ইরানের চাবাহার বন্দরটি নির্মিত হয়েছে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানে প্রবেশের একটা পরিবহন করিডোর হিসেবে। এর ফলে একদিকে আফগানিস্তানের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের দুয়ার খুলে যাবে, অন্যদিকে বাণিজ্যের জন্য পাকিস্তানের উপর নির্ভরতাও কমবে তাদের। কারণ পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক মাঝে মাঝেই অবনতি হয়।

আফগানিস্তানের বাণিজ্য বাড়াতে এবং সেখানকার অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং এর উপর ভিত্তি করে যে শিল্প গড়ে উঠে সেটার প্রস্তুতিমূলক কাজ হিসেবে যে সব পরিবহন ও জ্বালানি নেটওয়ার্ক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে চাবাহার বন্দর অন্যতম।

পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত পথ এড়িয়ে ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক রক্ষার একটা পথ হলো এই চাবাহার বন্দর। গত বছর বিভিন্ন কারণে পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত ৫০ দিন বন্ধ ছিল।

২০১৫ সালে ছয়টি দেশের মধ্যে ইরান পারমানবিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল – ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং চীন। চুক্তির অধীনে ইরানের পারমানবিক কর্মসূচি কমিয়ে আনার বদলে তাদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

চলতি মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরান চুক্তি বা জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশান (জেসিপিওএ) থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, এই চুক্তিটি ‘বিব্রতকর’ এবং এর ‘মূল জায়গায় ত্রুটি রয়ে গেছে’ এবং এই চুক্তি আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় ব্যার্থ হয়েছে।

অন্যান্য বিশ্ব শক্তিগুলো ঐতিহাসিক এই চুক্তিটি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই চুক্তির অধীনে ইরানের পারমানবিক কর্মসূচির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

print