শ্রীলংকায় নর্দান প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রস্তাব ও উদার তামিলকে তিরস্কার

শ্রীলংকায় নর্দান প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রস্তাব ও উদার তামিলকে তিরস্কার

কলম্বো প্রতিনিধি,
শেয়ার করুন

‘তামিলভাষী জনগণের রাজনৈতিক পছন্দের অগ্রাধিকার’ নির্ধারণে গণভোট আয়োজনের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গত সপ্তাহের মাঝামাঝি শ্রীলংকার তামিল সংখ্যাগুরু নর্দান প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিল (এনপিসি) সর্ববম্মতভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। কথিত যুদ্ধাপরাধের জন্য শ্রীলংকাকে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) সামনে হাজির করানোরও দাবি জানানো হয় এতে।

একজন উদারপন্থী সিনিয়র তামিল রাজনীতিক নতুন সংবিধান প্রনয়ন নিয়ে আপোষমূলক বক্তব্য প্রদানের পর তার সহকর্মী কট্টর-জাতীয়তাবাদি তামিল রাজনৈতিকদের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনার শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই গুরুতর প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। এতে বুঝা যাচ্ছে, শ্রীলংকার যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার লক্ষ্যটি বর্ণবাদেও আক্রান্ত হবে। সুযোগসন্ধানী কিছু সিনহলা ও তামিল রাজনীতিক একে উষ্কে দিচ্ছে।

এনপিসি জোর দিয়ে বলছে যে শ্রীলংকাকে জবাবদিহি করার ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিব প্যানেলের ২০১১ সালের মার্চে দেয়া রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে হবে। এই রিপোর্টে ২০০৯ সালে এলটিটিই’র বিরুদ্ধে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধ সংঘঠনের প্রমাণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উগ্র তামিল রাজনীতিকরা উদার তামিল রাজনীতিক, তামিল ন্যাশনাল এলায়েন্স (টিএনএ)’র এমপি ও মুখপাত্র এম এ সুমান্থিরানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছেন কারণ তিনি প্রস্তাবিত নতুন সংবিধানের মাধ্যমে জাতিগত সমস্যা সমধানের পক্ষে।

৩০ আগস্ট গ্যালেতে সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার উপর একটি সেমিনারে – তামিলরা শুধু ফেডারালিজম চায় কিনা – এমন এক প্রশ্নে জবাবে তিনি প্রাথমিকভাবে নেতিবাচক উত্তর দিয়েছিলেন। তবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে, এলটিটিই’র আলাদা রাষ্ট্রের দাবি এখন পরিত্যাক্ত। এবং প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিল সিস্টেমের মাধ্যমে তামিলদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা ছেড়ে দিলেই তারা সন্তুষ্ট হবে।

তখন থেকেই সুমান্থিরানের তীব্র সমালোচলা করে চলেছেন চরমপন্থী তামিল জাতীয়তাবাদী, নর্দান প্রভিন্সের মুখ্যমন্ত্রী সিভি বিগ্নেসরন এবং ইলম পিপলস রেভুলিউশনারি লিবারেশন ফ্রন্টের (ইপিআরএলএফ) সুরেশ প্রিমাচন্দ্রন। সুমান্থিরানের বক্তব্যকে তামিলদের সঙ্গে বেঈমানির শামিল আখ্যা দিয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে টিএনএ’র ভাবমূর্তি নষ্ট করার কাজে একে ব্যবহার করছেন।

এদিকে, দেশটি যখন গৃহযুদ্ধ অবসানের পর নয় বছর পার করে জাতিগত বিভক্তি সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের পথে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলছে তখন এনপিসি’র প্রস্তাবটি ‘ঘায়ে নুনের ছিটা’ দেয়ার মতো। সিনহলি-প্রধান কেন্দ্রীয় সরকারের মতো এনপিসিও জাতিগত বিষয়গুলোর প্রতি উদাসীন। সামান্থিরান ও তার মতো অন্য যারাই বৃহত্তর সমঝোতা ও সহমর্মিতা চান তাদেরকে দু:খজনকভাবে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে।

বিগ্নেসরনের নেতৃত্বে এনপিসি’র নেতারা জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলোর প্রতি শ্রীলংকাকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, আইসিসি বা জাতিসংঘের অধীনে গঠিত অন্য যে কোন আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইবুনালে পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এই প্রস্তাব কার্যকর করা গেলে মাহিন্দা রাজাপাসকা ও তার ভাই সাবেক প্রতিরক্ষাসচিব গোতাবায়া রাজাপাকসাকে সিনহলা গ্যালারিতে প্রচারণা চালানো থেকে দূরে রাখা যাবে। মাহিন্দা যদিও পশ্চিমা ষড়যন্ত্র ও তামিল চরমপন্থার ভয় দেখানোর পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়ে যাবেন কিন্তু এনপিসি’র উদ্যোগের পর স্থিতিশীলতার অনুপস্থিতির কারণে সিনহলা ও তামিল উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল ও উদার কণ্ঠস্বরগুলোর দুর্ভাগ্য আর ঘুচবে না।

এনপিসি’র এক প্রস্তাবে জাতিসংঘ সদস্য দেশগুলোর প্রতি যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত শ্রীলংকার সামরিক ব্যক্তিদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য মৈত্রিপালা সিরিসেনা ও রনিল বিক্রমসিঙ্ঘের মতো রাজাপাকসা-বিরোধীদের একই অবস্থান নিতে উৎসাহিত করবে। অতীতেও এমনটি দেখা গেছে।

এনপিসি’র প্রস্তাবে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক নিস্পত্তির স্বার্থে তামিল সংখ্যাগুরু অঞ্চলে তামিল জনগণের রাজনৈতিক পছন্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। শিগগিরই একটি গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষকরা স্বীকার করলেও পরিতাপের বিষয় হলো শ্রীলংকা তার যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার জন্য পুরোপুরি পশ্চিমাদের উপর নির্ভর করছে এবং ৩০ বছরের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারালেও তা অভ্যন্তরিণ আত্মঅনুসন্ধানের পথটি সৃষ্টি করতে পারেনি। শ্রীলংকার বিরুদ্ধে সামরিক নিষেধাজ্ঞা জরিরও আহ্বান জানানো হয়েছে এনপিসি’র প্রস্তাবে।

শ্রীলংকার বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলমানদের ভোট নিয়ে ২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এই সরকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তির জন্য অতি-আলোচিত ‘নিজস্ব উদ্ভাবিত মেকানিজম’ তৈরিতে খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। অন্যদিকে তামিল জাতীয়তাবাদীদের সর্বশেষ উদ্যোগটিও সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখবে না।

সরকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া, সামরিক বাহিনীর দখল করা ভূমি বেসামরিক জনগণের হাতে ছেড়ে দেয়ার মতো অনেক কাজ করলেও তার মনোভাবটি রাজাপাকসার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। রাজাপাকসা কোন বাছবিচার ছাড়াই উন্নয়নকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আস্থা বিনির্মাণের মানবীয় দিক এবং জাতিগত স্পর্শকাতরতাকে বিবেচনায় নেননি। অথচ ক্ষমতা ভাগাভাগির মধ্যেই ছিলো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমাধান।

এই সরকারের নিস্প্রভ শাসনব্যববস্থা থাকার পরও যদি কঠোরভাবে তুলনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে এই সরকারের আমলে বেনামি গাড়ি এসে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়েছে, যা আগের সরকারের আমলে ছিলো নিত্যনৈমিত্যিক বিষয়। একই সঙ্গে, তামিল চরমপন্থী-কেন্দ্রিক কথাবার্তা সিনহলা জনগণকে রাজাপাকসা গোষ্ঠীর কোলের মধ্যে ঠেলে দিবে।

print
শেয়ার করুন