বাংলাদেশের জন্য ছাত্র আন্দোলনের অর্থ কী

বাংলাদেশের জন্য ছাত্র আন্দোলনের অর্থ কী

নেহা সিমলাই,
শেয়ার করুন

গত সপ্তাহে উইলেম ভ্যান শেনডেলের লেখা ‘অ্যা হিসটোরি অব বাংলাদেশ’ বইটা কিনলাম। ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় অবৈধ যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরুর দুই সপ্তাহের মাথায় বইটা হাতে এলো। একদিকে আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কেন আপাত অরাজনৈতিক শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করে এমন ক্ষুব্ধ পর্যায়ে চলে গেলো। আবার অন্যদিকে, অবাকও হচ্ছিলাম, কেন এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে খবরে তেমন আসছে না। এখনও আমি বোঝার চেষ্টা করছি কেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ব্যাপারে এখনও উদাসীন, তবে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি, সেটা হলো এই ব্যাপারটি বাংলাদেশের সব মানুষের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সব বাড়িতেই শিশু-কিশোর রয়েছে, নিরাপদ সড়কের দাবির সাথে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়।

শুরুতে বিষয়টিকে সোজাসাপটাই মনে হয়েছিল: ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই শহীদ রমিজুদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুজন স্কুল শিক্ষার্থী বাসের চাপায় নিহত হয়। আহত হয় আরও ১২ জন। দ্রুতগতির একটি বাস ফুটপাতে উঠে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। হাজার হাজার স্কুলের শিক্ষার্থী প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। এই শিক্ষার্থীদের বয়স ১৩ থেকে ১৯। অধিকাংশই স্কুলের পোশাক পড়া। ন্যায় বিচার দাবি করছে তারা। নিরাপদ সড়ক এবং ঢাকার রাস্তা থেকে অবিলম্বে অননুমোদিত যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে তারা।

ন্যাশনাল কমিটি টু প্রটেক্ট শিপিং, রোডস অ্যান্ড রেলওয়েজ (এনসিপিএসআরআর) একটি বেসরকারী সংগঠন। তাদের হিসেবে ২০১৭ সালে ৪২৮৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তবে বাংলাদেশ প্যাসেঞ্জার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশান (বিপিডাব্লিউএ) তাদের বার্ষিক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭৩৯৭ জন। সংখ্যার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকলেও দু্ই রিপোর্টেই ব্যাপক হতাহতের বিষয়টি উঠে এসেছে। এবং বেশ কয়েক মাস ধরে জনগণের ক্ষোভ বৃদ্ধির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

একটা নির্দলীয়, সরল ও স্পষ্ট দাবি নিয়ে এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। যেটা কোনভাবেই অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। তাই এটা বোঝার কোন উপায় নেই যে, কেন পুরো ঢাকা গত সপ্তাহে থমকে গিয়েছিল অথবা কিভাবে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এড়িয়ে গেছে। একজন বহিরাগত, যে এটাকেও তার বাড়ি মনে করে, সেই আমি অবাক না হয়ে পারিনি যখন দেখেছি সহিংসতা এবং সঙ্ঘাতের মধ্যে নাগরিকদের একটা অংশও জড়িত। বাংলাদেশের নির্বাচনী বছরে এই ঘটনা ঘটলো। অনেক রাজনৈতিক পক্ষ এই বিক্ষোভকে তাদের পক্ষে ভোট টানার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে বলেও মনে হচ্ছে।

আমার কাজের জন্য আমাকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়,  বিশেষ করে যে সম্পদগুলো ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং শ্রীলংকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে থাকে। আমি যে বিষয়ে কাজ করি, সেটা বিজ্ঞান-ভিত্তিক এবং রাজনীতি ও ধর্ম থেকে অনেক দূরে। তাই আমি ইতিহাসের ভিত্তিতে এক ধরনের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। শেনডেলের বইটি আমাকে আগেও সাহায্য করেছে। প্রথমদিকে যখন ঢাকা যেতে হয়েছে, তখন বইয়ের বিস্তারিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আমাকে সাহায্য করেছে। এটা একটা পর্যায় পর্যন্ত আমাকে বাংলাদেশকে বুঝতে সাহায্য করেছে, যেটা আমি অন্য কোনভাবে বুঝিনি। এই নবীন দেশটি তারুণ্যের শক্তিতে উদ্দীপ্ত। আর এই দেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে বার বার তরুণদের দ্বারা রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। যদিও এবারের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নিহত ও আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে, কিন্তু সেটা এক দৃষ্টিতে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটা ধারাবাহিকতা মাত্র।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার যখন ঘোষণা দিয়েছিল যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী অধিকাংশ মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই সে সময় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। পুলিশ যখন সেই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দমনে নেমেছিল, তখন পুরো অঞ্চলই ফুঁসে উঠেছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে বিখ্যাত মিছিল হয়েছিল, সেটিও বের করেছিল ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ১৯৫৬ সালে ওই সঙ্ঘাতের অবসান ঘটে যখন সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেয়। প্রকৃতপক্ষে এই ভাষা আন্দোলনই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল পরে যেটা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম পতাকাটির ডিজাইনও তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ১০৮ নম্বর রুমে।

এই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটা নিয়ে গর্ব করেন যে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ারও অনেক আগে- ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রী হিসেবে। ২০০৮ সাল থেকে একটা স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে চলে আসছে এই দেশটি। এটা নিরাপদে বলা যায় যে, বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক বিবর্তন, সেটা তৃণমূল পর্যায়ের আদর্শের মধ্য দিয়ে এসেছে এবং সেখানে সবসময়ই চালিকা শক্তি ছিল তরুণ সমাজ।

বিক্ষোভ, যে সময় ধরে আন্দোলন চলেছে এবং শেষের দিকের সহিংসতা – সব কিছুকেই আমার কাছে একটা সরল দাবি নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার মতো মনে হয়েছে। আর তারপর, হঠাৎ করেই বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সবকিছু স্বাভাবিক। ঢাকার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলো। বিক্ষোভ কি এভাবে কাজ করে? আমি নিশ্চিত না, হঠাৎ করে এই স্বাভাবিক হওয়াটা ভালো কি না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, হয়তো স্পষ্ট কোন উত্তর নেই এবং এটা নিয়ে সমাধানের একক কোন পথও নেই।

আমি শুধু ভাবতে থাকলাম, শেনডেলের বর্ণনায় বাংলাদেশের বাকি ইতিহাসের মতো এই আন্দোলন বিক্ষোভও হয়তো ভবিষ্যতে কোনদিন বর্তমান প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ নতুন উত্থান হিসেবে বর্ণিত হবে।

print
SOURCEদ্য ওয়্যার
শেয়ার করুন