আসামে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং...

আসামে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন

আসামে নাগরিক সমাজের একটি অনুসন্ধানী টিম চলমান ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্সের (এনআরসি) প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছে। তারা বলেছেন, নাগরিক সমাজসহ সর্বসাধারণের মধ্যে ব্যাপক ভাবে এ ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে ২০১৬ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, সমস্যা এবং পক্ষপাতিত্ব বেড়ে গেছে।

১৩ জুলাই ওই টিম নয়াদিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠ মনে হয়েছে। সিভিল সোসাইটির সদস্যসহ সবার মধ্যেই এ ধারণা ছিল। নীতি ও দিকনির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছিল। ২০১৬ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও সমস্যা বেড়েছে এবং কাজের ব্যাপারে অনেক অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে”।

পুরো প্রক্রিয়াকে ‘অতিকায়, জটিল, স্পর্শকাতর ও কঠিন’ আখ্যা দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “অনানুষ্ঠানিক ও অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে ৩০ জুলাই এনআরসি’র যে চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, সেখান থেকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষকে বাদ দেয়া হয়েছে”।

চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত এই এনআরসি আপডেট প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে।

১২ সদস্যের টিম

১২ সদস্যের এই নাগরিক সমাজের টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উত্তর প্রদেশ পুলিশের সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল এস আর দারাপুরি। ইউনাইটেড এগেইন্সট হেইট ব্যানারের অধীনে গঠিত এই টিম রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সফর করেছে এবং এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারা রিপোর্টে বলেছেন, “বাংলাভাষী মুসলিম ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে ভাষা ও ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করা হয়েছে” এবং সময়মতো যদি এটা বন্ধ করা না যায়, তাহলে যে কোন মুহূর্তে ক্ষোভের ‘বিস্ফোরণ ঘটতে পারে’।

মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে কথা বলে তারা জানতে পেরেছেন যে, “ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সামনে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য জনগণকে যথাযথ সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এদের অনেকের ঘরবাড়ি ব্রহ্মপুত্রের ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা অন্য জায়গায় ঘর বাঁধতে বাধ্য হয়েছেন এবং এ ধরনের ব্যক্তিদের সেভাবে কোন নোটিশও দেয়া হয়নি”।

বন্দীশালা

এই রাজ্যের বন্দীশালাগুলো গড়ে তোলা হয় আগের কংগ্রেস সরকারের আমলে। কাস্টডিতে প্রায় এক হাজার বন্দী রয়েছে এখন। সরকারের মনোভাব হলো সীমান্ত পুলিশ যাদেরকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তারা সাধারণত পালিয়ে লুকিয়ে থাকে। সে কারণে তাদেরকে আটকে রাখতে হবে যতদিন না আদালত তাদেরকে নির্দোষ ঘোষণা দিচ্ছে।

গত সপ্তাহে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্ত পুলিশকে জানানো হয়েছে, সন্দেহভাজন হিসেবে কাউকে আদালতে পাঠানোর আগে তার বিরুদ্ধে যেন আরও ভালভাবে তদন্ত করা হয়।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের রিপোর্টে বিশেষভাবে হাইকোর্টের এক সদস্যবিশিষ্ট ডিভিশনাল বেঞ্চের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্টের ভূমিকায় দারাপুরি লিখেছেন, “তার কোর্টে বিদেশী জাতীয়তা সংক্রান্ত যত মামলা গেছে, সবগুলোই গেছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হয়ে এবং ডিভিশন বেঞ্চের রোস্টারে কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। সঙ্কট যখন ক্রমেই বাড়ছে, এ সময় এ ধরনের অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তির জন্য আদালতের দায়দায়িত্ব রয়েছে”।

তবে গোয়াহাটি থেকে পাওয়া সবশেষ খবরে জানা গেছে ডিভিশন বেঞ্চ থেকে ৩ জুলাই বিচারপতি ভুঁইয়াকে সরিয়ে সেখানে বিচারপতি অরূপ কুমার গোস্বামীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

‘ফেরত পাঠানো কার্যত অসম্ভব’

যদিও এনআরসি নীতিমালায় বলা হয়েছে, খসড়া তালিকায় যাদের নাম থাকবে না, তারা আপিলের জন্য এক মাস সময় পাবেন। তবে রিপোর্টে এ বিষয়টির উল্লেখ নেই। তবে এতে বলা হয়েছে, ৩০ জুলাইয়ের পর লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজ্যহীন হয়ে পড়বে। রাজ্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি উল্লেখ করে দারাপুরি বলেন, এখানে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েনের সিদ্ধান্তই তার প্রমাণ। কারণ এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফেরত পাঠানো কার্যত অসম্ভব এবং যদি সেটা চেষ্টা করা হয়, এতে নৈরাজ্যের চেয়েও সঙ্কট তৈরি হবে বেশি।

সুপ্রিম কোর্ট যদিও ২০১৪ সালে ভারত সরকারকে বলেছিল যাতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কথা বলা হয়। কিন্তু এখনও ভারত সেটা করেনি। ১৩ জুলাই তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে গেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে তার। তবে আসামে তালিকা থেকে বাদ পড়াদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আলোচনার বিষয়টি তার হিসেবে নেই বলে জানা গেছে।

print