কূটনীতির ভেজা পটকা

কূটনীতির ভেজা পটকা

মনি শঙ্কর আয়ার,
শেয়ার করুন

এটা ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে ভারত জাতিসংঘের নিউট্রাল নেশান্স রিপ্যাট্রিয়েশান কমিশনের চেয়ারম্যান হতে রাজি হওয়ার পরেই কেবল কোরিয়ান যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩) বন্ধের চুক্তি হয়েছিল। এই কমিশনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, উত্তর কোরিয়ার কোন সেনারা যৌথ কারাগারে আটক রয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কাদেরকে উত্তর কোরিয়া আটকে রেখেছে এবং প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কারা চুক্তি লঙ্ঘন করলো। যুদ্ধের সবগুলো পক্ষেরই ভারতের ব্যাপারে এই পর্যায়ের আস্থা ছিল। নেহরুর ভারত তার সময়ে পুরো বিশ্বে যে মর্যাদায় অধীষ্ঠিত ছিল, মোদির ভারতও যদি সেই মর্যাদা পেতো, তাহলে সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপের কাপেলা হোটেলে ট্রাম্প আর কিমের যে বৈঠক হলো, সেটা হয়তো লাক্ষাদ্বীপের বাঙ্গারাম দ্বীপে অনুষ্ঠিত হতো।

সেটা যাই হোক না কেন, পুরো বিশ্বের মনোযোগ এখন দুই দেশের নেতার বৈঠকের দিকে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেওয়ের ভাষায়, “এই দুই দেশের মানুষই কেবল এই পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর এই দুই দেশের মানুষই এক কক্ষে বসতে যাচ্ছেন”।

পম্পেও অবশ্য এটা উল্লেখ করেননি যে মাত্র এক বছর আগেই এই দুই ব্যক্তির একজন ট্রাম্প অপরজন কিমকে ‘বেঁটে আর মোটা’, ‘লিটল রকেট ম্যান’ অন ‘সুইসাইড মিশন’ এবং ‘পরিস্কার পাগল মানুষ’ হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন তার দেশকে ‘আগুন আর ক্রোধ’ দিয়ে ভস্মীভূত করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিম তার জবাবও দিয়েছিলেন। ট্রাম্পকে তিনি ‘ভীত কুকুর’ এবং ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন। আরও কথা বলেছেন কিম। ট্রাম্প তার ‘ইগো-চালিত চিন্তাভাবনা’ নিয়ে ঘন ঘন টুইট করেন, আজেবাজে কথা বলেন এবং সে কারণেই এই পাগলা লোকের উপর ভরসা করতে পারি না আমরা।

এরপরও এখানে সেন্তোসাতে একসাথে বসেছেন তারা। নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের জন্য কি? কে বলবে? ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বরে কিমের সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্প। কিম সফলভাবে হোয়াসং-১৫ আন্ত-মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলের সফল পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এই মিসাইলগুলোতে পারমানবিক ওয়্যারহেড বসানো যায় এবং এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলো ছাড়াও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আঘাত হানতে সক্ষম। এর পরপরই নতুন বছরে কিমের দেয়া বক্তৃতা প্রকাশিত হয়। এই বক্তৃতায় তিনি দাবি করেন জাতীয় পারমানবিক বাহিনীকে সমুন্নত করেছেন তিনি। একই সাথে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তার জাতি ও সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যদি সব ধরণের হুমকি প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে পারমানবিকীকরণ থেকে সরে আসবেন তিনি। তার এই কথাকে কাজে লাগিয়েছেন।

এটাকে ট্রাম্পের কৃতিত্ব হিসেবেও দেখা যায়। কখন থামতে হবে, সেটা বুঝেছেন তিনি। ট্রাম্প ‘চোখ খোলা রেখে’ কিমের সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। ৩০ এপ্রিল পলিটিকো ম্যাগাজিনে নিষ্ঠুর কিন্তু প্রায় নিখুঁত এই পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ ভ্যান জ্যাকসন। ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে আবিগাইল ট্রেসি মন্তব্য করেছেন পরপর তিনটি মার্কিন প্রশাসন তিনটি কিম প্রজন্মকে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মাসখানিক পরে এক টুইটে ট্রাম্প বলেন, উত্তর কোরিয়ার সাথে চুক্তির কাজ চলছে। পররাষ্ট্র দফতর এবং এর ‘বিশেষজ্ঞদের’ হিসেবী কূটনীতির তোয়াক্কা না করে কোন উপদেষ্টা ছাড়াই মোটামুটি একাই সম্মেলনে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ট্রাকভর্তি যে সব ব্রিফিং পেপার দেয়া হয়েছে তাকে, সেদিকেও নজর দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। তার প্রত্যাশা ছিল, “আমি নিজের মতো করে দ্রুত বুঝে যাবো এখানে ইতিবাচক কিছু আশা করা যায় কি না। আমার যদি মনে হয় ইতিবাচক কিছু হবে না, তাহলে সময় নষ্ট করবো না। তার সময়ও নষ্ট করতে চাই না আমি”।

যখন এই লেখাটা লিখছি, তখন দেশে ফেরার জন্য এয়ার ফোর্স ওয়ানের দিকে রওনা দিয়েছেন ট্রাম্প। কি পাওয়া গেলো এই বিরাট ঘটনা থেকে? কূটনীতির পটকা এখানে পুরোই ড্যাম্প হয়ে গেছে। ট্রাম্প ঠিক মোদির স্টাইলে একটা খেলা দেখালেন।

আয়ার ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং সামাজিক ভাষ্যকার

print
SOURCEদ্য উইক
শেয়ার করুন