আং সান সু চি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী চরম অচলাবস্থায়

আং সান সু চি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী চরম অচলাবস্থায়

মাইকেল সেন্সবারি,
শেয়ার করুন
(বাঁ থেকে) মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি বর থিও, স্টেট কাউন্সিলর আং সান সু চি ও প্রেসিডন্ট উইন মাইন্ত, ছবি: এএফপি

মিয়ানমারের আন্তর্জাতিকভাবে কঠিন অবস্থায় থাকা বেসামরিক নেত্রী আং সান সু চি জাতীয় শান্তির সর্বশেষ প্রয়াস হিসেবে ১১ জুলাই থেকে ইয়াঙ্গুনে ২১তম শতক পানলং শান্তি সম্মেলনের পরবর্তী দফা আহ্বান করেছেন। কিন্তু মিয়ানমারের যৌথ নেতৃত্ব তথা বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

এক বছরের মধ্যে গত ৮ জুন সু চি ও তার উপদেষ্টারা সামরিক বাহিনীর নেতা জেনারেল মিন আং হ্লাইঙ ও অন্য শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন।

এর আগে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ বিশেষ দূত ক্রিস্টোফার স্করানার বারগেনার ৯ দিনের সফরকালে উভয় নেতার সাথে আলাদা আলাদাভাবে বৈঠক করেন। এই অঞ্চল সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা থাকা ক্রিস্টোফার ১২ জুন মিয়ানমার অবতরণ করেন।

মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক বাহিনীর জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের পর তাতে আরো অবনতি ঘটে।

মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে একটি ফেডারেল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই পানলং শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। আং সান সু চির বাবা আং সান পানলং নামের ওই শান্তি সম্মেলনের সূচনা করেছিলেন। তবে তিনি তার ওই কাজটি সমাপ্ত করতে পারেননি। তিনি ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার মাত্র ছয় মাস পরই নিহত হয়েছিলেন।

মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর কাছে জাতীয় নিরাপত্তাসহ বেশ কিছু বিষয় ন্যস্ত রয়েছে। ওই সংবিধানে বিদেশী নাগরিককে বিয়ে করা কেউ কোনো নির্বাহী পদ গ্রহণ করতে পারবে না বলেও বিধিনিষেধ রয়েছে। সু চির স্বামী ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। তার দুই ছেলেও ব্রিটিশ নাগরিক।

তাছাড়া সংবিধানে পার্লামেন্টের ২৫ ভাগ আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে সামরিক বাহিনীর জন্য। এর ফলে নির্বাচিত সরকারের পক্ষে উদ্যোগ নেয়া হলেও অনেক কাজ করা সম্ভব হয় না। সংবিধান অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর হাতে ন্যস্ত। এর জের ধরেই তারা রাখাইন রাজ্যে এভাবে অভিযান চালাতে পেরেছে।

গত তিন থেকে চার মাস ধরে সেনাবাহিনী প্রধান রাখাইন রাজ্যে এক ধরনের জরুরি অবস্থা জারি করে রেখেছে বলে মিয়ানমারের বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে সম্প্রতি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, সেনাপ্রধান অভ্যুত্থানের হুমকি দিয়েছেন। তবে নতুন প্রেসিডেন্ট মিন উইন্ত বিবৃতি ইস্যু করে তা অস্বীকার করেছেন।

সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে অচলাবস্থা থাকায় ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সু চি মিয়ানমারের সর্বোচ্চ দায়িত্বে না থাকলেও কার্যত তিনিই দেশটি পরিচালনা করছেন।

কয়েক মাস আগে প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তন এসেছে। নতুন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন মিন উইন্ত। তিনি এখন দেশটির তৃতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন। এর আগে তিনি পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ায় স্পিকারের পদটি শূন্য হয়ে যায়। সেখানে নির্বাচিত হয়েছেন খ্রিস্টানপ্রধান কচিন রাজ্যের টি কুন মিয়াত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ক্যাথলিক মিশনারির ব্যাপক কার্যক্রমের ফলে ওই রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল।

সরকারের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদেও পরিবর্তন এসেছে। এসবের মধ্যে হলো নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়োগ। সো উইনকে ওই পদে নিয়োগ করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে মান্দালয়ের আঞ্চলিক মুখ্যমন্ত্রী এনএলডির দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আবির্ভূত হয়েছেন। তাকে এগিয়ে আনা হয়েছে দলের অবস্থান মজবুত করার লক্ষ্যে। তিনি সংবিধান সংস্কারের প্রতি সোচ্চার। তিনি মনে করেন, মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠা ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়টি সরাসরি বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার ওপরও জোর দিয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশটির পুলিশ বাহিনী। তারা শান্তিপূর্ণ ভিন্ন মতালম্বীদের ওপর ব্যাপক দমননিপীড়ন পরিচালনা করে বলে মনে করা হয়ে থাকে।

এদিকে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। অনেকে বলছেন, জেনারেল মিন ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

সামরিক বাহিনী জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিয়ন্ত্রিত সাতটি রাজ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে শান, রাখাইন ও কচিন। কারেন রাজ্যেও সামরিক বাহিনী জটিলতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনে জয়লাভের জন্য এসব রাজ্য থেকে ভোট পাওয়া খুবই জরুরি এনএলডিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। সেনাবাহিনীর হাতে ২৫ ভাগ আসন সংরক্ষিত থাকায় ক্ষমতায় থাকতে হলে সু চির দলকে অবশ্যই ৬৬ ভাগ ভোট পেতে হবে। আর তা কেবল মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ভোট দিয়ে সম্ভব হবে না। সংখ্যালঘুদের ভোটও দলটিকে পেতে হবে। আর মিন যদি প্রেসিডেন্ট পদটি পেতে চান, তবে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে এনএলডি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়।

print