উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে তৈরি নেপাল?

উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে তৈরি নেপাল?

সুধীর শ্রেষ্ঠ,
শেয়ার করুন

স্বল্প উন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে নেপালকে উত্তরণ না ঘটানোর জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটি জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে। নেপাল জানিয়েছে, জাতীয় আয়ের বৈশিষ্ট্য পূরণ করা ছাড়া এই উত্তরণ ঘটানো হলে তা টেকসই হবে না।

এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে হলে তিনটি বৈশিষ্ট্যের দুটি পূরণ করতে হয়। এগুলো হলো আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক নাজুকতা। টানা দুই মেয়াদে ত্রীবর্ষীয় পর্যালোচনার পর জাতিসংঘ এই উত্তরণবিষয়ক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। আয়ের বৈশিষ্ট্যটি মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ভিত্তিতে হয়ে থাকে। নেপাল টানা দুটি মেয়াদে (২০১৫ ও ২০১৮) মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক নাজুকতা সূচকে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন নেপালের অনুরোধে জাতিসংঘ রাজি হলে চলতি বছরের বদলে ২০২১ সালে নেপালের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটবে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, বিশেষ করে রফতানি খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচিত হয়। মনে রাখতে হবে, ২০১৫ সালে ৪৭টি এলডিসির বিশ্ববাজারে রফতানি ছিল মাত্র ০.৯৭ ভাগ। নেপালের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি ও আমদানির অনুপাত ছিল ১:১৩। সরকার আশঙ্কা করছে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক সুবিধা প্রত্যহার করা হলে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা আরো বাড়বে। কোনো দেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর তাকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করা হয় না। বাণিজ্য ও রফতানি উন্নয়ন কেন্দ্রের উপনির্বাহী পরিচালক সুয়াশ খানালের মতে, নেপালের প্রায় ৮৫ ভাগ রফতানি হয় ‘শূন্য শুল্ক’ থেকে। তিনি আশঙ্কা করছেন, এলডিসি থেকে সরে গেলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কানাডা, তুরস্কের বাজারে তাদের প্রবেশ কঠিন হয়ে যাবে।

আর নেপাল-ভারত বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী, ভারতেই হয়ে থাকে নেপালের বেশির ভাগ রফতানি। নেপালের উত্তরণে এই রফতানিতে অবশ্য কোনো প্রভাব পড়বে না। ২০১৬-১৭ সালে নেপালের মোট রফতানির ৫৭ ভাগ ছিল ভারতে।

অবশ্য অনেকে মনে করে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হলে নেপাল আত্ম-নির্ভরশীলতা অর্জন করবে। এক্ষেত্রে মালদ্বীপের উদাহরণ দেওয়া হয়ে থাকে। মালদ্বীপ এই উত্তরণের আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাজারে তার টুনা মাছের ৪০ ভাগ রফতানি করত। শুল্ক প্রত্যাহারের পরও মালদ্বীপের মাছ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশ প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। বাজার বৈচিত্র্যকরণ, বিকল্প বাজার অনুসন্ধান করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশটি তার ঝুঁকি হ্রাস করেছে। তারা টুনা মাছের নতুন বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডকে বেছে নিতে পেরেছে।

কিন্তু নেপাল এখন পর্যন্ত বাজারকে বড় ও বহুমুখী করতে সক্ষম হয়নি। অন্যদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশ এলডিসিতে থাকলেও তারা প্রাণবন্ত তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে তুলতে পেরেছে। নেপালের পক্ষে তা গড়া সম্ভব হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে স্বল্প উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বিরূপ প্রভাব ন্যূনতম করার জন্য নেপাল বাজার গবেষণা, উৎপাদনশীলতা, ব্র্যান্ডিং, আলোচনার দক্ষতা, রফতানি বাজার সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে শুরু করছে। ইতিবাচক দিক হলো, উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, ক্রেডিট রেটিং বাড়াবে। এর ফলে পর্যটন ও পানিবিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে রফতানিও বাড়বে।

লেখক: গবেষণা সহকারী, এলডিসি ওয়াচ

print