মন্দির থেকে অভিবাসী: বিজেপির নতুন নির্বাচনী কৌশল

মন্দির থেকে অভিবাসী: বিজেপির নতুন নির্বাচনী কৌশল

বসন্ত কে কৃষ্ণরাজ,
শেয়ার করুন
বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ

হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী খাত্তার ঘোষণা করেছেন যে আসামের সাম্প্রতিক এনআরসির (জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন) আলোকে তার রাজ্যও একই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এই ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র সভাপতি অমিত শাহ অবৈধ অভিবাসীদের ‘ঘুণপোকা’ হিসেবে অভিহিত করে সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, এসব অভিবাসী ভেতরে প্রবেশ করে ভারতকে খেয়ে ফেলছে। অবৈধ অভিবাসীরা যে সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় না থাকলেও কেবল রাজনৈতিক নির্যাতনেই নয়, আরো অনেক কারণেই তারা তাদের জন্মভূমি ত্যাগ করেন।

তাদেরকে অবশ্যই ফেরত পাঠতে হবে, তবে তা করা উচিত মানবিক উপায়ে। আমাদেরও অনেক দেশবাসী আমেরিকা ও অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে রয়েছেন। অমিত শাহ কি তাদেরকেও ‘ঘুণপোকা’ হিসেবে অভিহিত করবেন?

ভূবেষ্টিত রাজ্য হরিয়ানার কোনো ছিদ্রযুক্ত সীমান্ত নেই, যেমনটা আছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো বাংলাদেশের প্রতিবেশী হয়ে। ফলে নিশ্চয়তা দিয়েই বলা যায়, খাত্তারের ঘোষণা স্রেফ নির্বাচনী কৌশল। আগে ছিল রাম মন্দির ইস্যু। কিন্তু তা এখন আর সাড়া পাচ্ছে না। ফলে দলের জন্য নতুন কিছু দরকার। আর তাই এনআরসি ধরতে হবে।

এনআরসি কোনো সহজ বিষয় নয়। এতে প্রয়োজন হয় বিপুল আয়োজনের। আবার তা কোনোভাবেই নিশ্চিত কোনো বিষয় নয়। আসামের কথাই বলা যাক, সেখানকার অনেক প্রকৃত নাগরিকও নিবন্ধনে তাদের নাম পায়নি। একই পরিবারে স্বামীর নাম নিবন্ধনে থাকলেও স্ত্রীর নাম বাদ পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার সন্তানদের নামও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, লোকজন তাদের নথিপত্র হারিয়ে ফেলেছে। এসবের জের ধরে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। আপনি আপনার দেশের নাগরিক নন, এমনটা আপনাকে বলা হলে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হবে চিন্তা করুন তো? এটি আরেকবার দেশ ভাগের মতো বিষয়। নির্দোষ লোকজনকে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলার কথা শুনলে তো গা কেঁপে ওঠার কথা। এই পরিস্থিতিতে খাত্তারের উচিত একেবারে অপ্রয়োজনীয় বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হবেন কিনা তা নিয়ে ভাবা। এটি ভয়াবহ ধরনের ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। আর সমস্যাটি যদি থেকেও থাকে, তার উচিত হবে বিকল্প কোনো পথে তার সমাধান করা।

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমরা নিজেদেরকে এমন সব পরিস্থিতিতে দেখতে পাচ্ছি যে আমাদেরকে সরকারের কাছে কোনো না কোনো কিছু প্রমাণ করতে হচ্ছে। সেটা হতে পারে দেশপ্রেম, আন্তরিকতা, পরিচিতি, এমনকি নাগরিক জ্ঞান। এই সরকার সবসময় আমাদের পরীক্ষা করছে, আমাদের কাছে নানা কিছু দাবি করছে, এমনকি আমাদের নেতারা ক্রমাগত আরো বেশি জনগণের কাছে জবাবদিহিহীন হয়ে গেছে। এটি ভালো নয় এবং আগামী নির্বাচনে এর ফলাফল দেখা যেতে পারে।

সত্য যে হরিয়ানার আরো অনেক কঠিন সমস্যা রয়েছে। যেমন নারী-পুরুষের ব্যবধান বৃদ্ধি, নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতন বৃদ্ধি, শিশু ধর্ষণ, পিটিয়ে হত্যা, পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে হত্যা ইত্যাদি। এগুল গুরুতর ইস্যু এবং দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। খাত্তার যদি এসব সমস্যা সমাধানে নজর দেন, তবে ভালো করবেন।

আর শাহকেও মনে রাখতে হবে, তিনি যদি অভিবাসীদের ঘুণপোকা হিসেবে অভিহিত করতে থাকেন, তবে তার অর্থ হবে তিনি তার দলের চরমপন্থী উপাদানকে লাইসেন্স দিয়ে দেবেন তাদের কাছে বহিরাগত বিবেচিত লোকদের টার্গেট করতে। এটিও দ্রুত গো-রক্ষকদের মতো তাণ্ডব সৃষ্টি করতে পারে। সংক্ষেপে বলা যায়, এটি হবে বোতল থেকে দৈত্যকে বের করে তাকে তাণ্ডব চালাতে দেয়া, খুন আর নৈরাজ্যের লাগাম ছেড়ে দেয়া।

print