চীন-ভারত সম্পর্কের যত্ন নিচ্ছে এসসিও

চীন-ভারত সম্পর্কের যত্ন নিচ্ছে এসসিও

লং শিংচুন,
শেয়ার করুন

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার সাংহাই কোঅপারেশান অর্গানাইজেশানকে (এসসিও) এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট শি সাংহাই স্পিরিটকে এগিয়ে নিতে এবং সংস্থার স্থিতিশীল উন্নয়নের জন্য ভারতসহ সদস্য দেশগুলোর সাথে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। পূর্ব চীনের শানডং প্রদেশের কিংদাওতে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনে মোদিও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, নতুন সদস্য দেশ হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য ভারত প্রস্তুত।

এই সম্মেলনের মাত্র ৪০ দিন আগে উহানে অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট শি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি। ভারত ও চীনের নেতার মধ্যে টানা দ্বিতীয় দফা বৈঠকের ক্ষেত্রে এই ৪০ দিন সময়ের পার্থক্য ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। এতে করে চীন-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বটি ফুটে উঠেছে। একই সাথে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসসিওর গুরুত্বও বোঝা যাচ্ছে।

চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত আস্থা বাড়ানোর জন্য এসসিওতে ভারতের সদস্য হওয়ার  বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত সংস্থার পঞ্চম সম্মেলনে সংস্থার পর্যবেক্ষক হয় ভারত। তখন থেকে এর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করে আসছে তারা। কিন্তু এসসিওর নীতিতে নতুন সদস্য গ্রহণের ক্ষেত্রে আলোচনার ভিত্তিতে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকায় এ জন্য খানিকটা সময় লেগেছে। নয়াদিল্লী এক সময় ভাবতো বেইজিংয়ের কারণেই তাদের সদস্যপদ বিলম্বিত হচ্ছে। কিছু ভারতীয় মিডিয়া এবং পণ্ডিত এমনকি এজন্য চীনের সাথে ভারতের শত্রুতার সম্পর্ককেও দায়ি করেন। তাদের প্রচারণা চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে এবং চীনের প্রতি ভারতের সামাজিক অনাস্থাকে আরও তীব্র করে।

চীন এখানে ভারতের সদস্যপদ চায় না-এসসিওতে ভারত সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সংস্থার আনুষ্ঠানিক সদস্য হিসেবে সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি ভারতীয় মিডিয়া এবং থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে, যেটা কৌশলগত আস্থাকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

এসসিওতে ভারত সদস্য হওয়ায় মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনেও সহায়তা হবে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদনকারী হিসেবে রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে যেহেতু তাদের তেল-গ্যাসের চাহিদার ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হয়, তাই মধ্য এশিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যাপারে সমস্যা রয়েছে ভারতের। যেহেতু পাকিস্তান ও ভারত উভয়েই এখন এসসিও সদস্য হয়েছে, তাই এখন এসসিও’র সদস্য দেশগুলোর সম-স্বার্থের বিবেচনায় মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি অনেক সহজ হবে।

রোববারের সম্মেলনের পর, সদস্য দেশগুলো রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনীতি, আর্থিক, বিনিয়োগ, পরিবহন, জ্বালানি, কৃষি এবং মানবিক সহায়তা খাতের উন্নয়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। যেখানে বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার সাথে ভারতের সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে চীন-ভারত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি মিলেছে।

এসসিওতে ভারত অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নেও চীনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে। সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ – এই তিন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ছাড়াও সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন নিরাপত্তার বিষয়টি সম্মেলনের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। ২০১৯-২১ সময়কালের জন্য সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থা মোকাবেলার জন্য যে কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, সেখানে সংস্থার সদস্য দেশগুলো একে অন্যকে সহযোগিতা করবে।

জয়েশ-ই-মোহাম্মদ নেতা মাসুদ আজহারকে কিভাবে ঠেকানো যাবে, এ ব্যাপারে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছে চীন ও ভারত। সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে চীনের বিরুদ্ধে দ্বৈত-নীতি গ্রহণের অভিযোগ করে আসছে ভারত। তাদের এ অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলেছিল। চীন, ভারত ও পাকিস্তান সবাই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান এসসিওতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সন্ত্রাস দমনে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হবে। এসসিও’র সন্ত্রাস দমন ম্যাকানিজমের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করতে পারবে চীন ও ভারত।

এসসিওতে ভারত সদস্য হওয়ায় বেইজিং ও নয়াদিল্লী এখন এশিয়ার ঐক্য এবং নিরাপত্তা নিয়ে আরও অবদান রাখতে পারবে। ভারতের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এসসিও বিশ্বের সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী আঞ্চলিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করছে এই সংস্থা। এশিয়া অর্থনৈতিক বিবেচনায় সবচেয়ে গতিশীল অঞ্চল এবং মার্কিন ইন্দো-প্রশান্ত নীতি হয়তো এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কিছুটা বিভেদ তৈরি করতে পারে।

এপ্রিলের শেষ দিকে উহানে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সাক্ষাতের জন্য সোচিতে গিয়েছিলেন মোদি। এরপর জুনের শুরুর দিকে সাংগ্রি-লা ডায়ালগে ইন্দো-প্রশান্ত কৌশল নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন মোদি। চীন-রাশিয়া-ভারতের কৌশলগত যোগাযোগ ও সহযোগিতা এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে এবং এশিয়ায় ঐক্য, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে।

সাংগ্রি-লা ডায়ালগে মোদি তার কি-নোট বক্তৃতায় যেমনটা বলেছেন, “আমাদের দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এশিয়া ও পুরো বিশ্বের জন্য ইতিবাচক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে যেখানে একে অন্যের স্বার্থের ব্যাপারে স্পর্শকাতর চীন ও ভারত আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে একত্রে কাজ করবে।

লেখক চারহার ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ফেলো এবং চায়না ওয়েস্ট নর্মাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজের ডিরেক্টর

print
SOURCEগ্লোবাল টাইমস
শেয়ার করুন