চীন চায় ভারতকে বাদ দিয়ে তাকে কাছে টানুক ভুটান

চীন চায় ভারতকে বাদ দিয়ে তাকে কাছে টানুক ভুটান

এসএএম রিপোর্ট,
শেয়ার করুন
কাঠমান্ডুর ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূবে দামাক এলাকায় বেলদাঙ্গি উদ্বাস্তু শিবির, ছবি: এএফপি

চীন ও ভারতের মধ্যে থাকা ছোট্ট পার্বত্য রাষ্ট্র ভুটান চীনা ‘সফট পাওয়ারের’ সর্বশেষ উপকারভোগী। নয়া দিল্লির বদলে বেইজিংই যাতে সেখানে প্রভাবশালী হয়ে ওঠতে পারে, সে প্রয়াস শুরু করেছে।

১৯৫১ সালে চীনের তিব্বতকে নিজের করে নেয়ার ঘটনা এবং সীমান্তের বিষয়টি দীর্ঘ দিন ধরে অমীমাংসিত থাকায় ভুটানের সাথে চীনা সম্পর্ক অস্বস্তিকর অবস্থা রয়েছে এবং ভারত চায় তা তেমনই থাকুক।

চীন ও ভুটানের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ দোকলামে গত বছর চীনা সৈন্যরা একটি রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করলে ভারত তাতে জড়িয়ে পড়ে। চীন ও ভারতীয় সৈন্যরা ৭২ দিন পর্যন্ত চোখে চোখ রেখে সেখানে অবস্থান করে। পরে সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়।

দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও চীন এখন চায় ভুটানের সাথে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে, বন্ধুত্ব স্থাপন করতে।

গত দশকে চীনা পণ্য বিপুলভাবে গেছে ভুটানে। সিমেন্ট থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক সামগ্রী খেলনা ইত্যাদি পণ্য ছেয়ে গেছে ভুটান। চীন এখন ভুটানের তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ।

আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভুটান এখন তার সার্বভৌমত্ব ঘোষণার চেষ্টা করছে, ভারতের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে।

ভুটানের আট লাখ লোক মনে করে, ভারত তাদের চাপে পিষ্ঠ করছে, এখন সময় এসেছে অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার।

ভুটানে বিপুল সংখ্যক চীনা পর্যটক ও পণ্যের আগমন ঘটছে, ছবি: এএফপি

ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ সেরিং শাক্য বলেন, ভুটানের মধ্যেই এখন ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার দাবি ওঠেছে।

অবশ্য ভূগোল ও ইতিহাস ভুটানকে ভারতের স্বার্থ অগ্রাহ্য করতে দেবে না সহজে।

সর্বোচ্চ ও বরফে মোড়া পর্বত শ্রেণির ভুটান হলো বিশ্বের গুটিকতেক দেশের কয়েকটি যা কখনো উপনিবেশের শিকার হয়নি। তারা তাদের স্বকীয় সংস্কৃতি ও মনোহারিতাও ধরে রাখতে পেরেছে।

দেশটির চতুর্থ রাজার ১৯৭০-এর দশকে মোট জাতীয় সুখের ধারণা প্রবর্তনের ঘটনাটি বিখ্যাত হয়ে আছে।

বড় ভাইয়ের ঈর্ষা

১৯৬০-এর দশকে প্রথম মহাসড়ক নির্মাণের আগে পর্যন্ত ভুটান রহস্যময় শাংগ্রি-লা হিসেবে বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে এটি ক্রমবর্ধমান হারে প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে ঘটনাটি প্রকটভাবে দেখা যায়। ওই বছর ভারত ভর্তুকি হ্রাস করলে ভুটানে ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেয়। চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ভুটানি প্রয়াসের শাস্তি ছিল এটি।

থ্রিম্পুতে ২১ বছর বয়স্ক কলেজছাত্র বিমলা প্রধান বলেন, ভারত ও ভুটান যদি ভালো বন্ধু হয়, তবে আমাদের বন্ধুত্ব অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রভাবিত হবে না।

তিনি বলেন, মনে হচ্ছে, সবকিছুর জন্যই ভারতের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় ভুটানকে। ভারত সবসময়ই অন্যদের আগে আসবে। কিন্তু ভারতের উচিত হবে না ঈর্ষান্বিত বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করা।

রাজনীতি বিজ্ঞান ও দর্শনের ছাত্র প্রধানই কেবল এ ধরনের ধারণা পোষণ করে না।

দেশটিতে বেকারত্বের হার যখন ১০.৬ তখন অনেকেই বিকল্প কিছু নিয়ে ভাবছে।

ভারত উদার হাতে ঋণ ও মঞ্জুরি দিচ্ছে। কিন্তু ভুটান আরো ঋণ পেতে পারে এবং চীনের কাছে তা বিপুল পরিমাণে রয়েছে।

ভুটান এখন দ্রুত উন্নতির দিকে পা বাড়াতে চায়, বেকারত্ব কমাতে চায়।

দেশটিতে যখন ভারত ও চীন প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে, তখন সেখানে তৃতীয়বারের মতো সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে গেছে। এতে স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ভোটাররা পরিবর্তন চায়।

চীনের ‘সফট’ কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দীর্ঘ দিন ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা শ্রীলংকা ও মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বেশ লাভজনক মনে হচ্ছে।

চীন এখন ক্রীড়া, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক সফরের মাধ্যমে ভুটানের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে। ভুটানি ছাত্রদেরকে স্কলারশিপও দিচ্ছে।

শিম্ফুতে ভুটান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসছে শিক্ষার্থীরা, ছবি: এএফপি

গত জুলাই মাসে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী কং জুয়ানইউ ভুটান সফর করেন। চীন থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটকও পাচ্ছে ভুটান। এসব পর্যটক ভারতীয়দের চেয়ে বেশি ভিসা ফি দিচ্ছে।

এক দশক আগে ভুটানে চীনা পর্যটক যখন ছিল ২০-এর কম, ২০১৭ সালে তা হয়েছে ৬,৪২১ জনে।

ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংজাং দর্জি ভুটানের কূটনীতি সম্পর্কে মাথা ঘামাতে চান না। তবে তিনি বিদেশী বিনিয়োগের মূল্য বোঝেন।

তিনি বলেন, ভুটানের উচিত হবে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা।

তিনি বলেন, অনেক চীনা পর্যটক এখানে আসতে শুরু করেছে। তারা অনেক টাকা নিয়ে আসে।

print
SOURCEএএফপি
শেয়ার করুন