হাল ছেড় না কখনো

হাল ছেড় না কখনো

ইকরাম সেহগাল,
শেয়ার করুন

গত কয়েকটি মাস দুবাইভিত্তিক আবরাজ গ্রুপের জন্য বেশ কঠিন সময় যাচ্ছে। বছরের শুরুতে মেনসা অঞ্চলে প্রাইভেট ইক্যুইটি বিনিয়োগে বিশেষায়িত এই ব্যাংকটি সমস্যা কাটিয়ে ওঠতে পারবে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে দুর্বল করপোরেট পরিচালনাব্যবস্থা ও গ্রাহক অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ফলে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য মর্যাদাসম্পন্ন গ্রাহক তাদের স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে একের পর এক খারাপ খবর পাঠাতে থাকে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের মনে হতে থাকে, বিষয়টি কেবল এই অঞ্চলের চমৎকার খ্যাতিই নষ্ট করছে না, সেইসাথে অতীতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপারে যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হতো, সেটিও শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আবরাজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পাকিস্তানি ব্যবসায়ী আরিফ নকভি ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর সময় থেকে প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি এর তহবিল ব্যবস্থাপনার প্রধান থেকে পদত্যাগ করেছেন। এরপরপরই গ্রুপটি শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়, কর্মী ছাঁটাই চলে, ঘটনা তদন্তে বাইরের সহায়তা গ্রহণ করা হয়, গ্রাহকদের সাথে সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হয়। কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজ কিংবা অবৈধ তৎপরতায় জড়িত থাকার কথা আরিফ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। আরিফ নকভি ও তার গ্রুপের বিরুদ্ধে নানা গুজব ও অভিযোগ ছড়ানো হলেও একজনও তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অন্যায় কাজের অভিযোগ আনেনি। এটিই তার আন্তরিকতা ও সততার মাত্রা প্রকাশ করে, তার প্রতি মানুষের ধারণাও এতে বোঝা যায়।

আরিফ ১৯৯৪ সালে কোপলা নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন দুবাইতে। স্থানীয় একটি মলে এক র‌্যাফেল ড্রতে ‘৫০ হাজার ডলার সঞ্চয়’ ও একটি র‌্যাঞ্জ রোভার জয় করেন। তিনি কয়েকটি চুক্তিও লাভ করেন। ২০০০ সাল নাগাদ কোপলা বিভিন্ন খাতে ৩৫টি কোম্পানির মালিক হয়। এরপর আবরাজ গ্রুপের জন্ম হয়। বাকিটা ইতিহাস। তবে গত পাঁচ মাসে আবরাজ গ্রুপের মূল্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরিফ দুবাইতে প্রতিষ্ঠা করেন আবরাজ। তবে এটি বিশ্বের অন্যতম বিনিয়োগকারীতে পরিণত হয়। আবরাজের ট্র্যাক রেকর্ডই তার সফলতার সত্যিকারের প্রমাণ। তিনি তার নিজের প্রতিভার সাথে অনেক প্রতিভাধর পেশাদারকে তার প্রতিষ্ঠানে জড়ো করেছিলেন। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, আর্থিক পরিষেবা, অবকাঠামো ইত্যাদি খাতে ভূমিকা পালন করতেন। দিন-রাত পরিশ্রম করে তারা চাকরি সৃষ্টি করতেন, সফট ও হার্ড অবকাঠামো নির্মাণ করতেন, জীবন রক্ষাকারী পরিষেবা সম্প্রসারণ করতন, নানামুখী ব্যক্তি ও পরিবারের কাছে পৌঁছাতেন।

আবরাজ কেবল আর্থিক ও বেসরকারি ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠানই ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির মানবিক অবয়বও ছিল। পুরোপুরি সংগঠিত হওয়ার পর আবরাজ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি ফেরত প্রদানের পাশাপাশি যে এলাকায় তারা কাজ করতো, সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে নানা জনহিতকর কাজ করতো। আবরাজের অনেক কর্মী উদ্যোক্তাদের পরামর্শ প্রদান, শ্রেণীকক্ষে গিয়ে লেকচার প্রদান, বিশেষ পরিস্থিতিতে তহবিল সংগ্রহের কাজ করতো। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় আবরাজ গ্রুপ হেলথ কেয়ার ফান্ড ও কেয়ার হসপিটালস হৃদরোগে আক্রান্ত আফগান শিশুদের চিকিৎসা সেবা দিতো। আবরাজ ও কেয়ার ৪০ ভাগ ভর্তুকিতে ৫০০ শিশুকে বিশ্বমানের সার্জিক্যাল পরিচর্যা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। আবরাজ বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থার সাথে কাজ করত।

সাদামাটাভাবে শুরু করেও প্রতিষ্ঠানটি ৩০০ অংশীদারের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের ব্যবস্থা করতে পেরেছিল। আর তা করেছে একজন পাকিস্তানি নাগরিক। ২০১১ সালে প্রাইভেট ইক্যুইটি ইন্টারন্যাশনাল ৫০ জন গ্লোবাল প্রাইভেট ইক্যুইটি ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম হিসেবে আরিফ নকভির নাম ঘোষণা করে।

নানা জঘন্য গুজব সত্ত্বেও আরিফ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন, আবরাজ গ্রুপের এখনো বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞ নেতা ও প্রতিভাধর কর্মীবাহিনী রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন কোনো কাজ হবে না।

সত্যিকারের প্রতিভাধর উদ্যোক্তা হিসেবে আরিফ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন মানবকল্যাণের সহজাত বিষয়টিকে। অবশ্য তার বিনিয়োগ থেকেও বিপুল মুনাফা আসত। আরিফ পরাজয় স্বীকার করতে জানেন না। যারা তাকে বিশ্বাস করে, তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে, তাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো লোক নন তিনি। আমার আলমা ম্যাটার্স (লরেন্স কলেজ ঘোরাগলি) মূল্যমন্ত্র ‘হাল ছেড় না কখনো’ আরিফ নকভির সাথে পুরোপুরি খাপ খেয়ে যায়।

print
শেয়ার করুন