ইন্দো-প্যাসিফিক ও পাকিস্তান

ইন্দো-প্যাসিফিক ও পাকিস্তান

জমির আওয়ান,
শেয়ার করুন

গত ২ জুন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিকে তার সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক কাঠামো প্যাসিফিক কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ করেছে। এটি এখন আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এটি কেবল প্রতীকি বিষয়ই নয়, বরং মার্কিন কৌশলগত চিন্তাধারার মূল্যায়নের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে এই ঘটনা কেবল চীনের জন্য নয়, চীন ও পাকিস্তানসহ ভারতীয় ও প্যাসিফক মহাসাগর তীরবর্তী সব দেশের জন্যই দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।

সিঙ্গাপুরে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) আয়োজিত সাঙগ্রি-লা সংলাপে এই পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গিযে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস ভারতের ভূমিকার কথা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। আমেরিকার আঞ্চলিক মিত্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়া সেই ২০১৬ সাল থেকেই ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’-এর কথা বলে এলেও যুক্তরাষ্ট্র এখন ধারণাটি গ্রহণ করেছে। এই ঘটনা ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে ‘কোয়াড্রিলেটারাল অ্যালায়েন্সে’ আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভূক্ত করার কাজটি সম্পূর্ণ করে। সাধারণভাবে ‘কোয়াড’ নামে পরিচিত এই গ্রুপের ঘোষিত লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে নৌ ও বিমান চলাচলের স্বাধীনতা ও বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করা।

বিশ্ব পর্যায়ে চীনকে সমান অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করতে অনিচ্ছা এবং ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো ক্ষতের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন উদীয়মান চীনকে দমন ও তার সাথে সঙ্ঘাতের জন্য বেপরোয়াভাবে কোয়াডের মতো ধারণাকে প্রচার করছে। দক্ষিণ চীন সাগরে সমুদ্র বিরোধে জড়িত ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে জোট গড়ছে।

‘আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী’ চীনের বিরুদ্ধে ‘মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা’ করা আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তি দেখাচ্ছে। চীনের দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপে সামরিকায়ন করা, জাহাজবিধ্বংসী ও ভূমি থেকে বিমানে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেট্রনিক জ্যামার ও বোমারু বিমান মোতায়েনের কথা উল্লেখ করেছেন জেনারেল ম্যাটিস। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এর জবাব ভারত, আসিয়ান ও অন্যান্য মিত্রের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াচ্ছে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য।

কিন্তু ঘটনার ধারাবাহিকতায় সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়, নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য চীন আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, বরং প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে মাত্র। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক যখন ইতিবাচক ছিল, সেই ২০০৬ সালেও বুশ প্রশাসন ভারতের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ার পথে এগিয়েছে। প্রচলিত ও কৌশলগত সামরিক সজ্জার মধ্যে ছিল ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, পরমাণু সাবমেরিন-চালিত ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র প্রদান। একইসাথে জাপানের উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী অ্যাবেকে জাপানি সামরিকায়নকে উৎসাহিত করে যুক্তরাষ্ট্র। তারা চীনের সাথে সেনকাকু/দিয়ায়ো দ্বীপ বিরোধে জাপানকে সমর্থন করে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে সমুদ্র বিরোধকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশকে উস্কানি দিতে থাকে। ওবামার ‘এশিয়ান পিভোট’ নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের ঘাঁটিগুলোতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ে। ট্রান্স-প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সামুদ্রিক রুটটি থেকে চীনকে দূরে রাখা।

তবে চীন তার সামরিক আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিকল্প রুটও তৈরি করছে। এর একটি উদাহরণ হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। এটি গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করবে। এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)।

ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সিপিইসির বিরোধিতা করা বিস্ময়কর নয়। ভারতকে প্রচলিত ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করার ব্যাপারে ওবামা ও বুশের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর হয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি আফগানিস্তানের মাটি থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে টিটিপি ও বালুচ জঙ্গিদের উৎসাহিত করতে ভারতের ভূমিকাকে নীরবে সমর্থন করেছেন মার্কিন জেনারেল ম্যাটিস।

পাকিস্তানের জন্য সমস্যা এখানেই। চীনকে সংযত রাখার জন্য ভারতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি মার্কিন সমর্থন পাকিস্তানের জন্য বহিরাগত হুমকি। ভারত কেবল দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়া-প্যাসিফিকেই ব্যাপক সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে না, সে এমন এক মতবাদ তৈরি করছে, যার ফলে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করার অবকাশ সৃষ্টি হয়। ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারতের ভূমিকা পাকিস্তানের সামুদ্রিক স্বার্থের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করেছে। এ কারণে পাকিস্তানেরও নৌশক্তি বাড়ানো প্রয়োজন। দরকার প্রয়োজনীয় পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা।

লেখক: পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত

print