অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও এশিয়ান কোয়াড

অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও এশিয়ান কোয়াড

সুমান্ত্রা মৈত্র,
শেয়ার করুন

ভারত যখন কোনো জোট গঠনের কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করছে না বা কোনো জোটের অংশ হতে যাচ্ছে না, তখন কেন আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অনেক বেশি সংযত রয়েছে দেশটি? এই প্রশ্নটি ইউরোপ ও আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের ধাঁধায় ফেলছে।

সর্বোপরি, ধরা হয়েছিল যে ইন্দো-প্যাসিফিকের গণতান্ত্রিক কোয়াডের স্তম্ভ হবে ভারত। কোয়াড নিজেই উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কেবল গণতন্ত্র ও অবাধ বাণিজ্যের বিকাশই ঘটাবে না, বরং সেইসাথে এশিয়া প্যাসিফিকে যেকোনো ধরনের উদীয়মান শক্তির বিরুদ্ধেও ভারসাম্য বিধান করবে। অর্থাৎ মৌলিক লক্ষ্য ছিল বাস্তব রাজনীতি।

সম্প্রতি কোয়াড দুবার বৈঠক করেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান আলাদা আলাদাভাবে এই অঞ্চলে ত্রিদেশীয় অংশীদারিত্ব গ্রহণ করছে। এছাড়া অবকাঠামো, উন্নয়ন ও কানেকটিভিটি সমস্যাগুলো সমাধানে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করছে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের ব্রিফিং অনুযায়ী, অংশীদারিত্বের লক্ষ্য একটি। তা হলো এই অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের ব্রিফিংয়ে বলা হয়, স্থানীয় কর্মশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করা ও সহযোগিতার কাঠামো নির্মাণ করা। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুযোগ সৃষ্টি, উন্মুক্ত, অবাধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক সৃষ্টিকারী প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের জন্য ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব গঠন করেছে। এখানে তিনটি শব্দের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে: অবাধ, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তমূলক।

এই কর্মসূচির ভিত্তিতে মাইক পম্পেইও এশিয়ায় নতুন ৩০০ মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা তহবিল প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ইন্দো-প্যাসিফিকের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এগিয়ে নেয়ার আমাদের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহের সাথে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে নতুন তহবিল হিসেবে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ঘোষণা দিচ্ছে।

নতুন নিরাপত্তা সহায়তার লক্ষ্য হলো সীমান্তের বাইরের হুমকি দমন এবং সেইসাথে অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক জোরদার করতে এই অঞ্চলের প্রতি মার্কিন অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। এখানেও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কথা বলা হয়েছে। ইঙ্গিত পরিস্কার। যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার সামরিকায়নের বিরোধী এবং তা ঘটতে দেয়া বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

অবশ্য এক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। প্রথমত, বিনিয়োগের মাত্রা ব্যাপকভাবে চীনের দিকে ঝুঁকে আছে। এশিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগ ও এশিয়া চীনা বিনিয়োগের মধ্যে তুলনায় হতে পারে না। তাছাড়া আইআর তত্ত্বে বলা হয়, ছোট ছোট দেশ বিনিয়োগ ও সুরক্ষার জন্য বড় দেশের চেয়ে স্থানীয় শক্তির ওপর ভরসা পায় বেশি। এটি যদি সত্য হয়, তবে এশিয়ান ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ চীনের দিকে ঝুঁকবে, চীনা বিনিয়োগ, এমনকি চীনা সামরিক সহযোগিতাও কামনা করবে।

এখানেই ভারত প্রসঙ্গ চলে আসে। আগেরই লেখা হয়েছে, ভারতের কৌশলগত সার্কেল নিরাপত্তাগত দোটানায় রয়েছে। ভারত একমাত্র দেশ যার সাথে চীনের সত্যিকারের সীমান্ত রয়েছে। চীন ও ভারত উভয়েই পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ। এর মানে হলো, নিরাপত্তার জন্য ভারতকে অন্য কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। সাগরেও ভারতের শক্তি আছে। সে তার নিজ এলাকায় ভরসা করে থাকতে পারে। আবার চীনও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাকি এলাকায় নিজেদের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ভারত কেন অন্য কোনো জোটে যোগ দিতে চায় না বা কোনো শক্তির সাথে গাটছড়া বাঁধতে চায় না, তার কারণ বোঝা যায়।

দ্বিতীয়ত, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস বলে যে ভারত জোট নিরপেক্ষই থাকতে পছন্দ করে। একে তার সাংস্কৃতিক ডিএনএ হিসেবে অভিহিত করা যায়।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, ভারতের কৌশলগত সম্প্রদায় তার কৌশলগত স্বায়াত্তশাসন বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী। ভারত কোনো পরাশক্তিকে বিশ্বাস করে না। সে কোনো পক্ষেই যোগদানে অনাগ্রহী। কেউ যদি যুক্তি দেয় যে ভারত তাত্ত্বিকভাবে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পক্ষে, তবে বলা উচিত ভারতের গণতন্ত্র হলো রক্ষণশীল, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী, জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্র। এটি উদার গণতন্ত্র নয়। ভারতের গণতান্ত্রিক চরিত্র অস্ট্রেলিয়া বা জাপানের নয় বরং ইসরাইল, হাঙ্গেরির সাথে মিল রয়েছে। এটিই ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে সংকীর্ণ করে ফেলে।

অস্ট্রেলিয়া কিন্তু ভারত নয়। অস্ট্রেলিয়ার গণতান্ত্রিক নীতি ভারতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়াকে চীনা বিনিয়োগ ও আমেরিকান নিরাপত্তার মধ্যে কোনো একটিকে গ্রহণ করে নিতে হবে। ভারতের কিন্তু তেমন অবস্থা নেই। কারণ ভারত কৌশলগত ও সামরিকভাবে অনেক স্বাধীন। ফলে ভারতের কোনো পক্ষে যোগদানের সম্ভাবনা নেই।

print