এশিয়ায় বৃহৎ কৌশলের ঘাটতি রয়েছে ভারতের

এশিয়ায় বৃহৎ কৌশলের ঘাটতি রয়েছে ভারতের

সুমান্ত্রা মৈত্র,
শেয়ার করুন

ভারত যখন অগ্নি-৫ মিসাইলের পরীক্ষামূলক নিক্ষেপ করছিল, তখন অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গণতান্ত্রিক কোয়াডে যোগ দেয়ার আহ্বানও জোরালো হচ্ছিল। ৫০০০ কিলোমিটার পাল্লার মিসাইলের এটা ছিল ষষ্ঠ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে যে কোন পরাশক্তির বিরুদ্ধে মোকাবেলার শক্তি অর্জন করলো ভারত। একইসাথে, ভারতীয়, জাপানি এবং আমেরিকান নৌবাহিনী মালাবার মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। ওদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে মরুভূমি পরিস্থিতিতে বিমান মহড়ায় অংশ নিচ্ছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। মনে হতে পারে যে ভারত তার শক্তিতে শান দিচ্ছে এবং অস্ত্রশক্তি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এশিয়ায় ভারত যে ভারসাম্য রক্ষা করে জোটবদ্ধ হবে – এই ধারণাটা নতুন নয়। বুশ প্রশাসন চেয়েছিল আফগানিস্তানে নিরাপত্তা বোঝাটা কিছুটা ভাগাভাগি করুক ভারত। বাজপেয়ী সরকার খানিকটা রাজিও হয়েছিল। সম্প্রতি বিষয়টা আবারও সামনে এসেছে। গত মাসে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন এক নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, এশিয়াতে ভারতের দায় নেয়া উচিত এবং দেখানো উচিত যে তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও অর্থনীতির ‘দাঁত’ আছে।

কিন্তু ঠিক কিভাবে ভারত সেটা করবে, তা পরিস্কার নয়। ভারত পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করে আর ভারতীয় নৌবাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে যৌথ টহলে অংশ নেয়, এগুলো হলো লোক দেখানো বিষয়। আফগানিস্তানে স্থায়ীভাবে ভারতীয় সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছিল। অবশ্যই এগুলোর কিছুই ঘটেনি। সবগুলো আইডিয়াই ভারতের কৌশল প্রণেতারা বাতিল করে দেন। এদের মধ্যে বর্তমান নৌবাহিনী প্রধানও রয়েছেন। ভারতের স্থায়ী কৌশলগত বিবেচনার কাছে ভারতের সরকার এবং নেতৃত্ব গুরুত্বহীন। ভারতের সাথে যারা কথিত জোটে রয়েছে, এদের মধ্যে একটি মাত্র দেশের শুধু চীনের সাথে সীমান্ত রয়েছে। এটা বিবেচনা করলে কোন সামরিক জোটে ভারতের অংশ নেয়াটা কার্যত অসম্ভব। তাছাড়া কাল যদি কোন সঙ্ঘাত বাঁধে তাহলে ভারতের জটিল পরিস্থিতির কোন সমাধান সেখানে থাকবে, এমন ভাবনাটাও অসম্ভব। ভারতের নীতি নির্ধারকরা বিষয়টা খুব ভালো করেই জানেন।

এছাড়া, এশিয়ায় নেতৃত্বের ভূমিকা নেয়ার জন্য যে সামাজিক সংহতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা দরকার, ভারতের সেটা নেই। ভারতের পররাষ্ট্র নীতির সাথে জড়িত আমলাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তারা মারাত্মক ধীরগতির। ভারতের লাগোয়া কাশ্মীর ও মিয়ানমারে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। অতীতে এই জায়গাগুলোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এখন তাদেরকে অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বহুপাক্ষিক জোটের অংশ হতে হচ্ছে। কোন পক্ষ না নেয়ার প্রশিক্ষণটি ভারতের সমস্ত পররাষ্ট্র দফতরের সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। কোন পক্ষ না নেয়ার যে ভারতীয় নীতি, তারই প্রতিফলন এটা। এক বিবেচনায় মধ্যম সারির শক্তি হিসেবে এই নীতি যথার্থ। এই নীতির ফলে সঙ্ঘাতের সময় তারা পক্ষ বাছাইয়ের সুযোগ পাবে এবং সব পক্ষের সাথে লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে।

স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি বোঝার একটা সহজ উপায় হলো কৌটিল্যের শিক্ষাগুলোতে নজর দেয়া। কৌটিল্য ভারতের সবচেয়ে আদি কৌশলগত চিন্তক এবং মৌরিয়ান আমলের সাধু। কৌটিল্য তার ‘অর্থশাস্ত্র’ বইয়ে কৌশলকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ত্রিমুখী নীতি: শান্তির সন্ধান, চুপচাপ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া এবং শত্রুর শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব। ভারতের নীতিকে কৌটিল্যের প্রজ্ঞার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।

কিন্তু এ অঞ্চলে ভারতের বড় কোন মিত্র নেই। তাই আসন্ন বড় শক্তিগুলোর লড়াইয়ের মধ্যে কোন একটির পক্ষ নেয়াটা তার জন্য ভাল হবে না। দেশের কৌশলগত ডিএনএ’র মধ্যে সেটা নেই। ভারতের এ ধরনের কোন ইচ্ছা নেই এবং এরকম শক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া এবং এরপর দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতার সাথে সেই সিদ্ধান্তের উপর টিকে থাকার সক্ষমতাও নেই। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বহু কাঠামোগত ইস্যু রয়েছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতির কারণে দেশের জরুরিভাবে বিনিয়োগ দরকার। ভারতের উপর তাই বড় ধরনের কৌশল আরোপের চেষ্টা অকার্যকর হবে।

print