ভারতের সংকুচিত হচ্ছে গণতন্ত্রের স্থান

ভারতের সংকুচিত হচ্ছে গণতন্ত্রের স্থান

মালিনি পার্থসারথী,
শেয়ার করুন

জাতীয় নির্বাচনের এক বছরও বাকি নেই। এরই মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ২০১৯ সালের নির্বাচনটি বিজেপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে সাধারণ কোন নির্বাচন হতে যাচ্ছে না, কারণ আমাদের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রটির ভবিষ্যৎই যেখানে বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

মনে হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক জীবনে একটি সংকটময় (পিভোটাল) মুহূর্ত সমাগত। বিজেপি ও তার মিত্র দলগুলো এমন এক কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে যা ২০১৪ সালের চেয়ে অনেক উচ্চভিলাষী ও আক্রমণাত্মক। তারা ভারতীয় জাতির গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক ভিতটিই উল্টে দিতে চাচ্ছে।

একসঙ্গে গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য ভারতের শাসন ব্যবস্থা ও সংবিধান নিয়ে আমরা গর্ব করি। গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের এই শক্তিশালী বন্ধন সকল নাগরিককে এই জাতিরাষ্ট্রের সমান অংশীদারে পরিণত করেছে।

১৯৫০ সালে কার্যকর হওয়া এই সংবিধান ভারতের নাগরিকদের একসেট অলঙ্ঘনীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। যার মধ্যে আছে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান ও বাক স্বাধীনতা।

বিপন্ন উত্তরাধিকার

কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকার এখন বিপন্ন। শাসন ব্যবস্থার এই ঐতিহ্য থেকে সরে আসার ইংগিত দিয়েছে বিজেপি। ক্ষমতাসীন দল ও তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী সহযোগীরা ক্রমেই প্রকাশ্যে আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক নীতিগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। তারা স্বাধীনতা-পূর্ব হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতবাদ নতুন করে প্রচারের মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রীয় গঠনের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মোদি প্রশাসনের কর্মকাণ্ডও প্রমাণ করছে যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মূল এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে তাদের ঝোঁক বেশি। দলের নেতা, বিশেষ করে এর সভাপতি অমিত শাহের কণ্ঠ থেকে যে ধারালো নীতি বিবৃতিগুলো আসছে তাতে দলটির আরো রণপ্রিয় নীতি অবলম্বনের প্রস্তুতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি বিজেপি’র জাতীয় নির্বাহীদের এক সভায় তিনি বলেছেন, শুধু ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বিজেপির লক্ষ্য ‘আরো ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকা।’

নাগরিকত্ব আইন, জাতীয় নাগরিক তালিকার মতো বিতর্কিত ধারণা ও জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা প্রশ্নে বিজেপি’র সাম্প্রতিক জাতীয় আন্দোলনের উদ্দেশ্যটি নাগরিকত্ব ও ইউনিয়নের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে সম্পর্কের মতো মূল ইস্যুগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে সরকার তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতবাদের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটি আমাদের জনগণের মধ্যে জোরপূর্বক যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে তার লক্ষণগুলো হলো নগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক, জম্মু-কাশ্মিরের মর্যাদা এবং বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের এক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গলা ফাটিয়ে চিৎকার এবং তাদেরকে ‘শহুরে নকশাল’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতীয় গণতন্ত্রের জনপ্রিয় সংস্করণ এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মনোকালচার ও এক্সক্লুসিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি মৌলিক বিরোধ শুরু হতে যাচ্ছে – এ নিয়ে কংগ্রেস বা অন্যান্য বিরোধী দলগুলো সরব নয়। মনে হচ্ছে দলগুলো মোদি সরকারের এই চক্রান্তের সুদুরপ্রসারি রূপটিই ধরতে পারছে না।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর কাশ্মির ও সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর মতো ঐতিহাসিকভাবে স্পশর্কাতর ইস্যুগুলোর ব্যাপারে মোদি সরকারের প্রাথমিক মনোভাব ছিলো সতর্কতামূলক। সরকার তার শাসন দক্ষতা এবং সংবিধান মেনে চলার ইচ্ছাও দেখিয়েছিলো। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই উশৃঙ্খল জনতা ও গো-নজরদারী লোকজনের সহিংসতার নিন্দা করেছিলেন মোদি।

মুখোশ খুলে গেছে

কিন্তু এখন মরিয়া হয়ে বিজেপি তর মুখোশ খুলে ফেলছে আর বিতর্কিত ইস্যুগুলো সামনে টেনে আনছে। নাগরিকত্ব ও কম্যুনিটির অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো এখন দলটির রাজনৈতিক এজেন্ডার শীর্ষে। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

কাশ্মিরের বিশেষ অধিকারের বিরুদ্ধে দলের নেতারা রণহুঙ্কার দিতে শুরু করেছন। আসামে নতুন এনআরসি’র নামে যেসব সত্যিকারের ভারতীয় নাগরিকের দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে তাদের কষ্ট নিয়ে বিজেপি’র কোন দু:খবোধ নেই। তীব্র জনসমালোচনার পরও দল ও সরকারের নেতারা প্রস্তাবিত ২০১৬ সালের নাগরিকত্ব (সংশোধন) বিল পাস করাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

এই বিলে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের নির্বিচারে বাদ দেয়া হয়েছে। এতে বিলটিই অসাংবিধানিক হয়ে পড়েছে। কারণ এতে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’ বিষয়ে সংবিধানের ১৪ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাশ্মিরের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সেখানে বিজেপি নিযুক্ত গভর্নরের শাসন চলছে। তারাই এখন রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ এই শর্তের ভিত্তিতেই ভূখণ্ডটি ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত হয়েছিলো।

এখন অজিত দোভালের মতো মোদি সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা জম্মু-কাশ্মিরের আলাদা সংবিধানকে ‘লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করছেন। আরো উষ্কানিমূলকভাবে ৩৫এ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা হয়েছে। এতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তা শান্তি প্রক্রিয়ার পথে যেমন বাধা তেমনি রাজনৈতিকভাবে বিজেপি’কে সুবিধা আদায়ের পথ করে দিয়েছে। এই কঠোর অবস্থান কট্টর হিন্দুদের কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে বাধ্য।

অমিত শাহের সাম্প্রতিক মন্তব্যেও স্পষ্ট যে দলটি তার মেরুকরণের কৌশল নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়।

দমন অপ্রতিরোধ্য

এদিকে ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচনামূলক কণ্ঠ দমনের চেষ্টা চলছে প্রকাশ্যে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে। সাংবাদিক ও এক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে নতুন এক বিষাক্ত বিবরণ হাজির করা হয়েছে- তাদেরকে আখ্যা দেয়া হচ্ছে ‘শহুরে নকশাল’ হিসেবে। সামাজিক গণমাধ্যমে কট্টরপন্থীরা এই প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেখাতে চাচ্ছে যে মাওবাদি বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন রয়েছে এমন ব্যক্তিরাই সরকারের সমালোচনা করে। আসলে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা খর্ব করতে সরকারের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে যে গণ প্রতিরোধ গড়ে উঠছে তা গুড়িয়ে দিতেই এই অভিযোগ।

মৌলিক অধিকার সুরক্ষার সর্বশেষ ঘাঁটি সুপ্রিম কোর্ট যদি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারে তাহলে ভারতের গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

তাই আমরা যারা ভারতের গণতান্ত্রিক কল্পনাটিকে অনুরণনশীল এবং মূল্যবান করতে বিনিয়োগ করেছি তাদের সামনে এখন ‘এক্সক্লুভিস্ট পলিটিক্যাল ভিশন’ প্রতিরোধ করার সময় এসেছে।

 

মালিনি পার্থসারথী দি হিন্দু পত্রিকার এডিটরিয়াল স্ট্রাটেজি’র পরিচালক ও সাবেক সম্পাদক

 

print