আফগানিস্তানে কেন পক্ষ বদল করছে যুক্তরাষ্ট্র?

আফগানিস্তানে কেন পক্ষ বদল করছে যুক্তরাষ্ট্র?

সালমান রাফি শেখ,
শেয়ার করুন

সাম্প্রতিক নানা পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আফগান যুদ্ধটি মনে হচ্ছে তালেবানের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ থেকে তালেবানের সাথে ‘সহযোগিতার যুদ্ধে’ পরিণত হয়ে গেছে। কাতারে মার্কিন কর্তকর্তা ও তালেবানের সাথে মুখোমুখি বৈঠক এবং তালেবানের মার্কিন বাহিনী বা আফগান বাহিনীর চেয়ে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও সফল হামলা প্রবলভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে কেন বাতাস বইছে বা কোন দিকে প্রবাহিত হওয়ার জন্য বাতাস সৃষ্টি করা হয়েছে।

কাতারে মার্কিন কর্মকর্তা ও তালেবানের মধ্যকার সাম্প্রতিক বৈঠকের ফলাফল ‘খুবই ইতিবাচক’ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গত ঈদে যে যুদ্ধবিরতি ছিল, তার সুফল পাওয়া গেছে। এছাড়া আসন্ন ঈদেও আরেকটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে।

পশ্চিমা মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, আফগানিস্তানে আইএসআইএস’র বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তালেবান। তালেবান পক্ষ অবশ্য জানায়নি, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের কোনো অনুরোধ করেছে কি করেনি। তবে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে তাদের ব্যবস্থা প্রমাণ করছে, কাতার বৈঠকে হয়তো কোনো ধরনের সমঝোতা, অঘোষিত যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে তারা তাদের ওপর এবং সেইসাথে সাধারণ আফগানদের ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসী গ্রুপটির দিকে নজর নিবদ্ধ করেছে।

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, উত্তর আফগানিস্তানের জাওজজান প্রদেশে গত সপ্তাহে তালেবান হামলার পর আফগানিস্তানের আইএসআইএস’র প্রায় ১৫০ সদস্য আফগান বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

এ থেকে দুটি বিষয় জানা যায়: প্রথমত, আইএসআইএস’র ওপর এটি বৃহত্তম তালেবান হামলা, সম্ভবত মার্কিন ও তালেবান আলোচনার পর এ ধরনের প্রথম হামলা। দ্বিতীয়ত, আইএসআইএস যোদ্ধারা তালেবানের কাছে নয়, বরং আফগান বাহিনীর (যারা মার্কিন বাহিনীর পরামর্শে ও নেতৃত্বে পরিচালিত হয়) কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। যৌক্তিকভাবেই বলা যায়, হামলাকারী বাহিনী ও যারা আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে আগাম সমন্বয় না থাকলে এ ধরনের আত্মসমর্পণ হতে পারে না। আর যারা আত্মসমর্পণ করেনি, তাদেরকে আফগান তালেবান আটক করে যাচ্ছে বলে সিনিয়র তালেবান নেতা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন।

এই ঘটনা কাতারে মুখোমুখি আলোচনায় উল্লেখিত ‘খুবই ইতিবাচক’ ফলাফলের ব্যপ্তি সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আবারো নিশ্চিত করেছে, তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য আফগানিস্তানে থাকবে এবং আইএসআইএস’র বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার এটিকেই সর্বোচ্চ ভেন্যু হিসেবে আবিষ্কার করেছে।

কিন্তু এভাবে কেন এসব কিছু হচ্ছে?

এই পট পরিবর্তনের জবাব পেতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই আফগানিস্তান ও এর আশপাশের বৃহত্তর আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে নজর দিতেই হবে।

অন্যদিকে চীন, পাকিস্তান ও ইরানের সমর্থনপুষ্ট রাশিয়া তার নিজস্ব শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। তারা আফগানিস্তানে নিজেদের কিছু সুবিধা আদায়ে তৎপর। তবে আফগানিস্তানে রাশিয়ার উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

সিরিয়ায় আইএসআইএস ও অন্যান্য জিহাদিদের বিরুদ্ধে যে ভূমিকা পালন করেছিল রাশিয়া, এখন আফগানিস্তানেও যদি তারা সেই ভূমিকাই পালন করে, তাতে করে সিরিয়ার মতো আফগানিস্তানেও কোণঠাসা হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর ফলে গত ১৭ বছর ধরে তারা আফগানিস্তানে যে প্রভাবশালী ভূমিকায় ছিল, তা খুইয়ে ফেলবে।

তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আফগানিস্তানে রাশিয়াকে কোনো সুযোগ দিতে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে শান্তিপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দিতে চাইবে না যুক্তরাষ্ট্র। উদাহরণ তো হাতেই রয়েছে। সিরিয়ায় সরাসরি মার্কিন উপস্থিতি সত্ত্বেও আসতানা ও সোচিতে রুশ নেতৃত্বাধীন শান্তিপ্রক্রিয়া ও আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উপস্থিতি ছিল না।

ফলে তালেবানের সাথে সরাসরি আলোচনা যদি করতেই হয় এবং ‘সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো আলোচনা নয়’ অবস্থান থেকে সরে আসতে হলে ক্ষমতার ভারসাম্য নিজের অনুকূলে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এমনটি করা হলে তা কেবল আফগানিস্তানের শান্তিপ্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেয়ারই সুযোগ দেবে না, সেইসাথে তালেবানের সাথে সুসম্পর্ক রাখার সুবাদে যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থায় আফগানিস্তানে কোনো ধরনের উপস্থিতি বজায় রাখার সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

হ্যাঁ, আফগানিস্তানে বিদেশী উপস্থিতির বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত রেখেছে তালেবান। তবে তারা কয়েক মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলোচনারও বিরোধিতা করছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতি বদলে গেছে।

পরিস্থিতি আসলে ইতোমধ্যে বদলে গেছে। এতে করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তালেবানের সাথে আলোচনা না করার অবস্থান থেকে সরে এসে তাদের সাথে শান্তি আলোচনা করার সবুজ সঙ্কেত দিয়েছেন। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন করে লিখতে চাচ্ছেন।

পাশ্চাত্যের মূলধারার মিডিয়ার খবরে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে যে ট্রাম্পের অনিশ্চয়তামূলক নীতির ফলে মার্কিন সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিভাগ বেশ দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, প্রেসিডেন্ট হয়তো শিগগিরই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে আফগানিস্তান থেকে একতরফা সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে ফেলবেন।

তালেবানের সাথে আলোচনা তাই এই অবস্থা প্রতিরোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তারা সিরিয়ার ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চায় না। উল্লেখ্য, সিরিয়ায় এখন রাশিয়ার আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের মতো করে সবকিছু করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র চায় আফগানিস্তানে যেন রাশিয়ার উপস্থিতি ও প্রভাব না থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারণায় খুব বেশি আগ্রহ সম্ভবত তালেবানের নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র যাতে তাদের মূল দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সেজন্য তারা রাশিয়া ও চীনের সাথে তাদের সম্পর্ককে ব্যবহার করতে আগ্রহী।

ফলে তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ভালো বিষয় হলেও তাদের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে। কারণ তালেবান কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের সাথেও আলোচনা করতে আগ্রহী।

print
শেয়ার করুন