ভারতের রুপি সঙ্কট: বিপর্যয় এখনো কাটেনি

ভারতের রুপি সঙ্কট: বিপর্যয় এখনো কাটেনি

জিনাত সাবরিন,
শেয়ার করুন

ভারতীয় রুপি এখন এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা মুদ্রা। চলতি বছর মার্কিন ডলারের বিপরীতে তার মূল্য কমেছে ১২ ভাগের বেশি।

শক্তিশালী মার্কিন ডলার, তেলের মূল্য বৃদ্ধি, উদীয়মান বাজারের মুদ্রাকে বিনিয়োগকারীদের ছুঁড়ে ফেলা, রেকর্ড পরিমাণে ঘাটতির কারণে রুপির এই দশা হয়েছে।

গত বুধবার ডলারের বিপরীতে রুপির মান রেকর্ড পতন ঘটে ৭২.৯১-এ নেমে যায়। এতে করে পেট্রোলিয়াম পণ্য, ভোগ্য সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স, প্রকৌশল সরঞ্জামের দাম বেড়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানেই শেষ নয়, সামনে আরো খারাপ সময় আসছে।

ডাচ মাল্টিন্যাশনাল র‌্যাবোব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হুগো এরকেন বলেন, মধ্য মেয়াদে রুপির আরো খারাপ অবস্থা দেখবে ভারত। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। আমাদের মনে হচ্ছে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপি ৭৫-এ নেমে গিয়ে স্থিতিশীল হবে।

গত শুক্রবার রাতে রুপির পতন ঠেকাতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ঘোষণা করে। ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি শুক্রবার বলেন, সরকার ‘অপ্রয়োজনীয়’ আমদানি কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, রুপিভিত্তিক বৈদেশিক বন্ড বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক পর্যালোচনা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।

অবশ্য কেবল ভারত নয়, তুরস্ক ও আর্জেন্টিনাসহ আরো কয়েকটি দেশের মুদ্রার মানও মার্কিন ডলারের বিপরীতে কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হতেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। ভারত সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মোহন গুরুস্বামী বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতাও রুপির মানে অবনতির জন্য দায়ী।

তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, সঙ্কট চলছেই। বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণেও রুপির পতন ঘটছে। আর এর জন্য পুরোপুরি দায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ। এর ফলে চাপ ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতের নীতিনির্ধারকেরা রুপির বড় ধরনের পতনের জন্য বিদেশী ব্যবসায়ীদের দায়ী করে আসছেন। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের অর্থ কেন্দ্রগুলোকে মুদ্রাভিত্তিক চুক্তিতে ফটকাবাজারিদের একটি বড় প্রভাব রয়েছে রুপির মানে পতনে।

তেলের মূল্য বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। ভারত তার চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি তেল আমদানি করে থাকে। তেলের আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকলে রুপির ওপর চাপ আরো বৃদ্ধি পবে। এতে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়বে। ভারতের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত মাসে আমদানি ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আর রফতানি ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার।

গুরুস্বামী বলেন, এ ধরনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা চলতে থাকলে, ঘাটতি অব্যাহত থকলে রুপির পতন অব্যাহত থাকবে। রুপি দুর্বল হয়ে পড়লে ডলারের দাম বাড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে ডলার কেনার জন্য অনেক লোক রুপি বিক্রি করে দেবে। আর অর্থ আমেরিকায় চলে যাবে। ডলারের মান বেশি হওয়ায় লোকজন আমেরিকায় টাকা রাখতে চাইবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুপির রক্ষণাত্মক অবস্থানে যাওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিও অনেকাংশে দায়ী। পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করে দেয়।

তবে এতে কতটুকু লাভ হবে তা নিয়ে গুরুস্বামী সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে তারা ২০ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। আমরা আমাদের বৈদেশিক রিজার্ভ শূন্য করে ফেলতে পারি না।

হিসাব অনুযায়ী, ভারতের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ৪০০ বিলিয়ন ডলার। গত এপ্রিলে ছিল রেকর্ড ৪২৬ বিলিয়ন ডলার।

ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি স্বীকার করেছ, মুদ্রার মান পতন একটি উদ্বেগের বিষয়। তবে তারা দাবি করছে, দেশের অর্থনীতির ভিত শক্তিশালীই রয়ে গেছে। তাদের মতে, অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় রুপি অনেক ভালো করছে। আর তাদের হাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও যথেষ্ট আছে।

সরকার এখন কিছু কঠোর সংস্কার কর্মসূচি বাস্তাবায়ন করতে চাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ না থাকায় বর্তমানের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সঙ্কট খুব শিগগিরই কাটবে না।

গুরুস্বামী বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, যারা বিনিয়োগকারী, যারা অর্থ নিয়ে কাজ করে, যারা অর্থনীতি নির্মাণ করে, সরকারের ওপর তাদের আস্থা নেই।

বৈশ্বিক অর্থ প্রতিষ্ঠান নমুরা বলে, ভারতে আগামী মে মাসে নির্বাচন হবে। ওই সময় পর্যন্ত রুপি নিয়ে গোলযোগ থেকেই যাবে।

print
SOURCEআল জাজিরা
শেয়ার করুন