সেশেলসে ভুল সিদ্ধান্ত: চীনের কাছ থেকে শিখতে হবে ভারতকে

সেশেলসে ভুল সিদ্ধান্ত: চীনের কাছ থেকে শিখতে হবে ভারতকে

প্রকাশ কাটোচ,
শেয়ার করুন
সেশেলসের প্রেসিডেন্ট ড্যানি ফাউর ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (ডানে)

২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেশেলস সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি হয়, চলতি বছরের মার্চে সেটি ফাঁস হয়ে যায়। ফাঁস হওয়া ডকুমেন্টে বিস্তারিত রয়েছে ভারত কিভাবে অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ডে সামরিক অবকাঠামো তৈরি করছিল।

২৭ জানুয়ারি ভারত ও সেশেলসের মধ্যে যে সংশোধিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটিও ছিল ফাঁস হওয়া দলিলে। এছাড়া ছিল টেক্সট, মানচিত্র, বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট, প্রস্তাবিত এয়ারস্ট্রিপের অবস্থান ও আকার সম্পর্কিত তথ্য, বিভিন্ন স্থাপনা এবং ভিডিও।

ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ সেশেলসের বিরোধী জোট চুক্তিটিকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছে। এই জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ওয়াভেল জন চার্লস রামকালাওয়ান। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতার আগ্রহ রয়েছে তার। সেশেলস সরকার বিষয়টি নিয়ে তদন্তেরও ঘোষণা দিয়েছেন।

চুক্তি

২০১৫ সালে সেশেলস ও মরিশাস সফরের সময় মোদি অ্যসাম্পশান আইল্যান্ড এবং মরিশাসের আগালেগা যৌথভাবে উন্নয়নের ব্যাপারে চুক্তি করেন। চুক্তির পর মোদি বলেছিলেন, “অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ডে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আমাদের আজকের চুক্তি আমাদের অংশীদারিত্বের সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে”। কিন্তু মিডিয়া রিপোর্টে এই দুটো প্রকল্পকে দেশের বাইরে ভারতের প্রথম সামরিক ঘাঁটি প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা দেয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো এই রিপোর্টগুলোর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পক্ষ থেকে কিছুই বলা হয়নি।

অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ড নিয়ে যখন চুক্তি হয়, তখন সেশেলসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেমস মাইকেল। ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর তার উত্তরাধীকারী হন ড্যানি ফরে। এই অন্তর্বর্তীকালীন ১৯ মাসে মাইকেল চুক্তির বিস্তারিত বিরোধীদের জানাননি। ভারত নিজেও চুক্তিটি সংশোধনের জন্য সেশেলসের পার্লামেন্টকে কোন চাপ দেয়নি। যদি সরকারের পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত ছিল তারা। এছাড়া সেশেলসের বিরোধী জোটকে নতুন সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে খুব সামান্যই প্রচেষ্টা ছিল ভারতের।

জানুয়ারিতে ভারত সফরের সময় রামকালাওয়ান বলেন, চুক্তিটি অনুমোদনের পথে যে সাংবিধানিক বাধা রয়েছে, সেশেলসের সরকার সেটি দেখতে পায়নি। তিনি আরও বলেন অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ড ভারতের সামরিক ঘাঁটি ছিল না। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে সেশেলসের পার্লামেন্ট হয়তো সংশোধিত চুক্তি অনুমোদন দিতে পারে। কিন্তু তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে সেটাও আর হয়নি।

চীনের রাজনৈতিক যুদ্ধ

২০১৫ সালের চুক্তির অধীনে অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ডে অবকাঠামোর ডিজাইন তৈরি, নির্মাণ এবং স্থাপনার উন্নয়নের দায়িত্ব ছিল ভারতের। একইসাথে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের দায়িত্বও ছিল তাদের। ২০১৮ সালের সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা, মেরিন, অ্যাভিয়েশান, যোগাযোগ ও নজরদারি অবকাঠামোর কাজ, সেশেলসের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং তাদের পুরো প্রকল্পের অর্থায়নের দায়িত্বও ভারতের উপর এসেছে। আর এই স্থাপনাগুলো যৌথভাবে ব্যবস্থাপনা করবে সেশেলস ও ভারত।

প্রেসিডেন্ট ফরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জুনে তার ভারত সফরে যাওয়ার আগেই সেশেলস আইল্যান্ড নিজ খরচেই সামরিক ফ্যাসিলিটি নির্মাণ করা হবে। ভারতের সাথে যৌথ প্রকল্পটির কাজ আর এগোবে না। কিন্তু ফরের সফরের পর ভারত বিষয়টি আবার উত্থাপন করে। এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেছেন, “দুই পক্ষই একে অন্যের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ড প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছে”। অন্যদিকে ফরে বলেছেন, “অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ড প্রকল্প নিয়ে কথা হয়েছে। আমরা সমানভাবে এখানে যুক্ত আছি এবং উভয়ের স্বার্থের দিকগুলো বিবেচনা করে একসাথে কাজ করে যাবো আমরা”।

কিন্তু ফরের সফরের সময় যে সব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার কোথাও অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ডের উল্লেখ নেই। চুক্তির ব্যাপারে বিরোধীদের সাম্প্রতিক অবস্থানএবং ২০২০ সালের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা বিবেচনা করলে এখন এটা দেখার বিষয় ফরে পার্লামেন্ট আদৌ চুক্তিটি অনুমোদন করতে পারবেন কি না।

২০১৫ সালের চুক্তিটি ছিল গোপনীয়। পর্যবেক্ষকরা বিস্মিত হয়েছেন কেন ভারত এর কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে গেলো। সেশেলসকে তাদের বিষয়টি দেখতে দেয়া উচিত ছিল। চীন কখনও গোয়াদর বন্দর গ্রহণের কথা ঘোষণা দেয়নি। চীনা কোম্পানি এর উন্নয়নের কাজ করছে – বিদেশী মিডিয়ায় শুধু এটুকু খবরই প্রকাশিত হয়েছিল। হামবানতোতাও চীন গিলেছে খুব ধীরে ধীরে। চীন এমনকি পাকিস্তানের জিওয়ানি এবং মালদ্বীপের গাধুতে ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টিও বরাবর নাকচ করে আসছে। চীন যেখানে ভূ রাজনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে গেছে, ভারত সেখানে সেশেলসের বিরোধী দলকে পর্যন্ত রাজি করাতে পারেনি, যদিও তাদের নেতা ভারতীয় বংশোদ্ভূত।

রাজনৈতিক যুদ্ধে চীন যদিও অনেক এগিয়ে আছে, ভারত চেষ্টা করবে অ্যাসাম্পশান আইল্যান্ড নিয়ে তাদের ভুলগুলো শুধরে নিতে। যে ভুলের জন্য দায়ি মূলত তাদের পররাষ্ট্র নীতি, আত্মতুষ্টি এবং অতিরিক্ত কথন। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি কোনদিকে যাচ্ছে, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ববাসীর।

print