জনসংখ্যার সুবিধা ভারতের উত্থানকে নিশ্চিত করতে পারবে না

জনসংখ্যার সুবিধা ভারতের উত্থানকে নিশ্চিত করতে পারবে না

লিন মিনওয়াঙ,
শেয়ার করুন

যথেষ্ট কর্মসংস্থান না থাকায়, ভারতের বর্তমান জনসংখ্যার সুবিধা উল্টা বোঝায় রূপ নিতে পারে। শীতল যুদ্ধের পর থেকেই মানুষ ভারতের উত্থানের কথা বলে আসছে, এবং দেশটির অর্থনীতিও দ্রুত বেড়েছে সত্যি। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সময় ভারতের জিডিপি ছিল ২৭৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালের শেষে এর পরিমান বেড়ে ২.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ভারত এখন বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। অনেকেই মনে করছেন ভারত মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অলৌকিকত্ব দেখাবে, কারণ ভারতের তরুণ জনবল বেশি এবং জনসংখ্যাগত একটা সুবিধা তাদের রয়েছে যেটা আগামী দশকে আরও বাড়বে।

ভারতের জনসংখ্যার বয়সগত সুবিধার দিকটি নিয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু এটা নিয়ে একটা দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োজন।

ভারতের জনসংখ্যাগত সুবিধাটি তখনই কাজে লাগতে পারে, যখন এটার সাথে একই মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করেছেন, যার উদ্দেশ্যে শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়।

তবে, বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই প্রচারণায় খুব একটা উন্নতি হয়নি। দুটো খাত এখানে উল্লেখ করার মতো। প্রথমত, ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা কাজে লাগাতে পারেনি।

আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। সে সময় ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী ভারতের অর্থনীতিকে সেবামুখী করে তোলেন এবং দেশটি ‘বিশ্বের অফিস’ হিসেবে গড়ে ওঠে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ ধরেই পরবর্তী উন্নয়ন আসে। তাই মোদি সরকারের জন্য এখন এই সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়।

দ্বিতীয়ত, ভারতকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ পদক্ষেপ এগিয়ে নিতে হলে তাদের ব্যাবসায়িক পরিবেশের এখনও অনেক উন্নতি করতে হবে। ব্যবসায় করা সহজের মাপকাঠিতে বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে ২০১৮ সালে ভারতের অবস্থান ১০০তম। ২০১৭ সালে তাদের অবস্থান ছিল ১৩০তমতে। চীনের ৭৮তম অবস্থানের কথা বিবেচনা করলে ভারতকে এখনও অনেক দূর যেতে হবে।

জাপান সরকার কিছু শিল্প কারখানা ভারতে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে, কিন্তু জাপানের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এ ব্যাপারে অতটা উৎসাহী নয়। জাপান ভারতে যে উচ্চগতির রেললাইন স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে, সেটিও আরেকটি উদাহরণ, কেন ভারতে ব্যবসায় করাটা কঠিন। গত বছর আহমেদাবাদে প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বড় ধরণের অনুষ্ঠান করা হয় কিন্তু এ জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে খুবই ধীর গতিতে।

তাছাড়া, ভারতের জনসংখ্যাগত যে সুবিধা রয়েছে, সেটি সংখ্যার দিক থেকে, যোগ্যতার দিক থেকে নয়। ২০১৮ সালে ইউএন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম যে হিউম্যান ডেভলপমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে ভারতের অবস্থান ১৩০তম। র‍্যাঙ্কিং থেকে দেখা যাচ্ছে মৌলিক শিক্ষা ও মেডিক্যাল সিস্টেমের ক্ষেত্রে ভারতের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। ভাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া, দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নতি করাটা কঠিন হবে। দেশটিকে আরও বেশি কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং মেক ইন ইন্ডিয়া পদক্ষেপকে এগিয়ে নিতে হলে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

সংক্ষেপে বললে, জনসংখ্যার সুবিধা ভারতকে যে এমনি এমনিই এগিয়ে নিয়ে যাবে, এই ধারণাটা ভুল।

এই জনশক্তি থেকে প্রকৃত সুবিধা নিতে চাইলে সময়ের পদক্ষেপ সময়ে নেয়া এবং সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

লিন মিনওয়াং ফুডান ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো

print
শেয়ার করুন